আদালতে মা-বাবার জঙ্গি কার্যক্রমের বর্ণনা দিলো তানভীর কাদেরীর ছেলে

Send
তোফায়েল হোছাইন
প্রকাশিত : ০৬:২৭, জুলাই ১৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০৬:৫৪, জুলাই ১৭, ২০১৯

হলি আর্টিজানরাজধানীর গুলশানে হলি আর্টিজানে হামলা মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছে জেএমবির অন্যতম সমন্বয়ক তানভীর কাদেরীর ১৬ বছর বয়সী ছেলে। নিজের মুখেই সে মা-বাবার জঙ্গি কার্যক্রমের বর্ণনা দিলো আদালতে। হলি আর্টিজান হামলার আগে তাদের বাসায় জঙ্গিদের আনাগোনা ও পরিকল্পনা সম্পর্কে নানা তথ্য বিচারকের কাছে জানায় সে। এ মামলায় মঙ্গলবার (১৬ জুলাই) ঢাকার সন্ত্রাস দমন বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মজিবুর রহমান তিনজন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করেন। অন্য সাক্ষীরা হলো– ফাইরোজ  মালিহা ও আলম চৌধুরী। আদালত পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য আগামী ২৩ জুলাই দিন ধার্য করেন।

১৬ বছরের কিশোর আদালতে তার জবানবন্দিতে বলে,  ‘২০১৪ সালের দিকে আমরা উত্তরায় বসবাস করতাম। তখন আব্বু (তানভীর কাদেরী), আম্মু (আবেদাতুল ফাতেমা ওরফে খাদিজা) আর আমরা দুই ভাই নিয়ে ছিল আমাদের পরিবার। প্রতিদিনের মতো উত্তরার লাইফ স্কুলের মসজিদে আব্বুসহ আমি নামাজ আদায় করতাম। একদিন আব্বু বাসায় এসে আম্মুকে বলেন, আমরা সহপরিবারে হিজরতে যাবো। এখানে তেমন কোনও পরিবেশ নেই, ভালো স্কুল নেই ও খেলার মাঠ নেই। হিযরতে ইসলামের পথে গেলে আর কোনও প্রকার কষ্ট থাকবে না আমাদের। এরই মধ্যে আব্বু জাহিদ নামে এক আংকেলের সঙ্গে পরিচিত হন। এ বিষয়ে (হিজরত) আংকেলের সঙ্গে আব্বু আলোচনা করে বলেন, আমাদের সবাইকে ইসলামের বায়াত গ্রহণ করতে হবে। এ বিষয়ে আব্বু আম্মুকে জিজ্ঞাসা করলে আম্মুও একমত প্রকাশ করেন। এরপর আব্বুর কথামতো আম্মু ব্যাগ গোছাতে থাকেন। বাসা থেকে বের হওয়ার সময় আব্বু সবাইকে মোবাইল ফোনে কল দিয়ে জানান, সপরিবারে মালয়েশিয়ায় ঘুরতে যাচ্ছেন। ওখানে গিয়ে সবার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন।

‘এরপর পল্লবীর দিকে আমাদের বাসাভাড়া নেওয়া হয়। সেখানে জাহিদ আংকলের সঙ্গে আরও তিনজন আমাদের বাসায় আসেন। তাদের মধ্যে এক আংকেল আমাকে চকলেট খেতে দেন। তারা বাসায় ঢোকার পর পেনড্রাইভ থেকে ‘ইসলামিক নামক’ এক ফোল্ডার দিয়ে যায়। ওই সময় মুসা নামের আরেক আংকেল আমাকে আর আমার ভাইকে ইংরেজি-বাংলা পড়াতে আসতেন। ‍কিছুদিন পর চকলেট দেওয়া আংকেল বলেন বসুন্ধরায় বাসা ভাড়া নিতে। এরপর তিনি বাসা দেখে এসে বলেন, অমুখ তারিখে নতুন বাসায় উঠতে হবে। এরপর আমরা সবাই মিলে ওই বাসায় ওঠি। কয়েকদিন যাওয়ার পর ওই তিনজন আরও দুজনকে বাসায় নিয়ে আসেন। তাদের একটি সংগঠন ছিল। তাদের সাংগঠানিক নাম ছিল ছাদ, মাসুম, ওমর, আরিফ। এরপরে আরও তিনজন আসেন। জাহাঙ্গীর নামের আরেক আংকেল তার পরিবার নিয়ে আসেন। জাহাঙ্গীর আর বাবা একসরঙ্গ থাকতেন। তামিম নামের আরেক আংকেলের রুমে থাকতেন সাতজন। তাদের রুমের ঢোকা নিষেধ ছিল। ওই সাতজন সব সময় রুমে থাকতেন। মাঝে মাঝে আব্বুকে তালিম দিতেন। আমি আর আব্বু তাদের রুমে খাবার দিয়ে আসতাম বাইরে থেকে।

‘একদিন চকলেট দেওয়া আংকেল পাঁচটি ব্যাগ নিয়ে আসেন। সেগুলো তামিমের রুমে রেখে চলে যান। এর কিছুদিন পরে সারোয়ার নামের আরেকজন এসে আলোচনা করে চলে যান। তিন দিন পর জাহাঙ্গীর আংকেল আসেন। তিনি সিরিস কাগজ দিয়ে চাপাতিতে ধার দিতে থাকেন। আম্মু জিজ্ঞাসা করলে বলেন, এগুলো অপারেশনের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। এরপর তিনজন বাইক নিয়ে বাইরে চলে যান। তার কয়েক মিনিট পরে আরও দুইজন বের হয়ে যান। যাওয়ার সময় বলেন, ওপারে জান্নাতে দেখা হবে। তারপর আব্বুকে বলেন, দ্রুত বাসা ছেড়ে মিরপুরের দিকে চলে যান। এরপর আম্মুকে আব্বু বলেন, আমি ট্যাক্সি আনতে যাচ্ছি তুমি ব্যাগ গুছিয়ে নাও। আব্বু ট্যাক্সি নিয়ে আসলে আমরা এ বাসা ছেড়ে চলে যাই। এরপরে এক আংকেল জানান একটি বড় অপারেশন হয়েছে। আব্বু তখন খবরে দেখতে পান হলি আর্টিজানে ব্যাপক গোলাগুলি চলেছে। সেই ঘটনায় যারা বাসা থেকে বের হয়ে গেছেন তারা সবাই মারা গেছেন। এর কয়েকদিন পরে আরেক আংকেল জানান, রূপনগরে বাসা ভাড়া নিতে। এরপর আমাকে আর আম্মুকে আজিমপুরে পাঠিয়ে দেন। আব্বু আর ভাইয়া অন্য জায়গায় চলে যায়। আজিমপুরে থাকা অবস্থায় দুইজন মহিলা আসেন বাচ্চাসহ। জাহিদ আংকেল তাদের নিয়ে আসেন। পরে জানতে পারি পুলিশের অভিযানে বাবা ও ভাইয়ের মৃত্যু হয়। আমাদের আজিমপুরের বাসায় পুলিশ অভিযান চালায়। সেখান থেকে আমাকে ও আম্মুকে গ্রেফতার করে।’

এরপর বিচারক জিজ্ঞাসা করেন, কাঠগড়ায় দাঁড়ানো আসামিদের মধ্যে কাউকে সে চেনে কিনা? উত্তরে দুজনকে চেনে বলে জানিয়ে এই কিশোর বলে, ‘আমরা যখন বসুন্ধরায় থাকতাম তখন তারা কয়েক বার দেখা করতে এসেছিল।’ সে যাদের চিহ্নিত করেছে তারা হলো– র‌্যাস আংকেল ওরফে আসলাম ও জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব।

কল্যাণপুরের জঙ্গি আস্তানায় অভিযানে মারা যায় তানভীর কাদেরী। হলি আর্টিজান মামলায় বাবার জঙ্গি কার্যক্রম সম্পর্কে সাক্ষ্য দেয় ছেলে। আজিমপুরে জঙ্গি আস্তানার মামলায় সে ও তার মা আসামি।

প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলা চালিয়ে বিদেশি নাগরিকসহ ২০ জনকে হত্যা করে জঙ্গিরা। এ সময় তাদের গুলিতে দুই পুলিশ সদস্য নিহত হন। পরে অভিযানে পাঁচ জঙ্গি নিহত হয়। ওই ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গুলশান থানায় একটি মামলা দায়ের করে পুলিশ।

 

 

/টিএইচ/এমএএ/

লাইভ

টপ