পুলিশের এক এএসআই’র অবিশ্বাস্য ‘দুর্নীতি’

Send
দীপু সারোয়ার
প্রকাশিত : ১০:০৭, জুলাই ২০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:২৬, জুলাই ২১, ২০১৯

এএসআই রবিউল ইসলামমো. রবিউল ইসলাম। পুলিশ সদর দফতরের সংস্থাপন শাখার অ্যাসিসট্যান্ট সাব ইন্সপেক্টর (এএসআই)। পুলিশের নিয়োগ ও বদলির বিষয়গুলো দেখভাল করে এই শাখা। প্রায় একযুগ ধরে পুলিশ বিভাগে আছেন রবিউল। কনস্টেবল হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন ২০০৭ সালে। পরে পদোন্নতি পেয়ে হন এএসআই। দুর্নীতি করে ২ কোটি ১৯ লাখ টাকার জমির (বসতভিটা, বাগান ও দোকান ঘর) মালিক হয়েছেন রবিউল। বাংলা ট্রিবিউনের অনুসন্ধানে এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

যশোরের কেশবপুর ও রাজধানীর কামরাঙ্গীর চরে মোট পাঁচটি জমির মালিক তিনি। এর দু’টি কামরাঙ্গীর চর ও তিনটি যশোরের কেশবপুরে। এরমধ্যে চারটি নিজের নামে, আরেকটি কিনেছেন শ্বশুর ও ভগ্নিপতির নামে।

এদিকে, পুলিশ সদর দফতরের সিকিউরিটি সেলে রবিউলের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ জমা পড়েছে, সেখানে ৪২ লাখ ৮০ হাজার টাকার দুর্নীতির তথ্য আছে। অভিযোগ আছে, তদবির বাণিজ্য করে এই টাকা আয় করেছেন তিনি। সিকিউরিটি সেলে অভিযোগ জমা হয় গত ১৮ জুন। এরই মধ্যে অভিযোগের তদন্ত শুরু হয়েছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনেও (দুদক) রবিউলের বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়েছে। অভিযোগটি ‘অভিযোগ যাচাই-বাছাই সেল’ এ আছে বলে জানিয়েছে দুদকের জনসংযোগ শাখা। দুদকে রবিউলের নামে অভিযোগ জমা হয় গত ২০ জুন।

রবিউলের বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা হওয়া ও তদন্তের বিষয়টি অবগত আছেন বলে জানিয়েছেন পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) মো. সোহেল রানা।

দুদকে জমা পড়া অভিযোগপত্র আর যার বিরুদ্ধে অভিযোগ সেই এএসআই  রবিউলও জানান, পুলিশ সদর দফতরের সিকিউরিটি সেল তদন্ত করছে। তবে কী বিষয়ে, কেন তদন্ত হচ্ছে তা বিস্তারিত কিছু জানেন না বলে দাবি করেন রবিউল।

রবিউলের সম্পদের বিবরণ

বাংলা ট্রিবিউনের অনুসন্ধানে জানা যায়, এএসআই রবিউল ইসলামের ন্যাশনাল আইডি নম্বর- ৪৬১৬৫৪৭৩৯৮৩২০। আর ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (টিআইএন) হলো-৭২৯৫১৭১৮৬২০৮।

রবিউলের নামে যশোরের কেশরপুর পৌর এলাকায় আছে ৩ শতাংশ জমি, যা কেশবপুর সাব রেজিস্ট্রার অফিস থেকে দলিল হয় ২০১৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি। দলিল নম্বর ৪৬১/১৫। জমির দাম দেখানো হয় ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দলিলে দাম কম দেখানো হলেও এই জমির বর্তমান বাজার মূল্য ২১ লাখ টাকা।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৫৫ নম্বর ওয়ার্ডে (কামরাঙ্গীর চর) তার আছে ১১৫ দশমিক ৫০ অযুতাংশ জমি (১ কাঠার কম)। দলিল নম্বর ৩৭৭০। ঢাকা সদর সাব রেজিস্ট্রার অফিসে জমিটির দলিল রেজিস্ট্রেশন হয় ২০১৬ সালের ২৯ মে। দলিলে জমির দাম দেখানো হয়েছে ৩ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এই জমির বর্তমান বাজার মূল্য ৪০ লাখ টাকা।

যশোরের কেশবপুর পৌর এলাকায় রবিউলের রয়েছে আরও ১০ দশমিক ৫০ শতাংশ জমি। কেশবপুর সাব রেজিস্ট্রার অফিসে এ জমির রেজিস্ট্রেশন হয় ২০১৭ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি। দলিল নম্বর-১১৮১/১৭। দলিলে জমির দাম দেখানো হয়েছে ১৬ লাখ ২১ হাজার টাকা। দলিলে দাম যাই দেখানো হোক না কেন, স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এই জমির বাজার বর্তমান বাজার মূল্য ৪৮ লাখ টাকা।

এছাড়া, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডে (কামরাঙ্গীর চর) আছে এক কাঠা জমি, যার দলিল নম্বর ৪৪৪৫। ঢাকা সদর সাব- রেজিস্ট্রার অফিসে দলিল হয় গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর। দলিলে জমির দাম দেখানো হয়েছে ৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দলিলে দাম কম দেখানো হলেও এই জমির বাজার মূল্য ৫০ লাখ টাকা।

যশোরের কেশবপুর পৌর এলাকায় ৭২ নম্বর আলতাপোল মৌজায় বাগান ও স্থাপনাসহ দোকান কেনা হয়েছে এএসআই রবিউলের শ্বশুর মো. শহীদুল ইসলাম ও ভগ্নিপতি মো. ইয়াছিন আলীর নামে। জমির দলিল নম্বর ২৩৬১। কেশবপুর সাবরেজিস্ট্রি অফিসে জমির দলিল হয় এ বছরের ২৯ মে। জমির পরিমাণ যথাক্রমে দশমিক ৮৪২ শতক ও ২ দশমিক ১৫৮ শতক। দলিলে জমির দাম ৩৫ লাখ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জমিটির বর্তমান বাজার মূল্য ৬০ লাখ টাকা। রবিউলের শ্বশুর শহীদুল পেশায় স্থানীয় একটি মাদ্রাসার দফতরি এবং তার ভগ্নিপতি ইয়াছিন আলী পেশায় কৃষিজীবী। তাদের কেউই আর্থিকভাবে সচ্ছল নন। শ্বশুর ও ভগ্নিপতির নামে জমি কেনা হলেও এর আসল  মালিক রবিউল।

যশোরের কেশবপুর ও ঢাকার কামরাঙ্গীর চরে জমি, বসতভিটা, বাগান ও দোকান আছে কিনা, জানতে চাইলে বিষয়টি এড়িয়ে যান রবিউল। বলেন,‘অনেকেই অনেক কিছু বলে।’

দুদকে জমা পড়া অভিযোগপত্র

দুদক ও পুলিশের সদর দফতরে রবিউলের নামে যত অভিযোগ 

রবিউলের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, মাদক ব্যবসা ও বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ জমা পড়েছে দুদক ও পুলিশ সদর দফতরে।  অভিযোগে বলা হয়—

১. কেশবপুরের মাদক ব্যবসায়ী আব্দুল লতিফের ঘনিষ্ঠ রবিউল। লতিফ একাধিকবার গ্রেফতার হলেও তাকে ছাড়ানোর ব্যবস্থা করেন রবিউল।

২. কেশবপুরের মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন রবিউল।

৩. পুলিশ সদর দফতরে চাকরির সূত্রে কেশবপুরে ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করেন।

৪. তদবির বাণিজ্য করে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন।

৫. মঙ্গলকোটের এনামুল মাস্টারের ছেলে মাসুম হোসেন সরদারকে পুলিশ কনস্টেবল পদে চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়ে ছয় লাখ টাকা নিয়েছেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কনস্টেবল মাসুম বর্তমানে ঝিনাইদহে কর্মরত আছেন।

৬. শিকারপুরের আজিজার গাজীর ছেলে তরিকুল হোসেনকে কনস্টেবল পদে চাকরির ব্যবস্থা করে দেন রবিউল। এজন্য আজিজারের কাছ থেকে নিয়েছেন ১৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা। তরিকুল কর্মরত আছেন চুয়াডাঙ্গায়।

৭. দেউলি গ্রামের চিনু মোড়লের ছেলে মনিরুল ইসলাম মনিরকে কনস্টেবল পদে চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়ে নিয়েছেন ১২ লাখ টাকা। মনির কর্মরত আছেন খুলনায়।

৮. আটন্ডা গ্রামের ফকির সরদারের ছেলে বুলুকে ডাকাতির মামলা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য নিয়েছেন ১ লাখ ১০ হাজার টাকা।

৯. পুলিশের চাকরি ও মামলা থেকে নাম বাদ দেওয়ার নামে বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের আফসার গাজীর কাছ থেকে নিয়েছেন ১০ লাখ টাকা।

পুলিশ সদর দফতরে জমা হওয়া অভিযোগ সম্পর্কে রবিউল বলেন, ‘বিষয়টি তদন্তাধীন।’ আর দুদকে জমা হওয়া অভিযোগ সম্পর্কে কিছু জানেন না বলে জানান। 

অনুসন্ধানে জানা যায়, পুলিশের চাকরির সুবাদে কেশবপুরে ক্ষমতার অপব্যবহারের নজির স্থাপন করেছেন এএসআই রবিউল। মামলায় জড়াবেন বা পুলিশি হয়রানির শিকার হবেন— এই  ভয়ে রবিউলের বিষয়ে মুখ খুলতে চান না কেউই। পুলিশ সদর দফতরে অভিযোগ করতে এসেও শেষ পর্যন্ত অনেকে অভিযোগ না করেই ফিরে গেছেন। পরিবারের সদস্যদের ফোন করে বা বাড়িতে লোক পাঠিয়ে ও  ভয় দেখিয়ে অভিযোগকারীকে পুলিশ সদর দফতরের গেট থেকে ফেরত যেতে বাধ্য করা হয়েছে বলে রবিউলের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে।

চাচার নামে রবিউলের সাধারণ ডায়েরি  

গত ১৪ মে যশোরের কেশবপুর থানায় আপন চাচা আব্দুর রাজ্জাকের নামে সাধারণ ডায়েরি করেন (জিডি) রবিউল। জিডি নম্বর-৫৩৯। জিডিতে রাজ্জাকের সঙ্গে জমিজমা নিয়ে বিরোধের কথা বলা হলেও জমির পরিমাণ ও স্থানের কথা উল্লেখ করা হয়নি। এমনকি তার ঢাকার কর্মস্থল ও ঠিকানা সম্পর্কেও জিডিতে উল্লেখ নেই। যশোরের কেশবপুর উপজেলার মঙ্গলকোট গ্রামের মৃত আব্দুল হাইয়ের সন্তান হিসেবে নিজেকে উল্লেখ করেছেন রবিউল। বলেন, ‘উত্তরাধীকার সূত্রে পাওয়া জমিজমা বুঝে পাচ্ছি না। আপন চাচা রাজ্জাক এতে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। তিনি আমাকে জেল খাটানো এবং নানা ধরনের বিপদে ফেলাসহ ক্ষয়ক্ষতির হুমকি দিচ্ছেন।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আব্দুর রাজ্জাক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মাত্র আড়াই বছর বয়সে বাবা হারা হয় রবিউল। বাবা মারা যাওয়ার পর তার মায়ের অন্যত্র বিয়ে হয়। এরপর সে আমাদের পরিবারেই বড় হয়েছে। লেখাপড়া করেছে এবং পরে পুলিশে চাকরি নিয়েছে। আর পুলিশ হওয়ার পর সে আমাদেরকে পৈতৃক ভিটা থেকে উচ্ছেদ করতে চাইছে। তার লোকজন আমাদের বসভিটায় হামলা চালিয়েছে।’ রাজ্জাক বলেন, ‘‘আমাদের মালিকানায় থাকা কোনও জমি বা সম্পদের অংশীদার সে না। সে আসলে আমাদের সম্পত্তি দখল করতে চাইছে।’ চাচার সঙ্গে বিরোধের কথা স্বীকার করে রবিউল বলেন,‘জমিজমা নিয়ে বিরোধ চলছে।’

 

/এপিএইচ/

লাইভ

টপ