ছেলেধরা সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা এমন নির্মমতা মানতে পারছেন না কেউ

Send
নুরুজ্জামান লাবু ও শেখ জাহাঙ্গীর আলম
প্রকাশিত : ০২:৩০, জুলাই ২২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:১৩, জুলাই ২২, ২০১৯

তাসলিমা আক্তার রেনু

স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়েছিল দুই বছর আগে। এরপর থেকে দুই সন্তানকে নিয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে রাজধানীর মহাখালীর বাসায় থাকতেন তাসলিমা আক্তার রেণু। মেয়ে তুবাকে স্কুলে ভর্তির খোঁজ নিতে গিয়েছিলেন উত্তর বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখানেই ছেলেধরা সন্দেহে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয় তাকে। মাকে হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছে তার দুই সন্তান মাহিন ও তুবা। অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ তাদের সামনে। স্বজন ও প্রতিবেশীরা বিশ্বাসই করতে পারছেন না, রেণুকে কেউ এমন নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করতে পারে। হৃদয়বিদারক এই ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে তোলপাড়। গণপিটুনির নামে নিরপরাধ রেণুকে হত্যার ঘটনায় জড়িতদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন সবাই।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, এ ঘটনায় বাড্ডা থানায় একটি মামলা দায়ের হয়েছে। ইতোমধ্যে তারা গণপিটুনিতে অংশ নেওয়া ৫-৬ জনের পরিচয় শনাক্ত করেছেন। ছেলেধরা সন্দেহে রেণুকে যারা পিটিয়ে হত্যা করেছে, তাদের সবাইকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হবে বলেও জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।

এই বিদ্যালয়ে ভর্তি সংক্রান্ত তথ্য জানতে যান রেনু

রবিবার (২১ জুলাই) রেণুর বাসা, বাড্ডার সেই স্কুল ও হাসপাতাল ঘুরে জানা গেছে, মহাখালী ওয়্যারলেস গেটের জিপি জ-৩৩/৩ নম্বর বাসায় দুই সন্তান নিয়ে থাকতেন তাসলিমা আক্তার রেণু। বাবা মান্নান মোল্লা মহাখালীতে মুদিদোকান চালাতেন। এলাকার সবাই মান্নান মোল্লাকে এক নামে চেনে। নিহত রেণুও ছোটবেলা থেকেই বাবার সঙ্গে ঢাকায় থাকতেন। এখান থেকেই স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছিলেন তিনি। একসময় আড়ংয়ে চাকরি করেন। উত্তর বাড্ডা এলাকার তসলিম উদ্দিন নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর থাকতেন উত্তর বাড্ডা এলাকায়। তাহসিন আল মাহিন ও তুবা তাহসিন নামে তাদের দুই সন্তান আছে। প্রথম সন্তানের জন্মের পর (২০১৪ সালে) আড়ংয়ের চাকরি ছেড়ে দেন তিনি। বছর দুয়েক আগে পারিবারিক কলহের জের ধরে স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয় তার। এরপর থেকে থাকতেন মহাখালী ওয়্যারলেস গেট এলাকায়, বাবা-মায়ের সঙ্গে।

স্বজন ও প্রতিবেশীরা জানান, এক ভাই ও চার বোনের মধ্যে রেণু ছিলেন সবার ছোট। তার বোন নাজমা একটি কোচিংয়ে শিক্ষকতা করেন। আর একমাত্র ভাই সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, থাকেন আমেরিকায়। মা অসুস্থ অবস্থায় বিছানায় পড়ে আছেন।

লাঠি দিয়ে পেটানো হচ্ছে রেনুকে

নিহত তাসলিমার ভাগ্নে সৈয়দ নাসির উদ্দিন টিটু বলেন, ‘জনতা সন্দেহে আমার খালাকে পিটিয়ে মেরেছে। তার তো কোনও দোষ ছিল না। মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করাবে বলে খোঁজ নিতে বাড্ডার ওই স্কুলে গিয়েছিল। আমরা এই হত্যার বিচার চাই। হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই; যাতে এরকম পরিণতি আর কারও বেলায় না ঘটে।’

রেণুদের বাসার নিরাপত্তাকর্মী রমজান আলী বলেন, ‘রেণুকে আমি ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি। এই বাসাতেই ছোট থেকে বড় হয়েছে। এই বাসাতেই তার বিয়ের অনুষ্ঠান হয়েছে। আমি তাসলিমার বিয়ের দাওয়াতও খেয়েছি। মেয়েটা খুব ভালো ছিল। সবার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতো। তাকেই লোকজন ছেলেধরা সন্দেহে পিটিয়ে মারলো! আমরা কেউ বিশ্বাসই করতে পারছি না।’

মহাখালী ওয়্যালেস গেট এলাকার বাসিন্দা মাজেদা বেগম বলেন, ‘আমি মহাখালীতে প্রায় ৩০ বছর ধরে বসবাস করছি। তাসলিমাকে আমি ছোট থেকেই দেখে আসছি। ৯ বছর আগে তার বিয়ে হয়েছিল। দুটি সন্তান হলেও পারিবারিক কলহের কারণে তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর থেকে রেণু তার সন্তানকে নিয়ে মহাখালীতে বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকতো। পাশাপাশি তার বোন মাহফুজার কোচিংয়ে টিউশনি করাতো। আমার সঙ্গে প্রায় প্রতিদিনই দেখা হতো, কথা হতো। ও খুব ভালো মানুষ ছিল। কারও সঙ্গে কোনও ঝামেলা ছিল না। ওকে এভাবে পিটিয়ে মেরে ফেলাটা আমরা কেউ মানতে পারছি না। মানুষ এত নির্মম হয় কীভাবে?’

উত্তর বাড্ডায় পিটিয়ে মারা হচ্ছে রেনুকে

নিহত রেণুর আরেক প্রতিবেশী আব্দুল আহাদ হোসেন বলেন, ‘শনিবার (২০ জুলাই) সকাল আনুমানিক ৭টার দিকে গ্যারেজ থেকে গাড়ি বের করার সময় রেণুর সঙ্গে আমার দেখা হয়। সে বলে, উত্তর বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক স্কুলে যাবে মেয়েকে ভর্তি করাতে। তারপর সে চলে যায়। কিন্তু ওই যাওয়াই তার শেষ যাওয়া হলো! রেণুর বাবাকে এই মহল্লায় সবাই চেনে। আমরাও ওদের পরিবারের সবাইকে চিনি। ওকেই কিনা ছেলেধরা সন্দেহে পিটিয়ে মারা হলো!’

আব্দুল আহাদ হোসেন বলেন, ‘আমি ভিডিওতে দেখেছি, একটা নারীকে কয়েকজন মানুষ পিটিয়ে মারছে। আশেপাশের কেউ কিছু বলছে না! আমি অবাক হয়েছি। এ আমরা কোন দেশে বাস করি। এমনিতেই তো নারীদের গায়ে হাত তোলা অন্যায়। আর কেউ যদি অন্যায় করে, তবে প্রশাসন আছে, পুলিশ আছে। কিন্তু এভাবে পিটিয়ে মেরে ফেলা, এটা অনেক বড় ভুল। কোনও সভ্য দেশের মানুষ এরকম করতে পারে না। ওরা মানুষ না, ওরা তো পশুর সমতুল্য। বিবেক-বিবেচনাবোধ কিছুই নেই ওদের।’

কী ঘটেছিল সেই স্কুলে?

তাসলিমা আক্তার রেণুকে ছেলেধরা সন্দেহে পিটিয়ে হত্যার আগে কী ঘটেছিল উত্তর বাড্ডার সরকারি সেই প্রাথমিক স্কুলে? সরেজমিন সেই স্কুলে গিয়ে জানা যায়, শনিবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে ওই স্কুলে যান রেণু। এ সময় স্কুলে ক্লাস চলছিল। রেণু স্কুলের গেট দিয়ে প্রবেশ করতে চাইলে কয়েকজন অভিভাবক তাকে স্কুলের ভেতরে যাবার কারণ জিজ্ঞাসা করেন। এ সময় রেণু তাদের জানান, তার বাচ্চাকে স্কুলে ভর্তি করাবেন। বছরের মাঝামাঝি সময়ে স্কুলে ভর্তি করানোর কথা বলায় অভিভাবকরা তাকে ছেলেধরা হিসেবে সন্দেহ করেন। এরপরই দ্রুত ‘ছেলেধরা ধরা পড়েছে’ বলে গুজব ছড়িয়ে পড়ে।

রেনুকে পেটানোর ঘটনা মোবাইলে ভিডিওতে ধারণ করা হচ্ছে

উত্তর বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহানাজ বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দুইজন অভিভাবক তাসলিমাকে আমার কাছে নিয়ে আসেন। আমি তার সঙ্গে কথা বলছিলাম। তার ঠিকানা লিখে দিতে বলেছিলাম। সে লিখছিল। এরমধ্যে বাইরে প্রপাগান্ডা শুরু হয়ে যায়, স্কুলে ছেলেধরা ঢুকেছে। মুহূর্তের মধ্যে স্কুলের ভেতরে মানুষ আসতে শুরু করে। সে সময় আমাদের নিচের গেট বন্ধ ছিল। লোকজন ওই গেটের তালা ভেঙে স্কুলের ভেতরে প্রবেশ করে আমার কক্ষ থেকে তাকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যায়।’

প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘ওই নারীকে জনতা ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর আমি থানায় ফোন করি, আমাদের স্কুল কমিটিকে জানাই, ওয়ার্ড কাউন্সিলরকেও ফোন করে বিষয়টি জানাই।’ কারা তাকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা বলা মুশকিল। এখানে স্কুলের শিক্ষার্থীদের অভিভাবক, স্থানীয় উৎসুক জনতা এবং বহিরাগতরা ছিল। তখন কে অভিভাবক আর কে বহিরাগত, সেটি বোঝাই বড় মুশকিলের বিষয় ছিল।’

ময়নাতদন্ত শেষে লাশ লক্ষ্মীপুরে দাফন

এদিকে, মর্মান্তিক এই ঘটনার পর রবিবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে নিহত তাসলিমা আক্তার রেণুর লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হয়। স্বজনরা জানিয়েছেন, দুপুর ২টার দিকে লাশ নিয়ে তারা সরাসরি লক্ষ্মীপুরের রায়পুর থানার সোনাপুর গ্রামের নিজ বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে রাতেই জানাজা শেষে দাফন করা হয়েছে।

হত্যার ভিডিও ফেসবুকে, জড়িতদের গ্রেফতারের দাবি

তাসলিমা আক্তার রেণুকে যখন ছেলেধরা সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয়, সে সময় এই দৃশ্য অনেকেই মোবাইল ফোনে ভিডিও করেন। সেইসব ভিডিও এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভয়াবহ এই নির্মম ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের কঠোর শাস্তি দাবি করেছেন সবাই।

ঘটনাস্থলে একটি মোবাইল ফোনে ধারণকৃত ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ওই নারীকে প্রধান শিক্ষকের রুম থেকে টেনে-হিঁচড়ে বের করার পর মুহূর্তে অসংখ্য লোক তাকে ঘিরে ফেলে। স্থানীয় চার-পাঁচজন যুবক তাকে লাঠি দিয়ে এলোপাতাড়ি পেটাচ্ছিল ও লাথি মারছিল। মারধরের কয়েক মিনিটের মধ্যেই সে অচেতন হয়ে পড়ে। এরপর পুলিশ তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে যায়।

লাঠি দিয়ে রেনুকে পেটান এই যুবক

ভিডিওতে আরও দেখা যায়, নীল টি-শার্ট পরে থাকা এক যুবক একটি লাঠি দিয়ে কিছুক্ষণ পরপর পেটাচ্ছিল ও লাথি মারছিল। তার সঙ্গে মেরুন রংয়ের টি-শার্ট পরা আরও এক যুবক রেণুকে লাঠি দিয়ে পেটাচ্ছিল। এদিকে, কালো টি-শার্ট ও লাল রংয়ের প্যান্ট পরা আরও এক যুবক রেণুর মাথা ও মুখে উপর্যুপরি লাঠি দিয়ে বাড়ি দিচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর নীল টি-শার্ট পরা সেই যুবককে ভিড়ের মধ্যে একটু দূরে এসে তার মোবাইল ফোন বের করে সেলফিও তুলতে দেখা গেছে।

তিন যুবক গ্রেফতার

এদিকে, রেণুকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় রবিবার তিন যুবককে গ্রেফতার করেছে বাড্ডা থানা পুলিশ। তারা হলো- জাফর, বাপ্পী ও শাহিন। বাড্ডা থানার পরিদর্শক (অপারেশন) ইয়াসিন গাজী বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেছেন, বাকি আসামিদেরও গ্রেফতারের জন্য অভিযান চালানো হচ্ছে।

ডিএমপি'র গুলশান বিভাগের বাড্ডা জোনের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) আহমেদ হুমায়ূন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা ঘটনাস্থল থেকে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ ও মোবাইল ফোনে ধারণকৃত ভিডিও ফুটেজ পেয়েছি। সেগুলো দেখে জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। আমরা স্কুলের প্রধান শিক্ষকেরও সঙ্গেও কথা বলেছি। ঘটনাস্থলের আশপাশের অনেকের সঙ্গেও কথা বলেছি। আশা করি, শিগগিরই সব আসামিকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে পারবো।’

/এমএ/এমএমজে/

লাইভ

টপ