এটিএম বুথে জালিয়াতির দেড় মাস পরও ধরা পড়েনি সেই বিদেশি

Send
নুরুজ্জামান লাবু
প্রকাশিত : ০০:৩৩, জুলাই ২৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:৩৯, জুলাই ২৩, ২০১৯

ডিআইটি রোড রামপুরার একটি এটিএম বুথে বিদেশি জালিয়াত চক্র। (ফাইল ছবি)ডাচ বাংলা ব্যাংকের বুথ থেকে জালিয়াতি করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনায় তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও পলাতক এক ইউক্রেনিয়ানকে গ্রেফতার করতে পারেনি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। এমনকি আন্তর্জাতিক এই জালিয়াত চক্রটির সঙ্গে বাংলাদেশের কারা জড়িত রয়েছে তাদেরও শনাক্ত করা যায়নি। তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, তারা পলাতক ইউক্রেনের নাগরিক ভিতালিকে গ্রেফতারের চেষ্টা করেছেন। খোঁজ নিয়ে দেখেছেন, বৈধ পথে ভিতালি এখনও কোনও ইমিগ্রেশন পার হয়নি। অবশ্য আগেই তার পাসপোর্টের নম্বর (পাসপোর্ট নম্বর এফই ৮০৪৪৪৮) দেশের সব ইমিগ্রেশন অফিসে কালো তালিকাভুক্ত করে রাখা হয়েছিল।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার শাহিদুর রহমান রিপন বলেন, ‘আমরা পলাতক ভিতালিকে ধরার চেষ্টা করছি। একইসঙ্গে সন্দেহভাজন এক বাংলাদেশি নাগরিককেও ধরার চেষ্টা করছি। জালিয়াত চক্রের কাছ থেকে উদ্ধার করা এটিএম সদৃশ্য কার্ডগুলো ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠিয়েছি। সেগুলোর ফল হাতে পেলে আরও কিছু বিষয় ক্লিয়ার হবো।’

গত ১ জুন সন্ধ্যায় রাজধানীর খিলগাঁও তালতলা এলাকার ডাচবাংলা ব্যাংকের একটি বুথ থেকে জালিয়াতি করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার সময় ইউক্রেনের এক নাগরিককে আটক করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওইদিন রাতেই পান্থপথের হোটেল ওলিও ড্রিম হ্যাভেনে অভিযান চালিয়ে ইউক্রেনের আরও পাঁচ নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়। তারা হলো- ভ্যালেনটাইন (পাসপোর্ট নম্বর ইওয়াই ০৫১৫৬২), ওলেগ (পাসপোর্ট নম্বর ইএক্স ০৮৯৯৬৩), ডেনিস (পাসপোর্ট নম্বর এফএল ০১৯৮৩৪) নাজেরি (পাসপোর্ট নম্বর এফটি ৫০০৫০১), সারগি (পাসপোর্ট নম্বর এফএইচ ৪২৪৩৯৪) ও ভোলোবিহাইন (পাসপোর্ট এফটি ৩৭৯৯৮৩)। অভিযানের খবর পেয়ে ভিতালি (পাসপোর্ট নম্বর এফই ৮০৪৪৪৮) নামের এক ইউক্রেনিয়ান পালিয়ে যায়।

মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রতারক চক্রটি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ৯টি এটিএম বুথ থেকে মোট ১৬ লাখ টাকা টাকা তুলে নেয়। এমন পদ্ধতিতে তারা টাকা তুলেছিল যাতে টাকা উত্তোলনের কোনও তথ্যই ব্যাংকের কেন্দ্রীয় সার্ভারের হিসাবে তারতম্য ঘটেনি। এমনকি কোনও গ্রাহকের ব্যাংক একাউন্ট থেকেও টাকা কাটা যায়নি। অনুসন্ধানে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানতে পারে দুটি দলে ভাগ হয়ে জালিয়াত চক্রের সদস্যরা বাংলাদেশে এসেছিল। একটি চক্রের সদস্যরা জালিয়াতি করে অর্থ হাতিয়ে নিয়ে পালিয়ে গেছে।

আরও খবর : এটিএম বুথ জালিয়াতি: ঢাকায় একাধিক বিদেশি চক্রের সন্ধান

পুলিশ সূত্র জানায়, জালিয়াতির ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ মে মাসের শেষের ১৫ দিন ইউক্রেন থেকে আসা বিদেশি নাগরিকদের তথ্য সংগ্রহ করে। এসময় তারা জানতে পারে সন্দেহভাজন অন্তত তিন নাগরিক এই চক্রের সঙ্গে একইসঙ্গে দেশে এসে জালিয়াতি করে অর্থ হাতিয়ে নিয়ে আবার চলে যায়। সন্দেহভাজন ওই তিন নাগরিক হলো শেরি, রোমান ও দিমিত্রি। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থার মাধ্যমে তাদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানারও চেষ্টা করছে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক এই জালিয়াত চক্রের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বা এফবিআইয়ের সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, জালিয়াত চক্রটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসার পর একজন বাংলাদেশি নাগরিককে তাদের অভ্যর্থনা জানিয়ে সঙ্গে নিয়ে যেতে দেখা যায়। সিসিটিভির ফুটেজ থেকে ওই যুবকের তথ্য সংগ্রহ করে তাকেও শনাক্ত করার চেষ্টা করছে পুলিশ। এরমধ্যে সন্দেহভাজন হিসেবে অন্তত তিন যুবককে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে। তবে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা সেই যুবককে এখনও শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ভিতালি নামে যে ইউক্রেনের নাগরিক এখনও পলাতক রয়েছে, বৈধপথে তার দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার কোনও সুযোগ নেই। চক্রের সহযোগী বাংলাদেশি কোনও নাগরিকের সহযোগিতায় সে এখনও আত্মগোপন করে আছে বলে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন।

আরও খবর : এটিএম বুথে জালিয়াতি করে টাকা তোলার অভিযোগে ৬ বিদেশি আটক

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘জালিয়াত চক্রের সব সদস্যকে শনাক্ত করার পাশাপাশি যে প্রক্রিয়ায় জালিয়াতি করা হয়েছে, তা জানার চেষ্টা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এটিএম বুথের সার্ভার ও উপকরণ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এনসিআর করপোরেশনের কর্মকর্তা ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বৈঠক করা হয়েছে। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে জালিয়াতির সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়াটি জানার চেষ্টা চলছে। একইসঙ্গে গ্রেফতার হওয়া জালিয়াত চক্রের কাছ থেকে যেসব এটিএম সদৃশ্য কার্ড উদ্ধার করা হয়েছিল, তা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ- সিআইডির ফরেনসিক পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। সেই রিপোর্ট হাতে পেলে প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।’

গোয়েন্দা পুলিশের অপর একজন কর্মকর্তা জানান, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় তারা এখন পর্যন্ত জানতে পেরেছেন, টুপকিন নামের একটি ম্যালওয়ারের মাধ্যমে তারা এই জালিয়াতি করেছিল। ডিসকাউন্ট কার্ডের আদলে তৈরি চিপসের মাধ্যমে এটিএম সার্ভার হ্যাক করে অর্থ উত্তোলন করা হয়েছিল। পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে ইউক্রেন থেকে। ইউক্রেনে থাকা জালিয়াত চক্রের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগের মাধ্যমে জালিয়াত চক্রের সদস্যরা ঢাকার এটিএম বুথ থেকে টাকা উত্তোলন করেছিল। এটিএম বুথে থাকা সিসিটিভির ফুটেজেও সবাইকে টাকা উত্তোলনের সময় মোবাইলে কথা বলতে দেখা গেছে।

 

/এনআই/

লাইভ

টপ