মানুষ কেন ‘মব’ হয়

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ০৭:৪১, জুলাই ২৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:০৮, জুলাই ২৩, ২০১৯





গণপিটুনিউত্তেজিত জনতা কোনও এক বিশেষ মুহূর্তে একরকম ভাবতে শুরু করে। অন্য পরিস্থিতিতে যে ব্যক্তি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যৌক্তিক কারণ খুঁজবেন, তিনিই হয়তো উত্তেজনায় গণপিটুনির মতো ঘটনার সঙ্গী হয়ে যান। এই ‘মব’ মানসিকতা মানুষের সহজাত উল্লেখ করে বিশ্লেষকরা বলছেন, জনতার ভিড়ে ব্যক্তির ব্যক্তিসত্তার বিলুপ্তি ঘটে। উত্তেজনার মুহূর্তে বিচ্ছিন্ন, অপরিচিত একেকজন ব্যক্তি মিলে উত্তেজিত জনতার সমষ্টিতে পরিণত হয় এবং বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সক্রিয় হয়ে ওঠে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) বলছে, গত ছয় মাসে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ৩৬ জন। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৩৯।
বাংলা ট্রিবিউনের নিজস্ব গবেষণা অনুযায়ী কেবল গত এপ্রিলে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ১২ জন।
গণপিটুনি নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনার আগে ২০১৫ সালে বেশকিছু ঘটনা ঘটে। সারাদেশে একদিনে ৯ ডাকাত নিহত হওয়ার ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়। এর কিছুদিন পর নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় পুলিশের গাড়ি থেকে ‘ডাকাত’ বলে নামিয়ে দেওয়ার পর কিশোর শামসুদ্দিন মিলনকে (১৬) জনতা গণপিটুনি দিলে ঘটনাস্থলেই মারা যায় সে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “একটি সমাজে পৌনঃপুনিকভাবে ‘মব’ তৈরির ঘটনা কেন ঘটে, কীভাবে ঘটে তার ৩টি ব্যাখ্যা আছে। প্রথমটি হচ্ছে মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা। যখন সমাজে ‘মোরাল প্যানিক’ ছড়িয়ে পড়ে তখন ‘মব’ তৈরি হয়। ‘মোরাল প্যানিক’ হচ্ছে এমন ধারণা বা ভীতি যা সমাজের বড় অংশের মানুষের জীবনযাপনে ভয়াবহ কিছু তৈরির হুমকি নিয়ে হাজির হয়। এগুলো বিভিন্ন কারণে ছড়ানো হয়। ওই অবস্থায় ‘ইভিল’ মোকাবিলার নামে, লোকজন দল বেঁধে ওই ইভিলের প্রতীক হিসেবে একজন মানুষকে আক্রমণ করে, হত্যা করে।”
তিনি বলেন, ‘দ্বিতীয় ব্যাখ্যা হচ্ছে সামাজিক। একটা সমাজে যখন সামাজিক বাঁধনগুলো দুর্বল হয়ে যায় তখন দেখা যায়, মানুষ আর এই ধরনের ঘটনার যে মানবিক একটা দিক আছে, তারা যে অন্য একজন মানুষকে হত্যা করছে তা ভাবে না। মানুষ ভাবে না, কেননা ইতোমধ্যে বিভিন্নভাবে, আইনবহির্ভূতভাবে হত্যার একধরনের বৈধতা তৈরি হয়েছে।”
অধ্যাপক রীয়াজ বলেন, “তৃতীয় ব্যাখ্যা হচ্ছে রাজনৈতিক। যখন আইন-আদালত, পুলিশ, সরকারের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ওপরে মানুষের আর কোনও আস্থা থাকে না এবং তারা ধরে নেন যে, এই ব্যবস্থায় সুবিচার হবে না, ফলে তাকেই এই ‘বিচার’ করতে হবে। এবং দ্বিতীয়ত যখন রাষ্ট্র, সরকার ও প্রভাবশালীরা এই ধরনের ঘটনাকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উসকে দেয়, এই ধরনের ঘটনার সঙ্গে যুক্তদের বিচার হয় না, উপরন্তু ক্ষমতাসীনদের আনুকূল্য পায়। সেটা অন্যদের ‘মব’ হয়ে উঠতে উৎসাহী করে।”
পিটারসন ও এলফোর্ডের গবেষণা উল্লেখ করে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক তাজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “মানুষ যখন একত্রিত হয় তারা বিক্ষিপ্ত ও অসংবদ্ধ হলেও তারা পারস্পরিকভাবে পরিচিত হয়ে ওঠে। সেখানে যৌথ-মন তৈরি হয় এবং তারা সম্মোহন সংক্রমণের শিকার হয়। যে সম্মোহিত হয়, সে যুক্তি ছাড়া নির্বোধের মতো অনুগত হয়ে কাজ করে। ‘মব’-এর ভেতর যারা লিড করে তাদের আনুগত্য গ্রহণ করেই যৌথ-মন তৈরি হয়।”
তিনি বলেন, ‘বেশির ভাগ মানুষ সমাজের স্রোতধারা ও অবস্থানের সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করে নিয়ে চলে। সমাজের মতের সঙ্গে একমত হয়ে তার নিজের ন্যায়-অন্যায়ের বোধ বলে একটা বিষয় আছে সেটা ভুলে যায়।”
এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘মানুষের কতকগুলো প্রবৃত্তি আছে। মনোবিজ্ঞানী ফ্রয়েডের কথা অনুযায়ী ‘ডেথ ইন্সটিংক্ট’ ও ‘লিভিং ইন্সটিংক্ট’ কাজ করে মানুষের মনে। অর্থাৎ সে নিজে বাঁচতে চায়, অন্যকে বাঁচাতে চায়। যেমন-তেমন মানুষ নিজে মরতে চায় ও অন্যদের মারতে চায়। ‘ডেথ ইন্সটিংক্ট’ প্রবল হয়ে গেলে খামখেয়ালে বিধ্বংসী আচরণ করে তারা।’

/এইচআই/এমএমজে/

লাইভ

টপ