‘সরকারকে জানান, ডেঙ্গু সব শেষ করে দেবে’

Send
জাকিয়া আহমেদ
প্রকাশিত : ১৮:৪৭, জুলাই ২৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:৩৪, জুলাই ২৪, ২০১৯

ডেঙ্গু মশাআপনাদের তো অনেক লোক আছে, আপনারা ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে যান, সংবাদ করেন। সেটা সরকারকে জানান, নয়তো ডেঙ্গু সব শেষ করে দেবে। এ আকুতি উজ্জ্বল বিশ্বাস নামে এক বাবার। তার এক বছর আট মাস বয়সী ছেলে সৌম্য বিশ্বাসের মৃত্যুর পর হতবিহ্বল এই বাবা ফোনে বাংলা ট্রিবিউনকে এসব কথা বলেন।

উজ্জ্বল বিশ্বাস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার ছেলেটা গেছে। আমি আমার ছেলেকে কোলের মধ্যে নিয়ে গ্রামের বাড়ি যশোর যাচ্ছি। ছেলেকে রেখে আসবো, কিন্তু আর কোনও বাবার যেন এমন পরিণতি না হয়, কারও কোল যেন খালি না হয়, সে ব্যবস্থা করেন আপনারা।’

আপনারা সাংবাদিক, আপনারা সরকারকে এসব খবর দেন; তারা যেন ডেঙ্গু নিয়ে ব্যবস্থা নেয়, নয়তো আরও অনেক বাবার কোল এভাবে খালি হয়ে যাবে। এসব কথা বলতে বলতেই ডুকরে কেঁদে ওঠেন তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উজ্জ্বল বিশ্বাসের ছেলে সৌম্য বিশ্বাস আজ মঙ্গলবার (২৩ জুলাই) মহাখালীতে অবস্থিত ইউনিভার্সেল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সকাল পৌনে ১১টার দিকে মারা যায়। বিষয়টি বাংলা ট্রিবিউনকে নিশ্চিত করেছেন হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্তী।

বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, গত পরশু শিশুটিকে এই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাকে পিআইসিইউতে (পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট) রাখা হলেও অবস্থা ছিল খুব ক্রিটিক্যাল। তাকে আরেকটি হাসপাতাল থেকে ডেঙ্গু সংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে এখানে ভর্তি করা হয়েছিল। শিশুটি ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে আক্রান্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত আজ সকাল পৌনে ১১টার দিকে মারা যায়।
ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্তী বলেন, ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম হচ্ছে ডেঙ্গুর সবচেয়ে খারাপ অবস্থা। এতে আক্রান্তের রক্তচাপ থাকে না, এ কারণে মাল্টি অর্গান ডিসফাংশন হয়। সৌম্যর ফুসফুস দিয়ে রক্ত বের হচ্ছিল, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে বলা হয় ‘পালমোনারি হেমোরেজ’।
এ নিয়ে এ হাসপাতালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মোট চার শিশুর মৃত্যু হলো বলেও জানান ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্তী।

এর আগে শিশুটির বাবা উজ্জ্বল বিশ্বাস জানিয়েছিলেন, তার শিশুসন্তানের ডেঙ্গু ধরা পড়ার পর উত্তর বাড্ডার একটা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিছুটা সুস্থ হচ্ছে বলেও জানিয়ে ছিলেন ডাক্তাররা। তার পরের দিন ছেলেকে হাসপাতাল থেকে বাড়ি নিয়ে আসার কথা থাকলেও ওইদিন সকালেই শিশুটির ডায়রিয়া শুরু হয়। এরপর অন্য হাসপাতালে নিয়ে আরও উন্নত চিকিৎসা দেওয়ার কথা বলেন সেখানকার চিকিৎসকরা। এরপর লালমাটিয়ার মিলেনিয়াম হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও সেখানে পিআইসিইউ না থাকায় আবারও অন্য হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

উজ্জ্বল বিশ্বাস অভিযোগ করেন, মিলেনিয়াম হাসপাতালে তার সন্তানকে ভর্তির পর রাখা হয়েছিল মাত্র একঘণ্টা। অথচ এর জন্যই তার কাছে ১৪ হাজার টাকার বিল নেওয়া হয়েছে।

ঢাকায় চিকিৎসার নামে বিশাল বিশাল সাইনবোর্ড থাকলেও বেশিরভাগ হাসপাতালে পিআইসিইউ ( পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট) সুবিধা না থাকায় যে কষ্ট করেছেন তার বর্ণনাও দেন ডেঙ্গু রোগে সন্তান হারানো এই বাবা।

তিনি বলেন, ‘গত শুক্রবার রাত ১১টার দিকে মিলেনিয়াম হাসপাতাল থেকে ডিসচার্জ নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে আমার এই শিশু সন্তানটিকে নিয়ে আরও ৬ থেকে ৭টি হাসপাতালে ঘুরেছি। কুর্মিটোলা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর ডাক্তার বললো, ভর্তি করা যাবে কিন্তু পিআইসিইউ নেই। যদি চিকিৎসা না হয় তাহলে সেখানে ভর্তি করায়ে কী হবে ভেবে ছেলেকে নিয়ে দৌড়াইতে থাকলাম। ঢাকার অন্তত ছয় থেকে সাতটা হাসপাতাল ঘুরলাম, কিন্তু কোনোখানে ওই মেশিন ( পিআইসিইউ) নাই। তারপর আয়েশা মেমোরিয়াল ( ইউনিভার্সেল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল) হাসপাতালের কথা জানলাম। ওখানে মেশিন ছিল কিন্তু ছেলেকে বাঁচাতে পারলাম না।’

পুত্রশোকে কাতর উজ্জ্বল বিশ্বাস বলেন, ‘আমি ক্লান্ত, আর কথা বলার মতো শক্তি আমার নাই। তবে অনুরোধ, আপনাদের লোকজনদের ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠান, দেখবেন ডেঙ্গুর কী অবস্থা। আর আপনাদের রিপোর্টটা সরকারের কাছে পাঠায়ে দেন, ভালো করে লেখেন। আমার ছেলে গেছে, তাকে আর ফেরত পাবো না, দুঃখটাও আমার। কিন্তু, আপনারা রিপোর্ট করে সরকারের কাছে পাঠান, তারা যেন ব্যবস্থা নেয়, নয়তো ডেঙ্গু কিন্তু সব শেষ করে দেবে।’

/জেএ/টিএন/এমওএফ/

লাইভ

টপ