ডেঙ্গু নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণেই সময় যায় আইইডিসিআরের

Send
জাকিয়া আহমেদ
প্রকাশিত : ১২:০০, জুলাই ২৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:২৬, জুলাই ২৪, ২০১৯

ডেঙ্গু ও আইইডিসিআর

সরকারের স্বাস্থ্য অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে পাঁচ জনের মৃত্যু হয়েছে। যেখানে বিভিন্ন হাসপাতাল ও রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে,  ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা ২৮ জন।  অথচ সরকারি হিসাবে এসব মৃত্যুর খবর একেবারেই নেই। স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন্স সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে জানা যায়, তারা ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সব তথ্য পায় রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) থেকে।  একাধিক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘আইইডিসিআর সঠিক সময়ে কোনও তথ্য দিতে পারে না। বিচার-বিশ্লেষণ করে তারা যদি আজকের তথ্য তিন সপ্তাহ পরে দেয়, তবে সে বিচার-বিশ্লেষণের দরকার কী? তাহলে প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিতে নিতে সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করবে।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এলাকাভিত্তিক উপাত্ত পাওয়া গেলে অগ্রাধিকার দিয়ে কার্যক্রম বা পরিকল্পনা করা যেতো। এ বছর ডেঙ্গু কেমন হবে আইইডিসিআর যদি সেই প্রেডিকশনটা সময়মতো দিতো তাহলে প্রস্তুতি আরও ভালো হতো। সার্ভিল্যান্সের মূল কাজই হলো এপিডেমিক ডিটেকশন, প্রেডিকশন ও  মনিটরিং। তারা তা কিছুই করেনি। 

হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন্স সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের হিসাব অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার ১৩টি সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪৭৩ জন। আর বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছেন ১৩১ জন। সরকারি ও  বেসরকারি মিলিয়ে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা মোট ৭ হাজার ৭৬৬  জন।

বাংলা ট্রিবিউনের অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে গত সপ্তাহে হাসি সমাদ্দার নামের বক্ষব্যাধি হাসপাতালের একজন সেবিকা মারা যান। তিনি ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে আক্রান্ত ছিলেন। এই মৃত্যুর তথ্য  নেই সরকারি হিসাবে। 

মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্তী জানান, তাদের হাসপাতালে চার জনের মৃত্যু হয়েছে। কন্ট্রোল রুমের তালিকাতে নেই এ চার জনের মৃত্যুর তথ্য।  

পুলিশ কর্মচারী হাসপাতালের পরিচালক ডা. এবিএম শরীফ উদ্দিন বলেন, তাদের হাসপাতালে ১৯ জুন জাকিয়া সুলতানা নামের একজন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এই মৃত্যুর তথ্যও নেই স্বাস্থ্য অধিদফতরের তালিকায়।

এছাড়া ২৪ জুন পাঁচ  বছরের সাবিকুন নাহার,  ৫ জুলাই সাত বছর বয়সী ইরতিজা শাহাদ প্রত্যয় এবং  ১৫ জুলাই চার বছরের লাবণ্য আলিনার  মৃত্যুর তথ্য নেই কন্ট্রোল রুমের তালিকায়। 

চিকিৎসকরা বলছেন, এবার ডেঙ্গুর ধরন বদলেছে। তীব্র জ্বর, মাথাব্যথা, গায়ে র‌্যাশ ও বমি বমি ভাবকেই আগে ডেঙ্গুর লক্ষণ ছিল। এখন ডেঙ্গু হলে আগের কোনও লক্ষণ আর দেখা যায় না। এবার ডেঙ্গু হলেই রোগীর হার্ট, কিডনি ও ব্রেন আক্রান্ত হচ্ছে। যে কারণে রোগীর মৃত্যুঝুঁকি আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। একইসঙ্গে রোগী দ্রুত শকে চলে যাওয়ারও আশঙ্কা বেড়েছে। এ কারণে এবার বেশিরভাগ ডেঙ্গু রোগীরই মৃত্যু হয়েছে ‘ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে’। শিশুদের বেলায় এটি আরও ভয়ঙ্কর বলেও চিকিৎসকরা জানান।

তারা বলছেন, আগে জ্বর হলে তিন দিন অপেক্ষা করতে বলা হতো। এরপরও না কমলে পরীক্ষা করাতে বলা হতো। কিন্তু এবার সে সুযোগ নেই। জ্বর হলে প্রথম দিনেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

প্রকৃত মৃত্যুর খবর কেন সরকারি হিসাবে আসে না—জানতে চাইলে কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ডা. আয়েশা আখতার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এটা আইইডিসিআর থেকে আমাদের জানানো হয়। তারা ডিক্লেয়ার করলেই কেবল আমরা বলতে পারি। তাদের একটি পৃথক ‘ডেথ রিভিউ কমিটি’ রয়েছে, যারা এসব মৃত্যু তদন্ত করে প্রকাশ করে।’

তিনি  আরও বলেন, ‘বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার সব খবরই আমরা জানি। কিন্তু আইইডিসিআরের কাছে যখন সরাসরি খবর চলে যায় এবং তারা যেহেতু বিষয়টি পুরোটা নিয়ন্ত্রণ করে, তাই তারা যদি কনফার্ম না করে, তাহলে আমরা তা  দিতে পারি না।’

এ বিষয়ে জানতে ডেথ রিভিউ কমিটির প্রধান ও প্রতিষ্ঠানটি পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরাকে একাধিকবার ফোন করে এবং পরিচয় দিয়ে এসএমএস করলেও তিনি সাড়া দেননি।

তবে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত মানুষের সঠিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করা উচিত বলে মন্তব্য এ প্রতিষ্ঠানের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমানের।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য অধিদফতরের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ‘গত বছরে আইইডিসিআর ম্যাপিং করেছিল কিনা জানি না। যদি করতো তাহলে বুঝতে পারতো কোন এলাকায় কত মানুষ আক্রান্ত হয়েছিল। বুঝতে পারতো এলাকা শিফট করেছে কিনা। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ক্লিনিক, চেম্বার থেকে এ রোগ সংক্রান্ত তথ্য তারা কীভাবে সংগ্রহ করছে, অনেক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয় না, অনেকে চিকিৎসা নিয়ে বাসায় চলে যান—এসব তথ্য তাদের কাছে থাকে অথবা জানার জন্য তারা কী ব্যবস্থা নিয়েছে, তা আমাদের জানা নেই।’

স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনের সভাপতি ও বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ডা. রশীদ-ই-মাহবুব বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও মশা নিধনে সরকার পুরোপুরি ব্যর্থ। সরকারের উচিত এখন মানুষকে সঠিক তথ্য জানানো।

/জেএ/এসটি/এমএমজে/

লাইভ

টপ