‘৩৪ দিন বয়সী ছেলেটাকেই এবারের ঈদ উৎসর্গ করলাম’

Send
জাকিয়া আহমেদ
প্রকাশিত : ০০:১২, আগস্ট ১৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৫১, আগস্ট ১৩, ২০১৯

বোন মুবাশ্বিরার আঁকা ছবি ‘মুসার পরিবার’

‘ছোট্ট মেয়েটা এতদিন জানতো না মানুষ মারা গেলে কী হয়, কোথায় যায়, কীভাবে রাখা হয়। আজ তাকে নিয়ে গেলাম, কবরস্থানে ঢোকার মুখেই ফুল পাওয়া যাচ্ছিল। সে খুব খুশি হলো যে ভাইয়ের হাতে ফুল দিয়ে সে ঈদ মোবারক বলবে। ফুল নিতে গিয়ে কী মনে করে সেখানে পরে থাকা গোলাপের পাঁপড়িও নিয়ে গেল। সে ভেবেছিল, ভাই ঘুমিয়ে আছে, এতদিন পর ভাইয়ের চেহারা দেখতে পাবে; কিন্তু ভাইয়ের কবরের সামনে গিয়ে সে আর তার চেহারা দেখতে পেলো না। মাটি, মাটির ওপর ঘাস, তার নিচে ভাই। সাত বছরের মেয়েটা ভাবছিল, ওই ঘাসের ভেতরে মাটির নিচে ভাইটা কী করে আছে?, ভাইটা ব্যথা পাচ্ছে- এসব ভাবতে ভাবতে সে কান্না করে যাচ্ছে, কেবলই কান্না করে যাচ্ছে। তারপর বললাম, ভাইকে ঈদ মোবারক বলো, তখন মেয়েটা ভাইয়ের কবরে ফুল ছিটিয়ে বললো—ভাইয়া ঈদ মোবারক।’

কান্নাভেজা কণ্ঠে মোবাইল ফোনে এ প্রতিবেদককে এসব কথা বলেন সানজিদা আলম আঁখি। গত ২০ জুলাই তার ৩৪ দিন বয়সী ছেলে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা যায় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে। সোমবার ( ১২ আগস্ট) সকালে নিজের ফেসবুকে ফুল ছিটানো কবরের সেই ছবি পোস্ট করেছেন সানজিদা, পরে সে ছবিকে প্রোফাইল পিকচার করেছেন।

কী করলেন সারা দিন জানতে চাইতেই সানজিদা বলেন, ‘সকাল বেলা নামাজ পড়লো ওর বাবা। তারপর তিনজন মিলে আজিমপুর কবরস্থানে গেলাম, যেখানে আমার ছেলেটাকে একা রেখে এসেছি। সেখানে গিয়ে ওর সঙ্গে দেখা করলাম, দোয়া করে এলাম। কিন্তু মেয়েটা তারপর থেকেই কেমন যেন হয়ে আছে। ওতো এতদিন বুঝতে পারেনি মারা যাওয়ার পর কী হয়, এই প্রথম আজিমপুর কবরস্থানে ভাইয়ের কবরের সামনে গেল। সে দেখলো তার ভাই মাটিতে এবং মাটির ভেতরে ভাই শুয়ে আছে, তাকে দেখতে পারছে না-এই ফিলিংগুলো তো এর আগে হয়নি তার। আমার সাত বছরের মেয়েটা কবরস্থান থেকে এসে চুপ হয়ে আছে, এখন ওকে নিয়েই ব্যস্ত সবাই।’

‘আমার মেয়ে মুবাশ্বিরা তখন থেকেই বলছিল, আমার ভাইটা মাটিতে শুয়ে আছে কেন, ওকে কেন বাসায় নিয়ে যাচ্ছি না...। এরপর বাসায় এসে সে এঁকেছে মুসার পরিবারের ছবি। তাতে বাবা-মা ও মুবাশ্বিরার সঙ্গে মুসাও আছে।’

মুসার জন্মের পর পুরো পরিবারের একসঙ্গে তোলা ছবি। এটাই এখন সম্বল তাদের।

সানজিদা আলম আঁখি বলেন, মুসার জন্মের আগে থেকেই মুবাশ্বিরার আনন্দ ছিল দেখার মতো। একটা ছোট বাচ্চা ঘরে আসবে, সেটা ওর ভাই হবে- এটা বোঝানোর পর থেকেই তার অপেক্ষা ছিল, সে কেমন করে ভাইকে নিয়ে থাকবে, কেমন করে তাকে সাজাবে, ভাই-বোন একইরকম ড্রেস পরবে, স্কুলে নিয়ে যাবে, ওকে খাইয়ে দেবে—ওর পুরো দায়িত্বটাই যেন নিয়েছিল মুবাশ্বিরা।

‘‘মুবাশ্বিরাকে বলতাম, ‘তুমি যা করবে ভাইকে ঠিক তা-ই করাবে’। সেই থেকে ভাইকে নিয়ে তার স্বপ্ন শুরু। ছেলেটার জন্মের পর ওই যেন সবকিছু করার জন্য পাগল হয়ে থাকতো, এমনকি আমাকে আর ওর বাবাকেও ভাইকে ধরতে দিতে চাইতো না’’- ফোনের ওপাশে বলে যান সানজিদা।
বলতে বলতেই গলার স্বর ওঠানামা করে তার। কখনও কাঁদছেন, কখনও কান্না চাপার চেষ্টা করছেন সদ্য সন্তান হারানো এক প্রসূতি মা। স্পষ্ট বোঝা যায় চোখের সামনে আলোর ভেলায় যেন আবারও নেমে এসেছে মুসা, মা তাকে দেখতে পাচ্ছেন প্রাণের আলোয়।

‘এবারের কোরবানির ঈদটা ওকেই উৎসর্গ করলাম, আর কিছু বলার নেই। আমার ৩৪ দিন বয়সী দুধের ছেলেকে যখন আল্লাহ এতই পছন্দ করলেন, সেটাই মেনে নিলাম। এখন নিজেকে তৈরি করছি আমার ছেলেটার কাছে যাওয়ার জন্য’—সানজিদার কণ্ঠস্বর আবারও ভারী হয়ে ওঠে।
‘ছেলেটাকে দেখতে পাচ্ছি না, ধরতে পাচ্ছি না, ছুঁতে পাচ্ছি না। কিন্তু একদিন তো আমি যাবো ওর কাছে, ও অপেক্ষা করছে আমার জন্য। একদিন দেখবো, মা বলে ডাকবে- ওই দিনগুলোর অপেক্ষায় আছি।

 

 

/টিএন/এমওএফ/

লাইভ

টপ