অন্য ইস্যুতে চাপা পড়ে যায় ধর্ষণের ঘটনা

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ১৪:১৪, আগস্ট ১৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:০১, আগস্ট ১৩, ২০১৯

ধর্ষণনারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় আট বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে মসজিদের ইমাম মো.ফজলুর রহমান ওরফে রফিকুল ইসলামকে (৪৫) গত ৭ আগস্ট গ্রেফতার করেন র‌্যাব ১১-এর সদস্যরা। একই দিনে সিলেটের বিশ্বনাথে এক নারীর সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক গড়ে তোলার পর তার মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগে আলম মিয়া (৩০) নামে এক যুবককে আটক করে পুলিশ।

বছরের শুরু থেকেই একের পর এক শিশু ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ায় আতঙ্কিত হয়ে ওঠে নাগরিক সমাজ। ১ জানুয়ারি ২০১৮ থেকে ১৫ মে ২০১৯ পর্যন্ত বাংলা ট্রিবিউনের রিসার্চ সেলের গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৮ সালে বছরজুড়ে যে পরিমাণ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, এ বছরের প্রথম সাড়ে চার মাসেই প্রায় তার সমপরিমাণ ঘটনা ঘটেছে।

এ সময় বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক সংগঠন মাঠে নেমে ধর্ষণ ঘটনার প্রতিবাদ করে ও তা প্রতিরোধের ডাক দেয়। কিন্তু সেই প্রতিবাদ ও আন্দোলনের ধারাবাহিকতা না থাকাকেই সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করছেন সমাজ গবেষক ও অধিকারকর্মীরা। আন্দোলন থেমে যাওয়া মানেই ধর্ষণ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমেছে, পরিসংখ্যান তা বলছে না।

সমাজ গবেষক ও মনোবিশ্লেষকরা বলছেন, গত তিন বছরে শিশু ধর্ষণ আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। ২০১৯ সালে সেটি মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। একইসঙ্গে বেড়েছে ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে সহিংসতা ঘটানোর পরিমাণ। তারা মনে করেন— ধর্ষণ ঘটনার শুরুতেই প্রশাসনের গাফিলতি আর বিচারহীনতার কারণে বাড়ছে ধর্ষণের সংখ্যা। একইসঙ্গে প্রতিরোধ জারি না রাখতে পারাও ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ।
৯টি পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের বিশ্লেষণ ও প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব মনিটরিং সেলের তথ্য অনুযায়ী আইন ও সালিশ কেন্দ্র বলছে, কেবল গত জুলাই মাসেই ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৬১ জন। এরমধ্যে ১২৮ জন একক ও ৩১টি সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা। এদিকে, মাত্র তিনটি পত্রিকার আধেয় বিশ্লেষণ করে বাংলা ট্রিবিউনের গবেষণা বিভাগ বলছে— কেবল জুলাই মাসে দেশে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ১১৫টি, এরমধ্যে শিশু ৭০ জন, শিক্ষার্থী ৫৯ জন। আর এ বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে দেশে মোট ধর্ষণের ঘটনা ৭৩১টি, এরমধ্যে ৩৮৬ জনই শিশু।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সেভ দ্য চিলড্রেনের চাইল্ড রাইটস গভর্নেন্স অ্যান্ড চাইল্ড প্রোটেকশন সেক্টরের পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘একটা সমস্যা এসে আরেকটা সমস্যাকে আলোচনা থেকে আড়াল করে দিলে তাতে পুরনো সমস্যাটা আড়ালে আরও বেশি প্রবল হয়ে উঠতে পারে। জাতীয় আলোচনায় নতুন নতুন দুর্যোগ বা ইস্যু আসাতে শিশু ধর্ষণের মতো গর্হিত অপরাধগুলোতে যদি আমরা উদ্বিগ্ন, শঙ্কিত ও প্রতিবাদী না হই, তবে একসময় এই অপরাধগুলো গা সওয়া হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।’

তিনি বলেন, ‘ধর্ষণ পুরোপুরি বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত সামাজিক আন্দোলন, প্রতিবাদ ও জনসচেতনতার কাজ চলমান রাখতে হবে। পাশাপাশি সরকার ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দায়িত্ব পালনে কঠোরভাবে জবাবদিহিi আওতায় আনতে হবে।’ আবদুল্লাহ আল মামুন আরও বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে বড় শহরগুলো ফাঁকা হয়ে গেলে শিশুদের সুরক্ষায় বাড়তি নজরদারির প্রতি অভিভাবকদের ও আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বেশি মনোযোগী হতে হবে।’

‘উই ক্যান’-এর নির্বাহী সমন্বয়ক জিনাত আরা হক বলেন, ‘বাইরে থেকে প্রতিবাদ হচ্ছে না। যারা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, তারা তাদের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। ইতিবাচক বিষয় হলো যে, আমি নিজে লক্ষ করেছি, ধর্ষণের শিকার নারীরা অনেকেই যথেষ্ট পরিমাণে শক্ত।’ তিনি আরও বলেন, ‘বেসরকারি সংস্থাগুলো (এনজিও) বেশিই প্রকল্পভিত্তিক। তারা যাদের কাছ থেকে ফান্ড পায়, সেই দাতা সংস্থা সংগঠনগুলোকে (এনজিও) খুব বেশি সাহসী অবস্থানে যেতে নিরুৎসাহিত করে। সামাজিক আন্দোলনে যুক্ত সংগঠনগুলো বরং একা একা চেষ্টা করে যাচ্ছে।’

সরকারের তরফে বিষয়টিকে গুরুত্ব না দেওয়া ভয়াবহ উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘মান্ধাতা আমলের আইন, দুর্নীতিবাজ প্রশাসন ও জবাবদিহিমুক্ত পুলিশের কারণে এ অবস্থা দিন দিন আরও খারাপের দিকে যাবে।’

অধিকার বিষয়ে কাজ করেন যারা, সেসব প্রতিষ্ঠান পরিস্থিতি প্রতিরোধে ব্যর্থ হচ্ছে কিনা, জানতে চাইলে জিনাত আরা হক বলেন, ‘ব্যর্থই ছিলাম, মাঝে মাঝে সবাই একটু কাভারেজ দেয়। তাই মনে হয়, হঠাৎ করে বোধহয় ধর্ষণ বাড়ছে, আসলে দিনে দিনে বেড়ে গেছে।’

নারী অধিকার কর্মী খুশি কবীর বলেন, ‘আমাদের জীবনে একটার পর একটা ঘটনা ঘটছে। কিন্তু কোনোটিতেই আমরা প্রতিরোধকারী হয়ে উঠতে পারছি না। এই না পারার কারণ আমাদের বিচ্ছিন্নতা।’ তিনি বলেন, ‘ধর্ষণ সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সমস্যা হয়ে উঠছে। যখন-তখন এটিকে ইস্যুকেন্দ্রিক আন্দোলন হিসেবে নিলে তো পরিস্থিতি বদলাবে না। আসলে এসব প্রতিরোধের ক্ষেত্রে ধারাবাহিক আন্দোলনের কোনও বিকল্প নেই।’

/এপিএইচ/এমওএফ/

লাইভ

টপ