‘ঢিলে-ঢালা’ কাজ করলে ডেঙ্গু কোনদিকে যাবে বলা যায় না

Send
জাকিয়া আহমেদ
প্রকাশিত : ০০:৩৭, আগস্ট ১৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:৩১, আগস্ট ১৬, ২০১৯

ডেঙ্গু রোগী

গত তিনদিন ধরেই থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। এভাবেই যদি বৃষ্টি চলতে থাকে তাহলে দেশজুড়ে বাড়তে পারে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। বিশেষজ্ঞরা সে আশঙ্কাই করছেন। তারা বলছেন, মুষলধারে বৃষ্টি হলে সব ধুয়ে মুছে যায়। কিন্তু এভাবে যদি থেমে থেমে বৃষ্টি হয় তাহলে বৃষ্টির পানি জমা হবে আর সেসব জায়গায় থাকা এডিস মশার ডিম ফুটে বের হওয়া লার্ভা দ্রুত পরিণত হয়ে মশায় রূপান্তরিত হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশকে ডেঙ্গু মুক্ত করতে হলে সিটি করপোরেশনসহ প্রত্যেককে তার নিজের কাজ করতে হবে, প্রত্যেক নাগরিককে সচেতন হতে হবে নিজের বাড়ির বিষয়ে। কিন্তু ঢিলে-ঢালা কাজ করলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে সেটা বলা যাচ্ছে না।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের কন্ট্রোল রুমের তালিকা থেকে দেখা যায়, গত ৭ আগস্ট ঢাকার ভেতরে রোগী ছিল এক হাজার ২৭৫ জন আর ঢাকার বাইরে রোগী ছিল এক হাজার ১৫৩ জন, ৮ আগস্ট ঢাকার ভেতরে রোগী ছিল এক হাজার ১৫৯ আর ঢাকার বাইরে একহাজার এক হাজার ১৬৭ জন, ৯ আগস্ট ঢাকার ভেতরে রোগী ছিল ৯৫৭ জন আর ঢাকার বাইরে রোগী ছিল এক হাজার ৫৫ জন, ১০ আগস্ট ঢাকার ভেতরে রোগী ছিল এক হাজার ৬৫ জন আর ঢাকার বাইরে রোগী ছিল এক হাজার ১১১ জন, ১১ আগস্ট  ঢাকার ভেতরে রোগী ছিল ৯৮১ জন আর ঢাকার বাইরে রোগী ছিল এক হাজার ৩৫৩ জন,  ১২ আগস্ট ঢাকার ভেতরে রোগী আছে ৮৪২ জন আর ঢাকার বাইরে রোগী আছে এক হাজার ২৫১ জন এবং আজ ১৩ আগস্ট ঢাকার ভেতরে রোগী আছে ৫৯৯ জন আর ঢাকার বাইরে রোগী রয়েছে ৬০১ জন। গত সাত আগস্টে ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে রোগী সংখ্যা ছিল মোট দুই হাজার ৪২৮ জন, ৮ আগস্টে ছিল দুই হাজার ৩২৬ জন, ৯ আগস্টে ছিল দুই হাজার দুই জন, ১০ আগস্টে ছিল দুই হাজার ১৭৬ জন, ১১ আগস্টে ছিল দুই হাজার ৩৩৪ জন, ১২ আগস্টে ছিল দুই হাজার ৯৩ জন, গত ১৩ আগস্ট ছিল এক হাজার ২০০ জন এবং আজ ( ১৪ আগস্ট) রোগীর সংখ্যা আবার বেড়ে হয়েছে মোট নতুন রোগীর সংখ্যা এক হাজার ৮৮০ জন। গত ৮ আগস্ট থেকে কেবলমাত্র গতকালই ( ১৩ আগস্ট)রোগীর সংখ্যা কম ছিল।

আবার গত জুলাই মাসে মোট রোগীর সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ২৫৩ জন আর আজ ( ১৪ আগস্ট) অর্থাৎ চলতি মাসের ১৫ দিনেই প্রায় ১০ হাজার বেড়ে সে সংখ্যা হয়েছে ২৭ হাজার ৮৯০ জন।

হাসপাতালের ভেতরে জায়গা নেই, তাই বাইরের বারান্দায় বেঞ্চে মশারি বেঁধে চিকিৎসা নিচ্ছেন এক ডেঙ্গু রোগী

সামনে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তে পারে নাকি কমবে এমন প্রশ্নে স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা বলেন, গত বছরে দেশে ডেঙ্গু রোগের পিক টাইম ছিল সেপ্টেম্বরে। আমি এখনও তাই এ বিষয়ে দৃঢ়ভাবে কোনও মন্তব্য করতে পারছি না যে এটা বাড়বে না কমবে।

সবকিছু নির্ভর করছে আসলে যেসব জায়গাতে মশা উৎপন্ন হচ্ছে সেসব জায়গাগুলোতে যদি সাঁড়াশি অভিযান চালানো যায় তাহলেই এটা কমার সম্ভবনা আছে, কিন্তু ঢিলে-ঢালা ভাবে কাজ করলে ডেঙ্গু কোনদিকে যাবে সেটা বলা যায় না।

অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা বলেন, ঈদের আগে আগে হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর ভর্তি বেড়েছিল, হয়তো ঈদের সময়ে ভর্তি হতে না পারা শঙ্কা থেকেও তারা ঝুঁকি নিতে চাননি। আবার ঈদের আগের দিন দেখা গেল ভর্তি কমে গেছে, কিন্তু আজ ( ১৪ আগসট) আবার সেই পুরনো অবস্থাটাই ফিরে এসেছে। সেজন্য আবার দেখা যাচ্ছে গতকালের চেয়ে আজ রোগী বেশি যদিও সেটা পরশু দিনের চেয়ে বেশি না। তাই এভাবে দুই দিন, তিনদিনের হিসাব দিয়ে বলা যাবে না কিছু।  

তবে বৃষ্টি হলে ডেঙ্গু বাড়বেই মন্তব্য করে অধ্যাপক ডা.সানিয়া তহমিনা বলেন,থেমে থেমে বৃষ্টি ডেঙ্গুর জন্য রিস্ক ফ্যাক্টর, এভাবে বৃষ্টি হলে পানি জমবে আবার ঢাকা শহরের তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রির ওপরে থাকে, যেটা কিনা এডিস মশার ব্রিডিং এর জন্য ভালো একটি টেমপারাচার—বলেন ডা. সানিয়া তহমিনা।  সুতরাং কোনও সুসংবাদ দেওয়া খুব মুশকিল, বলেন তিনি।

আর হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন্স সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার বলেন,আগামী ১০দিন পর্যবেক্ষণ করে হয়তো বলা সম্ভব হবে ডেঙ্গু পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে দাঁড়াবে।

ডেঙ্গু মশা

অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা জানান, বর্তমানে দেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে মোট ভর্তি থাকা রোগীর সংখ্যা সাত হাজার ৮৬৯ জন। এর মধ্যে ঢাকার ৪০টি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে আছেন চার হাজার ১৪৩ জন আর ঢাকার বাইরে আছেন তিন হাজার ৭২৬ জন। ডেঙ্গুতে এ পর্যন্ত মোট ৪০ জন মারা গেছেন বলে জানাচ্ছে কন্ট্রোল রুম। এর মধ্যে এপ্রিলে দুই জন, জুনে চার জন, জুলাই মাসে ২৪ জন এবং চলতি আগস্ট মাসে ১০ জন, যদিও বেসরকারি হিসেবে এ সংখ্যা আরও অনেক বেশি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এভাবে যদি থেমে থেমে বৃষ্টি হয় তাহলে ডেঙ্গু বাড়ার শঙ্কা আছে। তিনি বলেন, ‘বৃষ্টিতো অল্প অল্প হচ্ছে একটু ঝুঁকিতো আছেই। ভারী বৃষ্টি হলে সবকিছু ভাসায়ে নিয়ে গেলে ডেঙ্গু কমতো। কিন্তু এই থেমে থেমে হওয়া বৃষ্টিতে পানি জমে থাকবে আর তাতে করেই রিস্কি (ঝুঁকিপূর্ণ) হয়ে যাচ্ছে বিষয়টা।’

একই ধরনের মন্তব্য করেছেন প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যদি বৃষ্টি অনেক বেশি হয় এবং সব ধুয়ে যায় তাহলে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব কমবে, কিন্তু যেভাবে বৃষ্টি হচ্ছে তাতে করে সেটা মনে হচ্ছে না। গত কদিন ধরে যেমন বৃষ্টি হচ্ছে হচ্ছে , আবার হচ্ছে না এতে করে পানি জমে থাকার প্রবণতা বাড়বে এবং তখন ডেঙ্গু বাড়বে।’

 

/জেএ/টিএন/

লাইভ

টপ