সিরিজ বোমা হামলার ১৪ বছর জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণে কতটা এগিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী?

Send
নুরুজ্জামান লাবু ও শেখ জাহাঙ্গীর আলম
প্রকাশিত : ০৭:৪৫, আগস্ট ১৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:০৮, আগস্ট ১৭, ২০১৯

সিরিজ বোমা হামলাসারা দেশে একযোগে ৬৩ জেলায় সিরিজ বোমা হামলার ১৪ বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে আজ। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট চালানো ওই সিরিজ বোমা হামলার জন্য দায়ী নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)। জেএমবি বর্তমানে কোণঠাসা অবস্থায় থাকলেও দলটির সদস্যদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গড়ে তোলা নব্য জেএমবি এখনও আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এর অনুসারী নব্য জেএমবি নিজেদের শক্তির জানান দিতে মাঝে মধ্যেই হামলার চেষ্টা করছে। চলতি বছরই তারা চারটি ঘটনায় পুলিশকে টার্গেট করে বোমা পুঁতে রেখেছিল। যার দুটি বিস্ফোরিত হয়ে কয়েকজন আহতও হয়েছেন। সর্বশেষ ‘ইসলামিক স্টেট অব বেঙ্গল’ নামে একটি ভিডিওতে তারা হামলার হুমকি দিয়েছে। নব্য জেএমবির বাইরে এখনও সক্রিয় রয়েছে আনসার আল ইসলাম নামের একটি জঙ্গি সংগঠন। এরা গোড়া থেকেই আল কায়েদার দর্শন অনুসরণ করে আসছে।
ভয়াবহ জঙ্গি হামলার ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও বাংলাদেশে জঙ্গি প্রতিরোধে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশেষায়িত ইউনিট গড়ে ওঠেনি। এর ফলে জঙ্গি সম্পর্কিত গোয়েন্দা তথ্যে সমন্বয়হীনতা রয়ে গেছে। জঙ্গি নিয়ে কাজ করা একাধিক সংস্থা যার যার মতো করে কাজ করে যাচ্ছে। এক সংস্থার সঙ্গে আরেক সংস্থার তথ্যের আদান-প্রদানও অপ্রতুল।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিরিজ বোমা হামলার পর ১৪ বছর কেটে যাচ্ছে। কিন্তু এখনও জঙ্গি প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্বয়ংসম্পূর্ণ কোনও ইউনিট গড়ে ওঠেনি, যারা শুধু জঙ্গি প্রতিরোধে কাজ করে যাবে। ২০১৩ সাল থেকে লেখক-ব্লগার-প্রকাশক ও ভিন্নধর্মালম্বী বা ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর টার্গেটেড কিলিং শুরু হলে ২০১৬ সালের গোড়ার দিকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অধীনে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট- সিটিটিসি গঠন করা হয়। এটি রাজধানীকেন্দ্রিক হলেও ঢাকার বাইরে অভিযান চালাতে পারে, কিন্তু ঢাকার বাইরের জঙ্গি বিষয়ক কোনও মামলার তদন্ত করতে পারে না। এছাড়া সারাদেশে জঙ্গি বিরোধী অভিযান ও কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এন্টি টেরোরিজম ইউনিট গঠন করা হয়েছে। কিন্তু ২০১৭ সালের সেপ্টম্বরে অনুমোদন পাওয়া এন্টি টেরোরিজম ইউনিটের এখনও বিধি তৈরি হয়নি। সম্প্রতি তারা দু-একটি অভিযান পরিচালনা করলেও তদন্ত শুরু করতে পারেনি। এর বাইরে এলিট ফোর্স র‍্যাবও জঙ্গি প্রতিরোধে কাজ করে থাকে।

বাংলাদেশে নতুন ধারায় জঙ্গিবাদ উত্থানের সময়টিতে পুলিশের মহাপরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এ কে এম শহীদুল হক। অবসরে যাওয়া পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘এটি একটি দুঃখজনক বিষয়। আমার শেষ সময়ে এ রকম একটি সংস্থা এটিইউ (এন্টি টেরোরিজম ইউনিট) করেছিলাম। আমি থাকতেই এটিইউকে ফাংশনাল করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু অনেকের সহযোগিতা আমি তখন পাইনি। এরপরও ইউনিটটির আরও অনেক বেশি ফাংশনাল হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু হতে পারেনি এটা আসলেই দুঃখজনক।’

গোয়েন্দা তথ্য শেয়ারিং ও সমন্বয়হীনতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ইন্টেলিজেন্স সাধারণত শেয়ার করতে চায় না এটা সত্য। কারণ সব ইন্টেলিজেন্স শেয়ার করলে মিস হ্যান্ডেল হতে পারে। তবে গোয়েন্দা তথ্য শেয়ার যে হয় না এমন নয়। জেনারেল ইন্টেলিজেন্স তো শেয়ারিং হচ্ছে। কিন্তু একজন জঙ্গি গ্রেফতারের পর তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্য তদন্তের স্বার্থেই তদন্ত কর্মকর্তা শেয়ার করতে চান না। এজন্যই জঙ্গি দমনের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ সংস্থা পুরোদমে চালু হওয়া জরুরি।’

জঙ্গি বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে খোঁজ-খবর রাখা মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, সিরিজ বোমা হামলার পর ১৪ বছর পেরিয়ে গেছে। এরপর অনেক ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে তিন বছর আগে হোলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়াবহ জঙ্গি হামলা হয়েছে। কিন্তু এ কথা সত্য যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে জঙ্গি প্রতিরোধের জন্য পূর্ণাঙ্গ একটি ইউনিট গড়ে উঠেনি। ২০১৬ সালের প্রথম দিকে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট গঠন করা হয়েছে। তারা শুধু রাজধানীতে কাজ করছে। ঢাকার বাইরে অভিযান চালালেও মামলার তদন্ত করতে পারে না। এন্টি টেরোরিজম ইউনিট গঠন করা হয়েছে। কিন্তু তারা এখনও কাজই শুরু করতে পারেনি।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক এই নির্বাহী পরিচালক বলেন, জঙ্গি প্রতিরোধে এমন একটি সংস্থা গড়ে তোলা দরকার, যারা সারা দেশে শুধু জঙ্গি প্রতিরোধ নিয়েই কাজ করবে। সেখানে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের পদায়ন করতে হবে। যারা দীর্ঘদিন ধরে এ বিষয়ে কাজ করে আসছেন, তারাই তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করবেন। তারাই অভিযান চালাবেন, মামলার তদন্ত করবেন, জঙ্গিবাদ কমিয়ে আনার জন্য কাজ করবেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, হোলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার পর কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট সাফল্যের সঙ্গে জঙ্গি প্রতিরোধে কাজ করেছে। কিন্তু তারা সারা দেশে বিশেষ অনুমতি নিয়ে অভিযান চালাতে পারলেও ডিএমপির ইউনিট হিসেবে ঢাকার বাইরের মামলাগুলোর তদন্ত করতে পারেনি। ঢাকার বাইরের সংঘঠিত অভিযান ও জঙ্গি হামলা সংক্রান্ত মামলাগুলোর তদন্ত করেছে স্থানীয় পুলিশ।

জঙ্গি প্রতিরোধে নিয়োজিত কর্মকর্তারা বলছেন, সাধারণ অপরাধী আর জঙ্গিদের জিজ্ঞাসাবাদের প্রক্রিয়া এক নয়। ভ্রান্ত হলেও জঙ্গিরা একটি সুনির্দিষ্ট মতাদর্শ মেনে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালায়। তাদের মোটিভেটও করা হয় সেভাবে। সাধারণ জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কাছ থেকে তথ্য আদায় করা যায় না। এক্ষেত্রে অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা নানা কৌশলে তাদের কাছ থেকে তথ্য আদায় করে থাকেন। জঙ্গিবাদ নিয়ে কর্মকর্তাদের সম্যক ধারণা থাকতে হয়। 
বিচারে গতি নেই:

সাম্প্রতিক সময়ের কিছু ঘটনায় বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত গতিতে এগোলেও ২০০৫ সালে সংগঠিত সিরিজ বোমা হামলার বিচারেও গতি নেই। গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পুলিশ সদর দফতর ও র‍্যাবের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার পরপরই সারা দেশে ১৫৯টি মামলা হয়েছিল। এরমধ্যে ডিএমপিতে ১৮টি, সিএমপিতে ৮টি, আরএমপিতে ৪টি, কেএমপিতে ৩টি, বিএমপিতে ১২টি, এসএমপিতে ১০টি, ঢাকা রেঞ্জে ২৩টি, চট্টগ্রাম রেঞ্জে ১১টি, রাজশাহী রেঞ্জে ৭টি, খুলনা রেঞ্জে ২৩টি, বরিশাল রেঞ্জে ৭টি, সিলেট রেঞ্জে ১৬টি, রংপুর রেঞ্জে ৮টি, ময়মনসিংহ রেঞ্জে ৬টি ও রেলওয়ে রেঞ্জে ৩টি। যার মধ্যে ১৪২টি মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছিল। বাকি ১৭টি মামলায় ঘটনার সত্যতা থাকলেও আসামি শনাক্ত করতে না পারায় চূড়ান্ত রিপোর্ট দেওয়া হয়। এসব মামলায় ১৩০ জন এজাহারনামীয় আসামি ছিল। গ্রেফতার করা হয়েছে মোট ৯৬১ জনকে। অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৭২ জনের বিরুদ্ধে। এসব মামলায় ৩২২টি জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে। এর মধ্যে ফাঁসির দণ্ড হয়েছে ১৫ জনের। খালাস পেয়েছে ৩৫৮ জন আর জামিনে রয়েছে ১৩৩ জন আসামি। র‍্যাব সূত্র জানিয়েছে, মোট মামলার মধ্যে এখনও ৫৯টির বিচার চলছে। গত ৩১ জুলাই ফরিদপুরে সিরিজ বোমা হামলার মামলায় ৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় সেখানকার বিশেষ দায়রা জজ আদালত। আরও কয়েকটি বিচারকার্য সম্পন্ন হয়েছে বলে জানা গেছে।

মানবাধিকারকর্মী নূর খান বলেন, জঙ্গি হামলার ঘটনায় আমরা মাঝেমধ্যে রাজনীতির গন্ধও দেখতে পাই। অনেকটা উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানো হয়। জঙ্গিবাদ সম্পর্কে সম্যক ধারণা না থাকায় তদন্তে দুর্বলতা থাকে। বিচার ব্যবস্থাও অনেক ধীর গতিতে চলছে। দেশ থেকে পুরোপুরিভাবে জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণ করতে হলে বিচার ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল করতে হবে।

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ‘কয়টি মামলার বিচারকাজ এখনও শেষ হয়নি, তা আমার খোঁজ নিয়ে জানাতে হবে। তবে যে কয়টিরই শেষ হয়নি, আমরা সেগুলোর বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেব।’

/এনএল/এমপি/

লাইভ

টপ