‘সব পুইড়া ছাই, আছে খালি পরনের কাপড়টাই’

Send
শেখ জাহাঙ্গীর আলম
প্রকাশিত : ০৫:৩০, আগস্ট ১৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০৫:৪৯, আগস্ট ১৯, ২০১৯

পুড়ে ছাই হওয়া ঘরে কিছু পাওয়ার খোঁজ চলছে

‘আগুন আগুন কইয়া (বলে) মানুষ খালি দৌড়াইতাছিল। ঘরের ভেতর থিক্যা (থেকে) পোলা-মাইয়া কুলে (কোলে) লইয়া (নিয়ে) আমি এক দৌড়ে বাইরে আইছি। খালি জানটা বাঁচছে, কোনও জিনিসপত্র বাইর করবার পারি নাই। এহন গায়ে পরইন্না (পরনের) কাপড় ছাড়া কিছুই নাই আমগো (আমাদের)। সবকিছু পুইড়া (পুড়ে) ছাই।’ কান্নাজড়িত কন্ঠে কথাগুলো বললেন মিরপুর-৬ নম্বরের ঝিল বস্তিতে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত রাবেয়া বেগম।

ঝিল বস্তিতে শেখ ফরিদের ১৯টি ঘরের একটি ভাড়া নিয়ে বাস করতেন রাবেয়া। রাবেয়ার স্বামী মো. সোহলে পেশায় রিকশাচালক। তাওহীদ (৭) নামে একটা ছেলে ও তায়েবা নামে ১০ মাস বয়সী একটি মেয়ে রয়েছে তার। গত ৭ বছর ধরে স্বামী ও দুই সন্তান নিয়ে এই বস্তিতেই বাস করে আসছিলেন তিনি।

গত শুক্রবার (১৬ আগস্ট) সন্ধ্যা ৭টা ২২ মিনিটে মিরপুর রূপনগরের ঝিল বস্তিতে আগুন লাগে; মুহূর্তেই যা ছড়িয়ে পড়ে ঝিলপাড়, আরামবাগ ও ট-ব্লক বস্তিতে। ফায়ার সার্ভিসের ২০ ইউনিট টানা সাড়ে ৩ ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে রাত ১০টা ৩০ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। এই ঘটনায় ৪ জন আহত হন।

ঘটনার দুইদিন পরও নিজের ঘরের সব পোড়া আসবাবপত্র উল্টেপাল্টে দেখছেন রাবেয়া, সঙ্গে ছিলেন তার স্বামী সোহেলও। ঘরের এক একটি জিনিস তুলছিলেন, আর হা-হুতাশ করছিলেন তারা।

রাবেয়া বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যে আগুন লাগছিল, পুরা বস্তি পুইড়া গেছে। তাও আমার ঘরের কোনও জিনিস ভালা আছে নাকি দেখতাছি। আমার মেয়ের জন্মের পর একটা খাট আর একটা টেবিল ফ্যান কিনছিলাম। খাটের তোষকের তলে পাঁচ হাজার ট্যাকা রাখছিলাম। কুরাবানির ঈদের দিন বাড়ি বাড়ি গিয়া কিছু মাংস পাইয়া পাশের ঘরের ভাড়াটিয়ার ফ্রিজে রাখছিলাম। আগুনে সব পুড়ছে।’

শুধু রাবেয়া নয়, তার মতো আরও অনেকেই আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তারাও ধ্বংসস্তুপে পুড়ে যাওয়া আসপাবাপত্র ও টিন উল্টে-পাল্টে দেখছিলেন। ঘরের ভেতরে থাকা জিনিসপত্রের কিছু অবশিষ্ট রয়েছে কিনা, তা খুঁজে দেখছেন তারা। এই বস্তিতে ২০-২৫ হাজার ঘর ছিল। ৫০-৫৫ হাজার লোক বাস করতো। আগুনে তাদের সব মালামাল পুড়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্তরা বর্তমানে রাস্তা ও ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত পাঁচটি স্কুলে রাত্রিযাপন করছেন।

ক্ষতিগ্রস্ত বস্তি

রবিবার (১৮ আগস্ট) মিরপুর-৬ নম্বর ঝিল বস্তিতে গিয়ে সরেজমিনে দেখা যায়, ঝিলের ওপর বাস-কাঠের পাটাতনে টিন ও বাঁশের চাটাই দিয়ে তৈরি করা ঘরগুলো আগুনে পুরে ছাই হয়ে গেছে। পুরো ঝিল বস্তি এখন ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। বস্তির বাসিন্দারা চলন্তিকা মোড় ও আরামবাগ মোড়সহ স্থানীয় ৫টি স্কুলে অবস্থান করছেন। দুপুরে সবাই প্লেট আর বাটি নিয়ে যাচ্ছেন খাবার সংগ্রহের জন্য। বস্তি সংলগ্ন জিকা গার্মেন্টসের পাশে বঙ্গবন্ধু বিদ্যানিকেতনে অবস্থান করছেন আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত অনেকে। সেখানে তাদের মাঝে খাবার বিতরণ করা হচ্ছিল।

আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত মিনারা খাতুন একটি বাটিতে গরুর মাংস ও সাদা ভাত নিয়ে গলির ভেতরে একটি ভ্যানগাড়িতে বসে ছিলেন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত ২০ বছর ধরে আমি এই বস্তিতে থাকি। আগুনে আমার ৬টি ঘর পুড়েছে। চার ছেলে ও একমেয়ে নিয়ে আমি স্বামীর সঙ্গে এখানে দুটি ঘরে থাকতাম। আর বাকি চারটি ঘর ভাড়া দিয়েছিলাম। আগুনের খবর শুনে সবাই জীবন নিয়ে বের হতে পারলেও ঘরের কোনও জিনিসপত্র বের করার সময় পাইনি।’

ঠিকমতো খাবার পাচ্ছেন কিনা, জানতে চাইলে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আজ দুপুরে গিয়া পাইছি। গরুর মাংস আর ভাত। সকালের নাস্তা পাই নাই। মানুষের যে কাড়াকাড়ি, সিরিয়ালে দাঁড়াইলেও খাবার পাই না। পেছনের মানুষগুলো সিরিয়াল ভাইঙা সামনে চইলা যায়। মাইকিং শুইনা দুইবার গেছি, কাজ হয় নাই। তিনবারের বেলা এই খাবার নিতে পারছি। এখন ছোট পোলার (ছেলে) জন্য দাঁড়াইয়া আছি। পোলা আইলে এক লগে খামু।’

অসহায় আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত দুই নারী

আগুন নিভানোর কাজে ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের সহযোগিতা করতে গিয়ে আহত হয়েছেন বস্তির বাসিন্দা রফিক মিয়া। তিনি একটি রিকশার গ্যারেজে মেকানিক হিসেবে কাজ করেন। গত ৩০ বছর ধরে তিনি চলন্তিকা বস্তিতে বসবাস করেন। আগুন নেভাতে গিয়ে বস্তির পাশের একটি ভবনের দ্বিতীয় তলা থেকে নিচে পড়ে তার পা ভেঙে যায় এবং কোমরে আঘাত পান। এরপর ফায়ার সার্ভিসের লোকজন তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য হাসপাতলে নিয়ে যান।

আহত রফিক মিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঝিল বস্তির উত্তর লোন থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। আর দ্রুত তা পুরো বস্তিতে ছড়িয়ে পড়ে। আগুন নেভাতে গিয়ে আমি আহত হয়েছি। এলাকার কাউন্সিলর আমার চিকিৎসার ভার নিয়েছে। বস্তির একেবারে মাঝখানে আমার ঘর ছিল। এখন পরিবারের সবাইকে নিয়ে পথে বসে গেছি। আমার গায়ে কাপড় ছাড়া আর কিছুই নেই।’

এদিকে, ক্ষতিগ্রস্ত বস্তিবাসীকে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা দিতে মিরপুর চলন্তিকা মোড়ে একটি মেডিক্যাল ক্যাম্প চালু করা হয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় সরকার বিভাগের সহায়তায় ঢাকা আহসানিয়া মিশনের পক্ষ থেকে এই চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।

মেডিক্যাল ক্যাম্পের দায়িত্বে থাকা ঢাকা আহসানিয়া মিশনের ফিজিশিয়ান ডা. সাজিয়া আফরিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের দুটি টিম দুই পাশে কাজ করছে। একটি চলন্তিকা মোড়ে, অপরটি আরামবাগ মোড়ে। রবিবার (১৮ আগস্ট) সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত আমাদের কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের দুটি ক্যাম্পে প্রায় ৩৫০ জনকে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়েছে। এখানে মূলত কাটা-ছেঁড়া রোগীদের ড্রেসিং করা, তাদের টিটিনাস ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া, শিশু ও নারীদের ঠাণ্ডাজনিত সমস্যার চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।’

আগুনে ক্ষতিগ্রস্তদের চিকিৎসায় মেডিক্যাল ক্যাম্প খোলা হয়েছে

অন্যদিকে, শনিবার (১৭ আগস্ট) দুপুরে মিরপুর ৬ নম্বর ঝিল বস্তিতে আগুন লাগার কারণ অনুসন্ধানে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের উপ-পরিচালক (অ্যাম্বুলেন্স) আবুল হোসেনকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন– সহকারী পরিচালক (অপারেশন) আবুল হোসেন এবং উপ-সহকারী পরিচালক (মিরপুর জোন) নেওয়াজ আহমেদ। আগামী ৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে কমিটিকে বলা হয়েছে।

ফায়ার সার্ভিসে উপ-পরিচালক (অপারেশন) দেবাশীষ বর্ধন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তদন্তের পর আগুনের সূত্রপাত ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে নিশ্চিত করে বলা যাবে। বস্তির সব ঘরবাড়ি বাঁশ-টিন-চাঁটাই দিয়ে তৈরি করা ছিল। আগুন লাগার পর দ্রুত পুরো বস্তিতে তা ছড়িয়ে যায়। এখানে গ্যাসের সংযোগগুলো অরক্ষিত অবস্থায় ছিল। এর কারণেও আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।’

/এমএ/

লাইভ

টপ