‘শিক্ষক নিয়োগে অভিন্ন নীতিমালা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের পরিপন্থী’

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ১৯:৫৩, আগস্ট ২৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৫৮, আগস্ট ২৯, ২০১৯

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ফোরাম

বাংলাদেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের জন্য প্রস্তাবিত অভিন্ন নীতিমালা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নীতিগত অনুমোদনের যে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে; তা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিদ্যমান স্বায়ত্তশাসনের পরিপন্থী বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ফোরাম। বৃহস্পতিবার (২৯ আগস্ট) ফোরামের প্রধান সমন্বয়ক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই কথা জানানো হয়।  

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ২৬ আগস্ট, ২০১৯ বিভিন্ন পত্রিকায় বাংলাদেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের জন্য প্রস্তাবিত অভিন্ন নীতিমালা, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নীতিগত অনুমোদনের যে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে; তা সঙ্গত কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিদ্যমান স্বায়ত্তশাসনের পরিপন্থী বলে আমরা মনে করছি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুমোদিত '৭৩ এর অধ্যাদেশ অনুযায়ী সে সময়ের চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এদেশের শিক্ষাব্যবস্থার যুগান্তকারী সূচনা হয়েছিল। এর অনুসরণে বাংলাদেশের সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বায়ত্তশাসন চর্চার পথ সুগম হয়েছে। কিন্তু বর্তমান নীতিমালায় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের বিষয়টি দুর্ভাগ্যজনকভাবে উপেক্ষিত হয়েছে। অভিন্ন নীতিমালার নামে যা করা হচ্ছে সেটা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। অভিন্ন নীতিমালাটি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান রক্ষা ও শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি কালাকানুন হতে যাচ্ছে বলে আমরা আশঙ্কা করছি।

এতে আরও বলা হয়, ভৌগলিক অবস্থান, ইতিহাস-ঐতিহ্য, বিদ্যমান অবকাঠামো ইত্যাদির দিক থেকে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। অথচ নীতিনির্ধারকদের অনেকেই এই স্বাভাবিক বিষয়টাকে অস্বাভাবিক ভাবছেন এবং এই অভিন্ন নীতিমালার প্রস্তাব করেছেন।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়,  পৃথিবীতে সর্বমোট ২৬ হাজারের মতো বিশ্ববিদ্যালয় আছে। এর মাঝে মানের ক্রম অনুযায়ী একেক বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান একেক রকম। সব বিশ্ববিদ্যালয় যদি সমমানের হতো তাহলে অযথা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মানের ক্রম নির্ণয় করা হতো না। সব বিশ্ববিদ্যালয় একই মানের না এই ভেবে, পৃথিবীর কোথাও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন তাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মানের সমতা আনার জন্য অভিন্ন নিয়োগ ও পদোন্নতি নীতিমালা চালু করা দরকার বলে মনে করেনি। 

যৎসামান্য শিক্ষা ও গবেষণার সুবিধা নিয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় অবদান রাখছে এবং নিজেদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব নির্মাণে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে এ বিজ্ঞপ্তিতে অভিযোগ করা হয়, 

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্বকীয় অবস্থান তৈরি করতে গবেষণা-সুবিধা এবং প্রণোদনা না দিয়ে বরং একটা গড়পড়তা অবস্থানে থামিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা করার জন্য এই নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে। শিক্ষার পরিবেশ বিরোধী এই অবস্থান তাই ভীষণভাবে অগ্রহণযোগ্য।

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ফোরামের বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, শিক্ষকরা মনে করেন,  প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় তার শিক্ষকদের মান ও সুযোগ সুবিধা বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট পদে শিক্ষক নিয়োগের শর্ত ঠিক করবে। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদ, আবার একই অনুষদের বিভিন্ন বিভাগেরও শিক্ষক নিয়োগ ও প্রমোশন নীতি ভিন্ন হতে পারে। অভিন্ন নীতিমালা না করে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একাডেমিক কাউন্সিলে আলোচনার মাধ্যমে একটি যুগোপযোগী বাস্তব নীতিমালা প্রণয়নের জন্য অনুরোধ করা যেতে পারে।

প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের শর্ত আরও কঠোর করার প্রস্তাব দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ফোরামের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, শিক্ষক নিয়োগ মানে যেহেতু মানুষ গড়ার কারিগর নিয়োগ, সেহেতু এটিকে হেলাফেলা করার সুযোগ নেই। একে আরও কঠোর করে শিক্ষকদের মানমর্যাদা ও সুযোগসুবিধা বৃদ্ধি করলে আরও মেধাবীদের এই পেশায় আগ্রহী করা সম্ভব। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, এই নীতিমালায় গবেষণায় সুযোগ-সুবিধা ও শিক্ষকদের মান মর্যাদা বৃদ্ধির কোনও কথা বলা হয়নি।

এতে আরও বলা হয়,  যে অভিন্ন নীতিমালাটি প্রণয়নের ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তা পত্রিকা মারফত বাংলাদেশের শিক্ষক সমাজ অবহিত হয়েছেন। এ ব্যাপারে শিক্ষকসমাজের বৃহৎ একটি অংশ ইতোমধ্যেই জোটবদ্ধভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছে। যে নীতিমালার ব্যাপারে শিক্ষক সমাজের অনেকেরই আপত্তি আছে তা কী করে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথে না নিয়ে কতিপয় নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ পাস করিয়ে আনার মতো নিন্দনীয় পদক্ষেপ নিতে পারেন তা আমাদের বোধগম্য নয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘আমরা এই পদক্ষেপের তীব্র আপত্তি জানাচ্ছি এবং যৌক্তিক কারণেই এই অভিন্ন নীতিমালার নামের কালাকানুনকে সচেতনভাবে প্রত্যাখ্যান করছি।’

এদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখার স্বার্থে, শিক্ষার মানোন্নয়ন ও শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখার স্বার্থে এবং শিক্ষক সমাজের একান্ত দাবির প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ফোরামের পক্ষ থেকে এই অভিন্ন নীতিমালা অবিলম্বে বাতিলের আহ্বান জানানো হয়েছে।

 

/এসও/টিএন/

লাইভ

টপ