এখনও শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখেন সামিয়া ভরসী

Send
এস এম আববাস
প্রকাশিত : ১২:২৩, আগস্ট ৩০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:০০, আগস্ট ৩০, ২০১৯

সামিয়া ভরসীসামিয়া ভরসী। শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন ২০০৯ সালে। শিক্ষকতা পেশায় আত্মনিয়োগের জন্য অপেক্ষায় রয়েছেন এখনও। আজও স্বপ্ন দেখেন- একদিন শিক্ষক হিসেবে কোথাও চাকরি হবে। আত্মনিয়োগ করবেন স্বপ্নের পেশায়। তাই প্রতিদিনই খোঁজ নেন নতুন কোনও খবর আছে কিনা। মন্ত্রণালয়ে কর্মকর্তাদের কাছে গিয়ে চাকরিও চেয়ে বসেন। তার এই প্রস্তাবে কর্মকর্তারা বিব্রত হলেও তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন।এর মধ্যে চাকরিতে প্রবেশের বয়স (৩৫ বছর) পেরিয়ে গেছে। বয়স না থাকায় এখন নতুন করে অনলাইনে আবেদনও করতে পারছেন না তিনি। এমন ভুক্তভোগী শুধু একা সামিয়া ভরসীই নন, আরও অনেকেই রয়েছেন যারা শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় পাস করেও চাকরি পাননি। অপেক্ষায় থাকতে থাকতে বয়স পেরিয়ে গেছে, মেলেনি বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) নিয়োগের সুপারিশ। এ অবস্থায় ভুক্তভোগীরা এনটিআরসিএ’র ওপর দায় চাপাচ্ছে। তাদের দাবি- যথাসময়ে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হলে তাদের এ অবস্থায় পড়তে হতো না। এ নিয়ে বিগত সময়ে বঞ্চিতরা নিয়োগের সুপারিশের দাবিতে আন্দোলনও করেছে। পরবর্তীতে প্রথম শিক্ষক নিবন্ধন থেকে ১২তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় পাস করা সনদধারীদের একাংশ আদালতে একটি রিট করেন। রিটে হাইকোর্টের রায়ে এনটিআরসিএ আপিল করায় সেটি এখন সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন।
সম্প্রতি শিক্ষক নিবন্ধন সনদধারী সামিয়া ভরসীর সঙ্গে দেখা হয় সচিবালয়ে। ছয় নম্বর ভবনের ১৮ তলার বারান্দায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বারান্দায় কিছু কাগজ নিয়ে অপেক্ষা করছেন একজন অতিরিক্ত সচিবের সাক্ষাৎ পাওয়ার জন্য। অবশেষে সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত সচিবের দেখাও পান তিনি। কিন্তু কোনও ভরসা না পেয়ে ফিরে যেতে হয় তাকে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বেসরকারি মাধ্যমিক) জাবেদ আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মেয়েটি চাকরি না পেয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। তাই সরাসরি মন্ত্রণালয়ে এসে চাকরি চেয়ে বসেন। কিন্তু নিয়োগ দেওয়ার এখতিয়ার এনটিআরসিএ ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের। বিষয়টি নিয়ে উচ্চ আদালতে মামলা চলছে। মামলায় তারা জিতলে নিয়োগের সুপারিশ করা হবে।’
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সহকারী সচিব অসীম কুমার কর্মকার বলেন, ‘মেয়েটিকে (সামিয়া ভরসী) বোঝানোর চেষ্টা করেছি। এখন তো আদালতের বিষয়। তিনি বুঝতে চান না। জীবন থেকে তার অনেক সময় নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু এভাবে ভাবতে থাকলে তো মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলবেন তিনি।’ সামিয়ার মতো অনেক সনদধারী নিয়োগের সুপারিশ পাওয়ার জন্য দিনের পর দিন এভাবেই ঘুরছেন। কিন্তু এনটিআরসিএ তাদের জানায়, শিক্ষক নিবন্ধন সনদ চাকরির নিশ্চয়তা দেয় না। আর বয়স ৩৫ পেরিয়ে যাওয়ায় সুপারিশ করা যাচ্ছে না।
নিয়োগের সুপারিশ প্রত্যাশী সামিয়া ভরসী জানান, তিনি পঞ্চম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন ২০০৯ সালে। কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) যথাসময়ে তার নিয়োগের জন্য সুপারিশ না করায় এই অবস্থায় পড়তে হয়েছে তাকে। এই পরিস্থিতিতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের সুপারিশ পেতে আবেদন করেন তিনি। মন্ত্রণালয় এনটিআরসিএ’কে নির্দেশ দেয় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। মন্ত্রণালয়ের ওই নির্দেশের পর এনটিআরসিএ চিঠি দিয়ে সামিয়াকে জানায়, ‘শিক্ষক নিবন্ধন সনদ চাকরি পাওয়ার নিশ্চয়তা দেয় না। এছাড়া ৩৫ বছরের মধ্যে আপনি কোনও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে আবেদন করতে পারেননি। বিনা আবেদনে শূন্য পদের বিপরীতে নিয়োগের সুপারিশ করার সুযোগ নেই।’

আরেক ভুক্তভোগী আনোয়ার
নিয়োগের সুপারিশ প্রত্যাশী আরেক ভুক্তভোগী রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার উজাল খলসী গ্রামের আনোয়ার হোসেন শেখ। তিনি জানান, শিক্ষক নিবন্ধন সনদ পেয়েছেন ৩৫ বছর পূর্ণ হওয়ার ৫ বছর আগে ২০১৩ সালে। এখনও নিয়োগের সুপারিশের অপেক্ষায় আছেন। তিনি বলেন, ‘শিক্ষক নিবন্ধন সনদ চাকরির নিশ্চয়তা দেয় না, আর বয়স ৩৫ পার হয়ে গেছে- এ কথা বলে এখন দায় এড়াতে চাচ্ছে এনটিআরসিএ।’ তবে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের ‘শিক্ষক নিবন্ধন সনদ চাকরির নিশ্চয়তা দেয় না’ এমন বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ নেই বলে জানান মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের পরিচালক (মাধ্যমিক) অধ্যাপক ড. আব্দুল মান্নান। তিনি বলেন, ‘শিক্ষক নিবন্ধন সনদ চাকরির নিশ্চয়তা দেয় না- এ কথা বলার এখন আর সুযোগ নেই। কারণ কোন প্রতিষ্ঠানে কোন শিক্ষক নিয়োগ পাবেন তা সুপারিশ করে এনটিআরসিএ। সুপারিশ ছাড়া কারও নিয়োগ দিতে পারবে না কোনও বেসরকারি স্কুল ও কলেজ।’

২০১৬ সালে এনটিআরসিএ নিয়োগে সুপারিশের ক্ষমতা পায়
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০০৫ সালে এনটিআরসিএ প্রতিষ্ঠার সময় শিক্ষক নিবন্ধন সনদে চাকরির নিশ্চয়তা দেওয়া ছিল না। সে কারণে সনদধারীরা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির বিপরীতে আবেদন করে নিয়োগ পেতেন। কিন্তু ২০১৬ সালে এনটিআরসিএ শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করার ক্ষমতা পায়। বিদ্যমান ব্যবস্থায় এনটিআরসিএ সুপারিশ না করলে কোনও প্রতিষ্ঠান কাউকে নিয়োগ দিতে পারবে না। শিক্ষক নিবন্ধন সনদধারীরা বলছেন, চাকরিতে প্রবেশের বয়স (৩৫ বছর) থাকতে নিয়োগের সুপারিশ করেনি এনটিআরসিএ। অথচ এখন বলা হচ্ছে, ২০১৮ সালের নীতিমালা অনুযায়ী ৩৫ বছর পার হলে নিয়োগের সুপারিশ করবে না এনটিআরসিএ। এ নিয়ে বিগত সময়ে বঞ্চিতরা নিয়োগের সুপারিশের দাবিতে আন্দোলন করে।

নিয়োগ না পাওয়া পর্যন্ত সনদের মেয়াদ থাকবে: হাইকোর্টের রায়ে আপিল
একপর্যায়ে প্রথম শিক্ষক নিবন্ধন থেকে ১২তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় পাস করা সনদধারীদের একাংশ আদালতে রিট দায়ের করেন। আলাদাভাবে প্রায় ২০৫ টির মতো রিট হয় আদালতে। শুনানি শেষে ২০১৭ সালের ১৪ ডিসেম্বর হাইকোর্ট বেঞ্চ ১৬৬টি মামলা ফিক্সড করে সাতটি পয়েন্টের ওপর রায় দেন। রায়ের প্রধান গুরুত্বপূর্ণ অংশটি ছিল- নিয়োগ না পাওয়া পর্যন্ত শিক্ষক নিবন্ধন সনদের মেয়াদ থাকবে। সনদের নিদির্ষ্ট কোনও মেয়াদ থাকবে না। তবে এ রায় না মেনে এনটিআরসিএ সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে। রিট মামলাটি চলমান।
এই পরিস্থিতিতে সামিয়া ভরসী প্রধানমন্ত্রীর কাছে গত ২৩ জুলাই শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের সুপারিশ চেয়ে আবেদন করেন। আবেদনে সামিয়া বলেন, ‘আমি সামিয়া ভরসী ইংরেজি বিষয়ে পঞ্চম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় পাস করি ২০০৯ সালে। আমি ২৭ বছর বয়সে নিবন্ধন পরীক্ষায় পাস করেছি। এনটিআরসিএ চাকরির নিয়োগযোগ্য শূন্য পদের চাহিদা বিলম্বে আহ্বান করে। আমার বয়স ৩৫ হওয়ার কারণে আবেদনের জন্য আমি অনলাইনে ঢুকতে পারিনি, বয়সের কারণে যেন আমার নিবন্ধন বাদ না হয়। সম্মিলিত জাতীয় মেধা তালিকায় আমার সিরিয়াল ২৪৩৬১। পঞ্চম নিবন্ধন পরীক্ষা বাদ দেওয়া হলে আমার ইংরেজিতে মাস্টার্স পাসের কোনও দাম থাকবে না।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এনটিআরসিএ চেয়ারম্যার এস এম আশফাক হুসেন বলেন, ‘রায়ের বিরুদ্ধে আমরা আপিল করেছি। আপিল নিষ্পত্তির পর আদালতের নির্দেশে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

 

আরও পড়ুন: নিয়োগ পেয়েও চাকরিতে যোগ দিতে পারছেন না শতাধিক শিক্ষক 

               ১-১৩তম নিবন্ধন থেকে নিয়োগ হবে ৩৯ হাজার শিক্ষক

              ৪০ হাজার শূন্য পদে শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ

            হাইকোর্টের নির্দেশে শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের মেধা তালিকা প্রকাশ

          এনটিআরসিএ চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল

       

 

 

/ওআর/

লাইভ

টপ