অস্ত্র চোরাচালানের নতুন রুট সীমান্ত হাট!

Send
নুরুজ্জামান লাবু
প্রকাশিত : ২৩:৫০, সেপ্টেম্বর ০৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৩৪, সেপ্টেম্বর ০৮, ২০১৯

সিটিটিসির হাতে উদ্ধার হওয়া অবৈধ অস্ত্র




দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্ত এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়িয়েছে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। এ কারণে আগ্নেয়াস্ত্র আনার রুট পাল্টাচ্ছে অস্ত্র ব্যবসায়ীরা। অস্ত্র চোরাচালানের জন্য তারা এখন বেছে নিয়েছে সিলেটের গোয়াইনঘাট এলাকা এবং এর পাশের লাকাটবাজার সীমান্ত হাট। বিশেষ করে পণ্য বেচাকেনার আড়ালে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে সীমান্ত হাট দিয়ে অস্ত্রের চালান ঢুকছে বেশ সহজেই। একেকটা চালানে থাকছে চার-পাঁচটি করে অস্ত্র। সীমান্ত এলাকা থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করে নানা কৌশলে তা নিয়ে আসা হচ্ছে রাজধানী ঢাকাতেও। গত বৃহস্পতিবার ( ৫ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর সায়েদাবাদ এলাকা থেকে দুই অস্ত্র ব্যবসায়ী ও তাদের এক সহযোগীকে গ্রেফতারের পর এসব তথ্য জানতে পেরেছে ঢাকার কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট- সিটিটিসির স্পেশ্যাল অ্যাকশন গ্রুপ।

সিটিটিসির স্পেশ্যাল অ্যাকশন গ্রুপ (এসএজি)-এর উপ-কমিশনার মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন বলেন, ‘অস্ত্র চোরাকারবারিরা প্রতিনিয়ত তাদের রুট বদল করে থাকে। আগে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল দিয়ে পাশের দেশ থেকে অস্ত্র আসতো। সেসব এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বাড়ানোর কারণে নতুন রুটে অস্ত্র আসছে। আমরা অস্ত্র ব্যবসায়ী চক্রের তিনজনকে গ্রেফতার করেছি। তাদের আরও কয়েকজন সদস্য পলাতক রয়েছে। তাদের গ্রেফতারেও অভিযান চালানো হচ্ছে।’

অস্ত্র ব্যবসায়ী শহিদ

তিনি আরও জানান, ঢাকায় গ্রেফতার হওয়া দুই অস্ত্র ব্যবসায়ীর কাছ থেকে তিনটি রিভলভার উদ্ধার করা হয়েছে, যার মধ্যে দুটি ১২ চেম্বারের, এসব রিভলবার সচরাচর পাওয়া যায় না।

সিটিটিসি সূত্র জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সিটিটিসির স্পেশ্যাল অ্যাকশন গ্রুপের আর্মস এনফোর্সমেন্ট টিমের সদস্যরা জানতে পারেন সায়েদাবাদ এলাকায় কয়েকজন অস্ত্র ব্যবসায়ীর মধ্যে অস্ত্র বিনিময় হচ্ছে। এই সংবাদের পরিপ্রেক্ষিতে গত বৃহস্পতিবার (৫ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় আব্দুল শহীদ (৪০), দোলন মিয়া (৩৮) ও আনছার মিয়াকে (৪০) আটকের পর তাদের কাছ থেকে দুটি পয়েন্ট ২২ বোরের এবং একটি পয়েন্ট ৩২ বোরের রিভলভার উদ্ধার করা হয়। তবে অভিযানের বিষয়টি টের পেয়ে আমিন মিয়া ও আরব আলী নামে দুই অস্ত্র ব্যবসায়ী পালিয়ে যায়। তিন অস্ত্র ব্যবসায়ীকে দুই দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে সিটিটিসি।

অস্ত্র ব্যবসায়ী চক্রের মূল হোতা আরব আলী

সিটিটিসির সূত্র জানায়, এই অস্ত্র ব্যবসায়ী চক্রের মূল হোতা হলো আরব আলী। তার বাড়ি সিলেটের গোয়াইনঘাট এলাকার নোয়াগাঁও এলাকায়। সীমান্তের কাছেই তার বাসা। সেই মূলত সীমান্তের ওপার থেকে লাকাটবাজার থেকে অস্ত্র নিয়ে আসে। তার কাছ থেকে শহীদ ও আমিন অস্ত্র কিনে এনে রাজধানী ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন এলাকার সন্ত্রাসীদের কাছে বিক্রি করে। দোলন হলো আমিনের অস্ত্র ব্যবসার সহযোগী।

অস্ত্র ব্যবসায়ী আনসার

সিটিটিসির একজন কর্মকর্তা জানান, শহীদ ও আনসার বন্ধু। তাদের বাড়ি সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে। তারা দুজনই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। শহীদ জগন্নাথপুর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এবং আনছার হলো উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক। পলাতক আমিন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার একজন চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ। স্থানীয় থানায় তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে। ভাড়াটে খুনি হিসেবেও এলাকায় পরিচিত সে। গ্রেফতার হওয়া দোলন তার অস্ত্রের ব্যবসার সহযোগী হিসেবে কাজ করতো।

সিটিটিসির ওই কর্মকর্তা বলেন, দোলন পেশায় একজন অটোরিকশাচালক। কিন্তু অটোরিকশা চালনার আড়ালে সে আমিনের হয়ে অস্ত্র আনা-নেওয়া করতো। গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদে সে গোয়াইনঘাট থেকে নানা কৌশলে অস্ত্র আনতো। ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় অস্ত্র আনা নেওয়ার জন্য সে অটোরিকশা ব্যবহার করতো।

সিটিটিসির আর্মস এনফোর্সমেন্ট টিমের প্রধান অতিরিক্ত উপ-কমিশনার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এই চক্রের অন্যতম অস্ত্র ব্যবসায়ী আরব আলী। সে বর্তমানে পলাতক রয়েছে। আমরা তাকে এবং আমিন নামে আরেক অস্ত্র ব্যবসায়ীকে গ্রেফতারের জন্য অভিযান চালাচ্ছি। তাদের গ্রেফতার করতে পারলে আরও অনেক তথ্য পাওয়া যাবে।’

অস্ত্র ব্যবসায়ী দোলন

গ্রেফতারকৃতদের বরাত দিয়ে সিটিটিসির কর্মকর্তারা বলছেন, গোয়াইনঘাটের লাটকাবাজার সীমান্ত হাটটি প্রতি রবিবার বাদে দুদিন পর পর বসে। দুপুর ১টা থেকে ৪টা পর্যন্ত চলে এই হাট। দুই দেশের সীমান্ত এলাকার লোকজন হাটে গিয়ে বিভিন্ন পণ্য বেচাকেনা করে। পলাতক আরব আলী সেই হাটে পণ্য বিক্রি ও কেনার আড়ালে অস্ত্র নিয়ে আসে। লাটকাবাজারের ওপারে ‘দাদা’ নামে খাসিয়া সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তির কাছ থেকে অস্ত্রগুলো নিয়ে আসে। প্রতি মাসে অন্তত দুই থেকে তিনটি অস্ত্রের চালান নিয়ে আসে আরব আলী। প্রতি চালানে ৩ থেকে ৪টি অস্ত্র আনে।

অস্ত্র উদ্ধারে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসা সিটিটিসির এক কর্মকর্তা বলেন, যেসব অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে, এর মধ্যে দুটি খুবই উন্নত মানের। দুটি রিভলভার ১২ চেম্বারের। সাধারণত ১২ চেম্বারের রিভলভার দেখা যায় কম। এছাড়া সিলেটের গোয়াইনঘাট এলাকার সীমান্ত দিয়ে আনা অস্ত্র আগে কখনও উদ্ধার হয়নি বলেও জানান তিনি।

সীমান্তে ২০ হাজার, ঢাকায় ৭০ হাজার
সিটিটিসির কর্মকর্তারা বলছেন, সীমান্তের ওপার থেকে একটি রিভলবার ২০ হাজার টাকায় আনা হয়। সেখান থেকে শহীদ বা আমিনের মতো অস্ত্র ব্যবসায়ীরা ৪০ হাজার টাকায় কিনে আনে। ঢাকায় এনে এসব অস্ত্র বিক্রি করা হচ্ছে ৭০ হাজার টাকায়। সম্প্রতি রাজধানীর আন্ডারওয়ার্ল্ডের সদস্যরা আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। চলতি বছরেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে একে টোয়েন্টিসহ প্রায় একশ’ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।

সিটিটিসির আরেকজন কর্মকর্তা জানান, আগে ভারতের তৈরি অস্ত্রগুলোর চালান আসতো বিহারের মুঙ্গেরে থেকে। সেখানে একসময় বৈধ অস্ত্র তৈরির কারখানা ছিল। সেসব কারখানার অধিকাংশ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কারিগররা অবৈধভাবে অস্ত্র তৈরি করে বিক্রি করতো। তবে সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গসহ সেভেন সিস্টারস হিসেবে খ্যাত আসাম, মেঘালয়, মিজোরাম ও নাগাল্যান্ডেও অবৈধ অস্ত্র তৈরির কারখানা চালু হয়েছে বলে তথ্য রয়েছে। এসব কারখানায় তৈরি হওয়া অস্ত্রের একটি অংশ বাংলাদেশে পাচার হয়ে আসে বলে জানান তিনি।

 

/টিএন/

লাইভ

টপ