ডেঙ্গু রোগী কমেছে, আশঙ্কা কমেনি

Send
জাকিয়া আহমেদ
প্রকাশিত : ১৮:০৬, সেপ্টেম্বর ০৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৩৪, সেপ্টেম্বর ০৯, ২০১৯

হাসপাতালের ভেতরে জায়গা নেই, তাই বাইরের বারান্দায় বেঞ্চে মশারি বেঁধে চিকিৎসা নিচ্ছেন এক ডেঙ্গু রোগীধীরে ধীরে কমে আসছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। ইতোপূর্বে সেপ্টেম্বরকে চিকিৎসকরা ‘ডেঙ্গুর পিক টাইম’ বললেও আগস্টের তুলনায় এই মাসে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা কমেছে। স্বাস্থ্য অধিদফতর বলছে, পরিস্থিতি পুরো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। তাই পুরোপুরি আশঙ্কামুক্তও হওয়া যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতিকে ‘মাঝারি নিয়ন্ত্রণ’ হিসেবেই দেখছেন স্বাস্থ্য অধিদফতর-সংশ্লিষ্টরা।

রাজধানীর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল ও মুগদা জেনারেল হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, ভর্তি থাকা রোগী ও বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা দুই ধরনের রোগীর সংখ্যা কমেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও রোগী কমার কথা জানিয়েছে।

মুগদা জেনারেল হাসপাতালে গতকাল (৮ সেপ্টেম্বর) কথা হয় ডেঙ্গু আক্রান্ত মোসাম্মত রহিমার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার (৫ সেপ্টেম্বর) থেকে এই হাসপাতালে ভর্তি আছি।’

তবে, দুপুরে দেড়টা পর্যন্ত হাসপাতালে উপস্থিত থেকে দেখা যায়, অনেক রোগীকেই হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে। ছাড়পত্র পাওয়া রোগীদেরই একজন শান্তা আক্তার। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘গত সোমবার ভর্তি হই। আজ রিলিজ পাচ্ছি। পরিবারের সবার অনেক টেনশন ছিল। সে টেনশন থেকে মুক্তি পাচ্ছি।’

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মুগদা জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক ডা. আমিন আহমেদ খান বলেন, ‘ডেঙ্গু কমে এসেছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে একটু স্বস্তি পাওয়া যাবে।’

এদিকে, সোমবার (৯ সেপ্টেম্বর) ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনের ছয়, সাত, আট ও নয় তলায় গিয়ে দেখা গেছে, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা কমেছে। ডেঙ্গু রোগীদের জন্য বিশেষভাবে করা ‘সিভিয়ার ডেঙ্গু রোগী কর্নার’ নামের ওয়ার্ডে অনেক বেড ফাঁকা। অনেক রোগীই রিলিজ পেয়ে বাড়ি ফেরার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।’

সাততলার মেডিসিন বিভাগের অধীনে থাকা ‘সিভিয়ার ডেঙ্গু রোগী কর্নার’-এর আট বেডের মধ্যে মাত্র দু’টিতে রোগীর দেখা মিলেছে। এই ওয়ার্ডের অনারারি মেডিক্যাল অফিসার জীনাত নওরীন বলেন, ‘‘মধ্য আগস্ট থেকেই রোগীর সংখ্যা কমছে। আর চলতি মাসের শুরু থেকে অনেকটাই ‘কন্ট্রোলে’, প্রতিদিনই রোগীর সংখ্যা কমছে।’’

জানতে চাইলে ঢামেক হাসপাতালের ৮ তলার মেডিসিন বিভাগের নারী ওয়ার্ডের নয় নম্বর ইউনিটের ইনডোর মেডিক্যাল অফিসার ডা. এস এম রিয়াশাত বলেন, ‘এই ওয়ার্ডে সাত জন ডেঙ্গু রোগীর সবাই চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন। আর কেউ ভর্তি নেই হাসপাতালে।’

এদিকে, ছয়তলার মেডিসিন বিভাগের ৬০২ নম্বর ওয়ার্ডের ইনচার্জ সুরমা আক্তার বলেন, ‘আজ ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা রোগীর সংখ্যা ২২ জন, যেটা গত মাসের শুরুতে ছিল ৬০ থেকে ৭০ জন।’ তিনি আরও বলেন, ‘বৃষ্টি আর না হলে ডেঙ্গু রোগীও কমে যাবে।’

স্বাস্থ্য অধিদফতরে হেলথ ইমার্জেন্সি অ্যান্ড অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় (৮ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা থেকে ৯ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা) পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্তের হার আগের দিনের চেয়ে কমেছে ৬ শতাংশ। এই সময়ের মধ্যে নতুন করে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ৭১৬ জন। চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন মোট ৮৫১ জন।

আর (৮ সেপ্টেম্বর) ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ৭৬১ জন, ৭ সেপ্টেম্বর ছিল ৬০৭ জন, ৬ সেপ্টেম্বর ছিল ৭৯৩ জন, ৫ সেপ্টেম্বর ছিল ৭৮৮ জন, ৪ সেপ্টেম্বর ছিল ৮২০ জন আর ৩ সেপ্টেম্বর ছিল ৭৮৩ জন।

নতুন আক্রান্ত হওয়া রোগীর মধ্যে রাজধানী ঢাকায়ই আক্রান্ত হয়েছেন ৩০০ জন। আর সারাদেশে আক্রান্ত হওয়া রোগীর সংখ্যা ৪১৬ জন। ঢাকার ভেতরে এ সময় ছাড়পত্র নিয়েছেন ৩৭০ জন, আর ঢাকার বাইরে ৪৮১ জন।
সারাদেশে এই সময়ে মোট ভর্তি থাকা রোগীর সংখ্যা তিন হাজার ৯১ জন। এরমধ্যে, ঢাকা মহানগরীতে ভর্তি আছেন এক হাজার ৫২২ জন। ঢাকার বাইরে রয়েছেন এক হাজার ৫৬৯ জন। সারাদেশে চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছেন ৯৬ শতাংশ রোগী।

এদিকে, সেপ্টেম্বরের প্রথম নয়দিনে আক্রান্ত হয়েছেন ছয় হাজার ১৩৩ জন, যা গত মাসের প্রথম ছিল ১৮ হাজার ২০৭ জন।

গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকার ভেতরে সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত ১২টি হাসপাতালের মধ্যে ঢামেক হাসপাতালে বর্তমানে ভর্তি আছেন ৭৯ জন, মিটফোর্ড হাসপাতালে ৫৭ জন, ঢাকা শিশু হাসপাতালে ৬ জন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১৯ জন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০ জন, রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে একজন, মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ২৯ জন, বিজিবি হাসপাতালে একজন, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে পাঁচ জন, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ১৩ জন, কুয়েত বাংলাদেশে মৈত্রী সরকারি হাসপাতালে তিন জন, পঙ্গু হাসপাতালে একজন। বেসরকারি ২৯টি হাসপাতালে ভর্তি আছেন মোট ৭৬ জন।

এদিকে, রাজধানী ঢাকা ছাড়া ঢাকাসহ ৮ বিভাগে ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি থাকা রোগীর সংখ্যা ৪১৬ জন। এরমধ্যে ঢাকা বিভাগে ৮৮ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ১৯ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৫৪ জন, খুলনা বিভাগে ১৩৫ জন, রাজশাহী বিভাগে ৩২ জন, রংপুর বিভাগে ১৩ জন, বরিশাল বিভাগে ৬৮ জন এবং সিলেট বিভাগে সাত জন।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা বলেন, ‘নতুন করে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা কমছে। তবে, বিষয়টিকে কোনোভাবেই পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ বলা যাবে না। অনেকটা মাঝারি মানের নিয়ন্ত্রণ বলা যেতে পারে। এই সংখ্যা আরও কমিয়ে আনতে হবে। আমরা সে লক্ষ্যেই কাজ করছি।’

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, ‘নতুন করে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা প্রতিদিনই কমছে। এরপরও প্রতিদিন যেভাবে আক্রান্ত হচ্ছে, তাতে আমরা সন্তুষ্ট নই। এ সংখ্যা জিরোতে নামিয়ে আনতে হবে।’

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ডা. আয়শা আক্তার বলেন, ‘এখনও পুরোপুরি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আসেনি। কারণ, সেপ্টেম্বর মাস এখনও পুরোটা বাকি। এরপরও আশা করি নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। তবে স্বস্তির কথা হচ্ছে, নতুন করে আক্রান্তের সংখ্যা কমছে। তাই আশঙ্কাও কমেছে। একইসঙ্গে জনগণ যদি সচেতন থাকেন, তাহলে আর বাড়ার কোনও আশঙ্কা নেই। আর এক হাজারের নিচে রোগীর সংখ্যা এলেও পাঁচশ' বা চারশ'র মধ্যে এখনও রোগী আসেননি। হয়তো আগস্টের মতো পিকে যাবে না, সে রকম হবে না।’ এখনও ডেঙ্গু পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি বলেও তিনি জানান।

/এমএনএইচ/এমওএফ/

লাইভ

টপ