মায়ের আর্তি, ‘একটা চোখ যদি কেউ দিতো মাইয়াটারে’

জাকিয়া আহমেদ
১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২০:৫১ আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১:৫৫





হাবিবা আক্তার ‘আমি কিচ্ছু করি নাই। স্যার ওই ক্লাসে কী পড়াইতেছিল, তা-ই দেখতে আমি দরজায় দাঁড়াইছিলাম। তখন স্যারের রাগ উঠছিল, তাই আমারে দেইখাই স্যার হাতে জিংলা (বেত) উড়াইয়া মারলো।’

কথাগুলো বলছিল হবিগঞ্জে শিক্ষকের ছোড়া বেতের আঘাতে এক চোখ নষ্ট হয়ে যাওয়া হাবিবা আক্তার (৮)। রাজধানীতে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এই শিশু মঙ্গলবার (১০ সেপ্টেম্বর) তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ঘটনার বর্ণনা দেয়।
হাবিবা বলে, ‘সেই জিংলা আমার চক্ষে আইসা লাগে, রক্ত পড়তে থাকে, আমি মাটিতে বইসা পড়ি। তারপর সবাই আমারে বাড়িতে নিয়া আসে।’
চোখে কালো সানগ্লাস আর গায়ে গামছা জড়ানো হাবিবা যখন কথাগুলো বলছিল, তখন মা রুবিনা আক্তার পাশে বসে চোখ মুছছিলেন।
‘স্যার জিংলা কোথায় পেলেন’ প্রশ্নে হাবিবা জানায়, পড়ানোর সময় স্যারের হাতে জিংলা থাকে, ওই জিংলা।
স্যারের নাম কী জানতে চাইতেই চিৎকার করে হাবিবা বলে, ‘স্যারের নাম নীরঞ্জন দাশ।’
ছোট্ট এই হাবিবা আক্তার ওরফে ছোটন হবিগঞ্জ সদর থানার যাদবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। বাবা দুবাই থাকেন। তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে হাবিবা দ্বিতীয়।
গত রবিবার (৮ সেপ্টেম্বর) শিক্ষক নীরঞ্জন দাশের বেতের আঘাতে চোখে আঘাত পায় হাবিবা। প্রথমে তাকে হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
হাবিবা বলতে থাকে, ‘পরে স্যার নিজেই একটি গামছা দিয়ে চোখ চাপিয়ে ধরে, এরপর আমাকে একটা বড়ি খাওয়ায়, ফ্যানের নিচে রাখে, কিন্তু রক্ত পড়া বন্ধ হয় নাই।’


হাসপাতালের বিছানায় ছোট্ট হাবিবা

শিশুটি আরও বলে, ‘স্যার জিংলা উড়াইয়া মারার পর সবাই দৌড় দিলো, আমি ভাবছিলাম আমার উপরে পড়বো না, কিন্তু ক্যামনে ক্যামনে জানি আমার চক্ষেই পড়লো!’
‘এখন আমার চোখটা অন্ধ হইয়া গেলো, আমি কিছু দেখি না’, বলে চলে হাবিবা।
আপনি কখন মেয়ের এ অবস্থার কথা জানলেন? হাবিবার মা রুবিনা আক্তার বলেন, ‘রবিবার সকাল ১১টার মতো বাজে, বাড়িতেই ছিলাম, রান্নার জোগাড়যন্ত্র করতেছিলাম। তখন অন্য শিক্ষক আর বাড়ির আশপাশের ছেলেমেয়েরা এসে খবর দেয়, তোমার ছোটনের চোখে জিংলা লাগছে, তার চোখ দিয়া রক্ত ঝরতাছে, সে কানা হয়া গেছে।’
এখানকার চিকিৎসকরা কী বলেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তারা জানাইছেন, চোখের দুর্ঘটনা ঘটছে, চোখ আর ভালো হইবো না, বাম চোখের মণি ফাইটা গেছে, চোখে আর আলো নাই!’
মেয়ের এ অবস্থার কথা শুনে বাবা শাহীন দুবাইয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে জানান রুবিনা।
স্যারেরা পরে আর খোঁজ নিয়েছেন কিনা জানতে চাইলে রুবিনা বলেন, ‘নীরঞ্জন স্যার আমাদের সাথেই আছেন।’
“তবে উনি কিছু বলেন না, কেবল সাথে সাথে থাকতেছেন। আর বলছেন, ‘আমি কেবল উড়াইয়া মারছিলাম, বুঝছি না যে ওর চোখে গিয়া পড়বো’”, বলেন রুবিনা।
তিনি বলেন, ‘এখন নিজেরে বুঝাই, আমার কর্ম খারাপ, নইলে শিক্ষক মানুষ, উনি গিয়া না হয় পিডান দিতো, তা না কইরা বেত উড়াইয়া মারছেন, সেই বেত গিয়া পড়লো আমার ছোটনের চোখে!’
‘মাইয়াডার বাকি জীবন পইড়া আছে, এক চোখ দিয়া মাইয়া জীবন কাটাইবো, কেমনে কাটাইবো’, হাহাকার মায়ের কণ্ঠে।
এ সময় হাবিবা পাশ থেকে বলে, ‘চক্ষে ব্যথা করে সারা দিন, পানি পড়ে।’
হাবিবার মা রুবিনা আক্তার বলেন, ‘একটা চোখ যদি কেউ দিতো মাইয়াটারে! আপনারা কত কিছু করেন, একটা চোখ জোগাড় করে দিতে পারবেন?’

আরও পড়ুন...
শিক্ষকের বেতের আঘাতে শিক্ষার্থীর চোখ নষ্ট

বেতের আঘাতে শিক্ষার্থীর চোখ নষ্টের ঘটনায় শিক্ষক বরখাস্ত

/এইচআই/এমওএফ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
দুপুরে রাজশাহী আসছেন প্রধানমন্ত্রী, নজরদারিতে ৪০০ ক্যামেরা
দুপুরে রাজশাহী আসছেন প্রধানমন্ত্রী, নজরদারিতে ৪০০ ক্যামেরা
রাত জাগা ও রিল দেখার অভ্যাসে বাড়ছে অসুস্থতার ঝুঁকি
রাত জাগা ও রিল দেখার অভ্যাসে বাড়ছে অসুস্থতার ঝুঁকি
চাকচিক্যময় উন্নয়ন বনাম নগরে মানুষের দৈনন্দিন স্বস্তি 
চাকচিক্যময় উন্নয়ন বনাম নগরে মানুষের দৈনন্দিন স্বস্তি 
নাটোরে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনায় জামায়াতের শোক
নাটোরে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনায় জামায়াতের শোক
সর্বাধিক পঠিত
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
চট্টগ্রামে জন্ম, ঢাকায় বসবাস-এমপি হতে ঠাকুরগাঁওয়ে আলীম নিজামী
চট্টগ্রামে জন্ম, ঢাকায় বসবাস-এমপি হতে ঠাকুরগাঁওয়ে আলীম নিজামী
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন