‘ভালো স্কুল না নিলেও আমরা এগিয়ে যাবো’ (ভিডিও)

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ১০:২২, সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:১৬, সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৯



‘আগে ভালো স্কুলে পড়তাম। কিন্তু তারা আমাকে বের করে দিয়েছে, আমি প্রতিবন্ধী বলে। ভালো স্কুল না নিলেও আমাদের সুযোগ দিলে আমরা এগিয়ে যাবোই।’ প্রচণ্ড রকমের আত্মবিশ্বাসী এই কথাগুলো বলছিল বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু শিলামণি। সুবিধাবঞ্চিত বিশেষ শিশুদের স্কুলে সে এখন সহায়ক হিসেবে কাজ করছে।

দেখা গেছে, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য রাজধানীসহ সারাদেশে বেশকিছু স্কুল গড়ে উঠলেও সুবিধাবঞ্চিত বিশেষ শিশুদের পড়াশুনা ও হাতের কাজ শেখানোর জন্য স্কুল নেই বললেই চলে। একারণেই রাজধানীর কামরাঙ্গীচরে সুবিধাবঞ্চিত বিশেষ শিশুদের  জন্য একটি স্কুল পরিচালনা করছে বেসরকারি সংস্থা ‘সীড’। এলাকায় এটিকে সীড স্কুল নামেই সবাই চেনেন। এখানকার শিক্ষার্থীদের কারোর বাবা ভ্যানচালক,  কেউ দোকানের কর্মচারী, কিংবা মা অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করেন। এসব পরিবারের সদস্যরা চান না— তাদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুটির জন্য বাড়তি কোনও খরচ হোক। ফলে বছরে এক হাজার টাকা করে দেওয়ার কথা থাকলেও কেউ দেন, আবার কেউ দেন না।

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের তৈরি দেয়াল চিত্রসীড স্কুলের প্রশিক্ষকরা বলছেন, এই শিশুদের মধ্যে একেক জনের একেক রকমের পারদর্শিতা আছে। দক্ষতার ভিত্তিতে যদি তাদেরকে কোনও কাজ ভালো করে শেখানো হয়, তাহলে আমরা যাদেরকে ‘স্বাভাবিক’ বলি তাদের চেয়েও মনোযোগ দিয়ে তারা কাজটি করে।

সীড স্কুলের বৃত্তিমূলক শিক্ষার ইনচার্জ সাবানা ইয়াসমিন মনে করেন, সমাজে অবহেলিত এই শিশুদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিতে তাদেরকে কাজ শেখানো খুবই জরুরি। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা এখানে তাদের দক্ষতা অনুযায়ী কাজ শেখাই। শিখতে সবার সমান সময় লাগে না। একটু সহযোগিতা করলেই তারা ভালো কিছু করতে পারে। কানে শোনে না যে শিশুরা, তাদের সঙ্গে আমরা ইশারা ভাষায় যোগাযোগ করি, তবে সেটা কোনও প্রাতিষ্ঠানিক ভাষা না, আমাদের নিজেদের পরস্পরের তৈরি করে নেওয়া। কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতেই তাদের সবকিছুই শেখানোর চেষ্টা করা হয়।’

শিশুদের রঙ করা কাপড়স্কুল ইনচার্জ নাজ-ই জাহান সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে সময় কাটান। তিনি বলেন, ‘সকাল ৯টা থেকে একটা পর্যন্ত ক্লাসে পড়ানো হয়। এরপর লাঞ্চ দেওয়া হয়। যারা হাতের কাজ শেখে না তারা খেয়ে বাসায় চলে যায়। বাকিরা বিকাল চারটা পর্যন্ত স্কুলে থাকে।’ এই স্কুলে অটিজম বা আত্মমগ্নতা রোগে আক্রান্ত অনেক শিশু আছে, উল্লেখ করে এই শিক্ষক বলেন, ‘এই শিশুদের প্রতি আমাদের বিশেষ মনোযোগ দিতে হয় বলেই এদের বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন বলে থাকি। অনেকের চেয়ে দেরিতে এদের বেড়ে ওঠা, অনেকের চেয়ে দেরিতে বুঝতে শেখা।  ফলে তাদের প্রতি অভিভাবক,আত্মীয়- স্বজন ও শিক্ষকদের  দ্বিগুণ মনোযোগ দিতে হবে।’

স্কুলে রয়েছে ব্যায়ামের সুবিধাওএই শিশুদেরই একজন আঁখি আক্তার, প্রধানমন্ত্রীর ঈদ কার্ডে যার ছবি স্থান পেয়েছে। রাজধানীর কামরাঙ্গীচরের ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত শিশু  বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধী মলিনা খাতুন বৃষ্টির বয়স এখন ১৪ বছর। তার বাবা মোহম্মদ আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার মেয়েটা অসুস্থ। সেই মেয়ে আমাকে যে সম্মান এনে দিয়েছে, তা আমি স্বপ্নেও কল্পনা করিনি।’ তিনি বলেন, ‘কার্ডের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া এই লাখ টাকা আমার চোখ খুলে দিয়েছে। শুরু থেকেই মেয়েটির জন্য খুব কষ্ট পেতাম, অবহেলাও যে করিনি তা না। কিন্তু এখন সে কিছু শিখে নিজের একটা ব্যবস্থা করতে পারলে অনেকটা নিশ্চিন্ত হতে পারি।’

‘সীড’ স্কুলের একটি ক্লাসে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরাসীড এর কর্মসূচি সমন্বয়কারী কারিশমা আহমেদ জানান,  মোহাম্মদপুর ও কামরাঙ্গীচর এই দুই এলাকায় সীড পরিচালিত এধরনের স্কুল আছে। তবে আর্থিক সহযোগিতার জটিলতায় সুবিধাবঞ্চিত এই শিশুদের স্কুল দুটো আগামীতে চালিয়ে নেওয়া কতটা সম্ভব হবে, সে নিয়ে শঙ্কার কথাও জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘একটু বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু, অটিস্টিক শিশুদের নিয়ে অনেকেই এখন কাজ করতে এগিয়ে আসছেন। কিন্তু যাদের বাবা মা জানেনই না তাদের শিশুটি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন, কিংবা তাদের শিশুটি সমাজের জন্য বোঝা না, সেসব নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর সন্তানদের জন্য খুব বেশি উদ্যোগ চোখে পড়ে না।  আমরা তাদের নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী এবং করছি। এই শিশুদের আমরা তাদের অধিকার, সমাজে চলার উপযোগী এবং সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার পথ খুঁজে দিতে চেষ্টা করি।’

 

 

 

 

/এপিএইচ/

লাইভ

টপ