‘যুদ্ধাপরাধ’ থেকে নিজেকে যেভাবে লুকিয়ে রেখেছেন হামদর্দের এমডি ইউছুফ হারুন

Send
দীপু সারোয়ার
প্রকাশিত : ২০:২০, সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০৭:৪৯, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০১৯

হামদর্দ ল্যাবরেটরিজ (ওয়াকফ্)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইউসুফ হারুন ভূঁইয়াএকাত্তরে লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর থানা এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করেছিল পাকিস্তানি আর্মি ও রাজাকার বাহিনীর সদস্যরা। সেখানে সংঘটিত হত্যা, লুটপাট ও ধর্ষণের ঘটনায় যার বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তিনি হচ্ছেন ‘রাজাকার কমান্ডার’ ইউছুফ হারুন ভূঁইয়া। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের দাবি, রায়পুরে চার শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা, তাদের সহযোগী, সাধারণ মানুষ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয় রাজাকার কমান্ডার ইউছুফের নির্দেশে। অথচ বিচারের মুখোমুখি হওয়া তো দূরের কথা, দীর্ঘ ৩৩ বছর ধরে বহাল তবিয়তে ওয়াকফ্ প্রতিষ্ঠান হামদর্দ ল্যাবরেটরিজ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদে আসীন আছেন তিনি। গণহত্যায় নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ থাকলেও তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের কোনও মামলাও হয়নি আজও।

রায়পুর মাদ্রাসা আলিয়া। এখানেই পড়াশোনা করেছেন ইউছুফ হারুন ভূঁইয়া

মুক্তিযুদ্ধের সময় রায়পুর এলাকায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও রাজাকারদের বিরুদ্ধে অসম সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করা অন্যতম বীর সেনানী মো. ইসমাইল। এই বীর মুক্তিযোদ্ধা দাবি করেছেন, একাত্তরে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা ছিলেন ইউছুফ হারুন। রায়পুরে ২৫০ সদস্যের সশস্ত্র রাজাকার বাহিনী গঠন করে পুরো এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করেন ইউছুফ হারুন। আরেক রাজাকার কমান্ডার নজরুল ও সিরাজ মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে নিহত হলেও ইউছুফ হারুনকে তারা তখন বাগে আনতে পারেননি। আর যুদ্ধের পর পাঁচ মাস আত্মগোপনে থেকে ঢাকায় চলে এসে ভোল পাল্টে ফেলেন ইউছুফ। ফলে নানা কারণে তাকে তখন আর বিচারের মুখোমুখি করা সম্ভব হয়নি। জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে রায়পুরে গণহত্যার অন্যতম হোতা ইউছুফ হারুনের বিচার দেখে যেতে চান তিনি। তার বিশ্বাস, মুক্তিযুদ্ধের সেই ভয়াবহতার প্রত্যক্ষদর্শীরা যেহেতু এখনও বেঁচে আছেন, তাই এখনও ইউছুফ হারুনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করা সম্ভব। তার কথাকে সমর্থন করেছেন ওই এলাকার আরও অনেক মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা।

তবে এসব অভিযোগের ব্যাপারে জানতে হামদর্দের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইউছুফ হারুন ভূঁইয়াকে বিভিন্নভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি। তার মোবাইল ফোনে এবং রাজধানীর বাংলামোটরে হামদর্দ কার্যালয়ে যোগাযোগ করেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি, দেখাও মেলেনি।

রাজাকার কমান্ডার ইউছুফ হারুনের হাতে নিহত শহীদ মুক্তিযোদ্ধা নায়েক সাত্তারের কবর

রায়পুরের মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একাত্তরের শেষ দিকে রায়পুর থেকে পালিয়ে যান ইউছুফ হারুন। একাত্তরের নভেম্বর থেকে বাহাত্তরের মার্চ পর্যন্ত পাঁচ মাস আত্মগোপনে ছিলেন তিনি। এরপর প্রকাশ্যে আসেন, সেই সঙ্গে চলতে থাকে তার স্বাভাবিক জীবনযাপন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, লক্ষ্মীপুর জেলার উত্তর জয়পুরে চৌপল্লী বাজার। এই এলাকার দত্তপাড়ার দক্ষিণ মাগুরী গ্রামের আবু সাঈদ উল্লাহ ভূঁইয়ার ছেলে ইউছুফ হারুন ভূঁইয়া। পড়াশুনা করেছেন তিনি লক্ষ্মীপুর সদরের টুমচর কামিল মাদ্রাসা ও রায়পুর থানার রায়পুর আলিয়া মাদ্রাসায়। মাদ্রাসার নথি অনুযায়ী, ১৯৭১ সালে রায়পুর আলিয়া মাদ্রাসা থেকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে কামিল পাস করেন ইউছুফ হারুন। ওই মাদ্রাসায় তার রোল নম্বর ছিল ১৩১৯। আর পাসপোর্টের তথ্য বলছে, ইউছুফ হারুনের জন্ম ১৯৫৩ সালের ১ মার্চ।

শহীদ মুক্তিযোদ্ধা নায়েক সাত্তারের কবরের নামফলক

বাংলা ট্রিবিউনের অনুসন্ধানে জানা যায়, একাত্তরের জুলাই মাস থেকে ১ নভেম্বর পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে রায়পুরের মধ্য চরপাতা, দত্তপাড়া, চরআবাবিল, উত্তর হেমায়েতপুর, দক্ষিণ উদমারা, পূর্ব কেরুয়া, ডাকাতিয়া নদীর লঞ্চঘাট, দেনায়েতপুর, পশ্চিম চরপাতা এলাকায় ইউছুফ হারুনের নেতৃত্বে হত্যা, ধর্ষণ আর লুণ্ঠন চলে। ১ নভেম্বর দিবাগত গভীর রাতে রায়পুর সদর, পালেরপোলসহ বিভিন্ন এলাকায় শেষবারের মতো নারকীয় তাণ্ডবে নেতৃত্ব দেন তিনি। ওই রাতেই রায়পুর থেকে পালিয়ে ঢাকায় আসেন ইউছুফ হারুন। ১৬ ডিসেম্বরের পর আবারও ঢাকা থেকে পালিয়ে গিয়ে কুমিল্লার নাঙ্গলকোটের ফুলপুরে আত্মগোপনে করেন। ১৯৭২ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন। পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক হলে ওই বছরের এপ্রিলে ইউছুফ হারুন ঢাকায় ফেরেন। জুন মাসে ১৭০ টাকা বেতনে হামদর্দ ল্যাবরেটরিজের (ওয়াকফ) গুলিস্তান শাখায় কাউন্টার সেলসম্যান হিসেবে যোগ দেন। এরপর দ্রুত জীবনের রঙ পাল্টাতে থাকে তার। কিছু জামায়াত নেতার আনুকূল্য পেয়ে অবিশ্বাস্য এক উত্থান পর্বের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের মাত্র দেড় দশকের মাথায় ১৯৮৬ সালে হামদর্দের এমডি পদে নিয়োগ পেয়ে যান তিনি। তখন থেকেই এই পদে দায়িত্ব পালন করছেন ইউছুফ হারুন ভূঁইয়া। 

অভিযোগ আছে, ব্যবস্থাপনা পরিচালক হওয়ার পর ওয়াকফ্ আইনের তোয়াক্কা না করে হামদর্দে পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছেন ইউছুফ হারুন। তার তিন সন্তান হামদর্দের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি পদে আছেন। প্রতিষ্ঠানটিতে লুটপাটের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকায় ধর্ম মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে এ বছরের ২৩ এপ্রিল। এছাড়া, ইউছুফ হারুনের অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গত ২৯ আগস্ট তাকে জিজ্ঞাসাবাদও করেছে দুদক।

জানা যায়, রায়পুরের সর্বত্র এখনও একাত্তরের হত্যা, লুণ্ঠন ও ধর্ষণ ঘটনার স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন অনেকে। তবে হত্যা আর লুণ্ঠনের ব্যাপারে মুখ খুললেও ধর্ষণ নিয়ে কথা বলতে চান না কেউই। মুক্তিযুদ্ধের সময় সংখ্যালঘু অধ্যুষিত পালেরপোল এলাকায় ধর্ষণের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে বলে জানিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা। তারা জানান, নিরাপত্তা, সাহস আর বিচারের আশ্বাস পেলে ইউছুফ হারুন ও তার সহযোগীদের অপরাধের বিষয়ে অনেকেই মুখ খুলবেন। কিন্তু সেই আশ্বাস কি কখনও মিলবে, প্রশ্ন তাদের।

‘রাজাকার কমান্ডার’ ইউছুফ ও তার বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে শহীদ হন ওয়াহিদ উল্লাহ। তাঁর কবরের স্মৃতিফলক।

একাত্তরের ১ নভেম্বর পালেরপোল এলাকায় সংঘটিত হত্যা, লুণ্ঠন নিয়ে কথা বলেন শহীদ বিনয় চন্দ্র দে’র ভাই মানিক চন্দ্র দে। রাজাকারদের হামলা ও লুটপাটের সময়ে তিনি ধানক্ষেতে আশ্রয় নিয়ে প্রাণে বেঁচে ছিলেন। মানিক চন্দ্র দে বলেন, ‘ভোররাতে তৎকালীন লক্ষ্মীপুর মহকুমার রায়পুর থানার পালেরপোল এলাকা আক্রমণ করে রাজাকারবাহিনীর সদস্যরা। গুলি, আগুন আর ধারালো অস্ত্র নিয়ে কালো জোব্বা পরা ২০ জনের একটি দল মুহূর্তেই ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। ভীতসন্ত্রস্ত মানুষ প্রাণ বাঁচাতে ছুটোছুটি শুরু করেন। দ্রুত তারা পুকুর, ধানক্ষেত, গাছ, ঘরের চালে লুকিয়ে আশ্রয় নেয়। কিন্তু, বিনয়কে দেখে ফেলে তারা। হঠাৎ গুলির শব্দের সঙ্গে সঙ্গে আমার ভাই বিনয়ের আর্তনাদ কানে এলো। বুঝলাম সব শেষ।’

তিনি বলেন, ‘পালেরপোল এলাকায় সেদিন বিনয়সহ পাঁচ জনকে হত্যা করা হয়। অন্যরা হলেন—শহীদ চন্দ্র মোহন দে, সুদীপ দাশ, পরেশ চন্দ্র দে ও চৈতন্য কুমার দে।’ ওই ঘটনার নির্দেশদাতা রাজাকার কমান্ডার ইউছুফ হারুন ছিল বলে দাবি করেন তিনি।

শহীদ বিনয় চন্দ্র দে’কে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা জানাচ্ছেন ভাই মানিক চন্দ্র দে
এলাকার মুক্তিযোদ্ধা নিজাম উদ্দিন পাঠান বলেন, ‘একাত্তরে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহের কোনও একদিন। তারিখটি এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না। সম্ভবত ১ নভেম্বর হবে। যুদ্ধটা হয়েছিল ভোরবেলায়। রাজাকার ও পাক আর্মিদের ওপরে আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছিলো রায়পুরের মুক্তিযোদ্ধারা। কিন্তু তার আগেই আক্রমণ করে বসে রাজাকার বাহিনী। ওই যুদ্ধে রাজাকার ইউছুফ হারুনের গুলিতে আমার সহযোদ্ধা বাসু শহীদ হন। রাজাকার বাহিনীর হাতে রাইফেল ছিল। আমাদের হাতে ছিল এলএমজি। এ কারণে শেষ পর্যন্ত পালিয়ে যায় রাজাকাররা। পরে আমরা বাসুর লাশ দাফন করি। যেখানে তাকে দাফন করা হয়েছে, সেই এলাকাটিই এখন বাসু বাজার নামে পরিচিত।’

মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসমাইল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘একাত্তরের প্রতিটি ঘটনাই গুরুত্বপূর্ণ। তবে কোনও কোনও ঘটনা খুব বেশি দাগ কেটে আছে। মুক্তিযোদ্ধা এবিএম ওয়াহিদ উল্লাহর কথা আমি কোনও দিনই ভুলতে পারবো না। আমার সহযোদ্ধা ছিলেন তিনি। একাত্তরের ৫ সেপ্টেম্বর রায়পুরে ডাকাতিয়া নদীর লঞ্চঘাট থেকে রাজাকার ইউছুফ হারুন ভূঁইয়া, নজরুল ও সিরাজের হাতে আটক হন ওয়াহিদ।’

তিনি বলেন, ‘রায়পুর আলিয়া মাদ্রাসায় রাজাকার ক্যাম্পে ওয়াহিদের ওপর বর্বর কায়দায় নির্যাতন চলে। মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান, সংখ্যা, অস্ত্র-গুলির হিসাব চাওয়া হয় তার কাছে। অমানবিক নির্যাতনের মধ্যেও মুখ খোলেননি তিনি। আর তাই গুলি ও জবাই করে হত্যা করা হয় তাকে। রায়পুর পোস্ট অফিস এলাকার ব্রিজ থেকে নদীতে ফেলে দেওয়া হয় তার বস্তাবন্দি লাশ। ভেসে যাওয়া লাশ উদ্ধার হয় সোলাখালী ব্রিজ এলাকা থেকে। সেখানেই চিরনিদ্রায় আছেন মুক্তিযোদ্ধা ওয়াহিদ।’

রাজাকার কমান্ডার ইউছুফ ও তার বাহিনীর নির্মমতার কথা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান শহীদ মুক্তিযোদ্ধা শহীদ উল্লাহর ভাই দেলোয়ার হোসেন লোকমানশহীদ মুক্তিযোদ্ধা মো. শহীদ উল্লাহর ভাই দেলোয়ার হোসেন লোকমান বলেন, ‘আমার ভাই মো. শহীদ উল্লাহকে একাত্তরের ৩ সেপ্টেম্বর ধানহাটা থেকে তুলে নিয়ে যায় রাজাকার বাহিনী। শহীদ উল্লাহ একটি পানের দোকান চালাতেন। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের ‘ক্যুরিয়ার’ হিসেবে কাজ করতেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা আমাদের জানিয়েছিল—রাজাকার কমান্ডার ইউছুফ হারুন, নজরুল ও সিরাজের নেতৃত্বে শহীদ উল্লাহকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। রায়পুর আলিয়া মাদ্রাসায় গুলি ও পেট কেটে তাকে হত্যা করা হয়। পরে তার লাশ ফেলে দেওয়া হয় নদীতে। ৪ সেপ্টেম্বর ভাইয়ের লাশ উদ্ধার করি আমরা। জানাজার সময় রাজাকাররা আবারও হামলা চালায়। পরে জানাজা ছাড়াই ভাইকে দাফন করি।’

মুক্তিযোদ্ধা শহীদ নায়েক আবদুস সাত্তারের মেয়ে পারভীন আক্তার জানান, একাত্তরে তার বয়স ছিল মাত্র দেড় বছর। বড় হয়ে মা, স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে তার বাবাকে (শহীদ সাত্তার) নির্মমভাবে হত্যার কথা শুনেছেন তিনি।

শহীদ মুক্তিযোদ্ধা নায়েক সাত্তারের স্ত্রী ফজিলাতুন্নেসা (বামে) ও কন্যা পারভীন আক্তার

বৃদ্ধা মা ফজিলাতুন্নেসার বরাত দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সাত্তারের মেয়ে পারভীন জানান, একাত্তরের ৮ সেপ্টেম্বর লক্ষ্মীপুর বাজার থেকে নায়েক আব্দুস সাত্তারকে আটক করা হয়। পরে কসাই হাটায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে গুলি করে হত্যা করা হয় তাকে। পরে পেট কেটে ভুঁড়ি বের করে রাজাকার সদস্যরা। লাশ ফেলে দেওয়া হয় নদীতে।

তিনি বলেন, ‘বাবাকে নিয়ে অনেক গর্ব আমার। দেশের জন্য প্রাণ দিয়ে শহীদ হয়েছেন তিনি। মৃত্যুর সময় তার বয়স ছিল মাত্র ৪০ বছর।’

পারভীন আক্তার আরও  বলেন, ‘মার কাছে শুনেছি ঘটনার চারদিন পর বাবার লাশ উদ্ধার করে দাফনের ব্যবস্থা করেন গাজীনগরের বাসিন্দারা। বাবাকে হত্যায় সরাসরি জড়িত ছিলেন ইউছুফ হারুন। প্রত্যক্ষদর্শীরা এখনও বেঁচে আছেন। আমি আমার বাবা ও বাবার মতো যাদের হত্যা করা হয়েছে তার বিচার চাই।’

জামায়াতে ইসলামীর আমির থাকাকালীন গোলাম আযমের সঙ্গে ইউছুফ হারুন ভূঁইয়ার সখ্য ছিল আলোচিত।


রায়পুরের হাটসহ মাঠে-ঘাটে মুক্তিযুদ্ধের নানা স্মৃতি ছড়িয়ে আছে। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে, শহীদ পরিবারগুলোর কাছে শহীদদের তালিকা আছে। আছে রাজাকারদের তালিকাও। পাক হানাদার বাহিনী আর তাদের এদেশীয় সহযোগীদের বর্বরোচিত তাণ্ডবের কথা এখনও ভোলেননি তারা।

তারা চান যুদ্ধাপরাধের বিচার। স্বপ্ন দেখেন ইউছুফ হারুনদের মতো যারা এখনও বেঁচে আছেন, তাদের বিচার হবে, আর চূড়ান্ত শাস্তির মধ্যদিয়ে প্রতিষ্ঠা হবে ন্যায়বিচার।


ইউছুফ হারুন ভূইয়া যে জামায়াতের সদস্য তার অগণিত প্রমাণও আছে। দলটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে সংগঠনটির তদানীন্তন আমির গোলাম আযমসহ ঊর্ধ্বতন নেতাদের সঙ্গে তার যোগাযোগ থাকার বিষয়টি ছবিসহ প্রমাণিত। জামায়াত নেতা মীর কাশেম আলী হামদর্দের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য থাকাকালীন ইউছুফ হারুনকে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়োগ দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এমন অভিযোগ রয়েছে হামদর্দ সংশ্লিষ্ট অনেকের। দলটির পরবর্তী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক মন্ত্রী আলী আহসান মুজাহিদের সঙ্গে ইউছুফ হারুনের অন্তরঙ্গতা ও সখ্য ছিল এমন ছবিও আছে বাংলা ট্রিবিউনের কাছে। উল্লেখ্য, মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে ফাঁসি কার্যকর হয়েছে মীর কাশেম আলী ও আলী আহসান মুজাহিদের।

জামায়াত নেতা আলী আহসান মুজাহিদের সঙ্গেও সখ্য ছিল ইউছুফ হারুন ভূঁইয়ার। মুজাহিদ পরে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হলে তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

রায়পুরের গণহত্যা নিয়ে কাজ করছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল

রায়পুরের গণহত্যা ও এর সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন, তা খুঁজে বের করতে কাজ করছে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের লক্ষ্যে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। এ বিষয়ে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ জমা হয়েছে গত ২৮ আগস্ট। রায়পুরে সরেজমিন অনুসন্ধান শুরু হয়েছে গত রবিবার (৮ সেপ্টেম্বর)।


ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক এম সানাউল হক বলেন, ‘রায়পুরের গণহত্যার বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। তদন্ত সংস্থার সদস্যরা মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ পরিবারের সদস্য ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলছেন। তাদের বক্তব্য লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে।’

/এপিএইচ/টিএন/এমওএফ/

লাইভ

টপ