নতুন করে নয়, ঢাকার বাইরে আগে থেকেই ছিল ডেঙ্গু!

Send
জাকিয়া আহমেদ
প্রকাশিত : ১৯:৪৯, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০২:০০, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০১৯

ডেঙ্গু রোগী (ফাইল ছবি)

১৫ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায়  নতুন করে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৬৫৩ জন রোগী। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকার ভেতরে ১৯৩ জন আর ঢাকার বাইরে ৪৬০ জন। আগের দিনের চেয়ে এই সংখ্যা ৩৪ জন বেশি। আর দৈনিক হিসাব পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, রাজধানী ঢাকার বাইরে ঢাকা বিভাগসহ মোট আট বিভাগে  ১৬ সেপ্টেম্বর সকাল পর্যন্ত নতুন করে ডেঙ্গুতে আক্রান্তদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৮৫ জন রোগী খুলনা বিভাগে । এ তথ্য আবারও নিশ্চিত করছে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব এখন ঢাকার বাইরেই বেশি। আর এ রোগ ছড়াচ্ছে শহরের এডিস ইজিপ্টি মশার পাশাপাশি তার স্বজাতি গ্রামে থাকা এডিস অ্যালবোপিকটাস প্রজাতির মশা। তাই বিশেষজ্ঞরা এখন স্বীকার করছেন, নতুন করে নয়, ঢাকার বাইরে আগে থেকেই ছিল ডেঙ্গু রোগের বাহক এডিস অ্যালবোপিকটাস মশা। এতদিন এই জাতের মশা ডেঙ্গুর ভাইরাস খুব একটা বহন না করলেও এবছর শহরের এডিস ইজিপ্টি মশার দ্বারা আক্রান্ত রোগীদের কামড় দিয়ে সংক্রমিত হয়ে রোগটি এখন সারাদেশে ছড়াচ্ছে এডিস মশার গ্রামীণ এই প্রজাতিটি। এ কারণে এখন শুধু রাজধানী শহর নয়, ডেঙ্গু প্রতিরোধের জন্য সারাদেশে এডিস অ্যালবোপিকটাস প্রজাতির মশার প্রজনন স্থল ধ্বংসে সমান গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিগত বছরগুলোতে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বিচারে সেপ্টেম্বরকে এতদিন সংশ্লিষ্টরা পিকটাইম হিসেবেই অভিহিত করে এসেছেন। কিন্তু গত আগস্ট মাসের শুরু থেকেই কমতে শুরু করেছে নতুন করে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা, চলতি মাসে সেটা হাজারের নিচে নেমে আসে। তবে স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগী তালিকা থেকে দেখা যায় চলতি মাসের শুরু থেকেই রাজধানী ঢাকার ভেতরে রোগী সংখ্যা কমে এলেও দিনকে দিন ঢাকার বাইরে নতুন করে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগী সংখ্যা বেড়েই চলেছে। তারা বলছেন, ঢাকার বাইরে প্রতিদিন রোগী সংখ্যা বাড়ার কারণেই ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা কাঙ্ক্ষিত হারে কমানো যাচ্ছে না। এদিকে, ঢাকার বাইরে ডেঙ্গু রোগী কেন বাড়ছে সেটা নিয়ে কাজ করছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউট (আইইডিসিআর)।

আগের দিন অর্থাৎ ১৫ সেপ্টেম্বর নতুন করে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন ৬১৯ জন। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকাতে ১৬৩ জন আর ঢাকার বাইরে ৪৫৬ জন। তার আগের দিনে ( ১৪ সেপ্টেম্বর) আক্রান্ত হওয়া মোট ৫২৭ জনের মধ্যে ঢাকার ভেতরে ছিল ১৫৬ আর ঢাকার বাইরে ৩৭১ জন। তার আগের দিন ( ১৩ সেপ্টেম্বর) রোগী সংখ্যা ছিল ৬৭২ জন, এর মধ্যে ঢাকার ভেতরে ২২৮ জন আর ঢাকার বাইরে ৪৪৪ জন, তার আগের দিন ( ১২ সেপ্টেম্বর) মোট রোগী ছিল ৭৫০ জন, এর মধ্যে ঢাকার ভেতরে ২৩৭ জন আর ঢাকার বাইরে ছিল ৫২৩ জন, তার আগের দিন গত ১১ সেপ্টেম্বর রোগী সংখ্যা ছিল ৬৩৪ জন, এর মধ্যে ঢাকার ভেতরে ছিল ২২১ জন আর ঢাকার বাইরে ছিল ৪১৩ জন, তার আগের দিন ( ১০ সেপ্টেম্বর) রোগী সংখ্যা ছিল ৭৭৩ জন, এর মধ্যে ঢাকার ভেতরে ছিল ২৯৪ জন আর ঢাকার বাইরে ছিল ৪৫৯ জন, গত ৯ সেপ্টেম্বর রোগী সংখ্যা ছিল ৭১৬ জন, এর মধ্যে ঢাকার ভেতরে ছিল ৩০০ জন আর ঢাকার বাইরে ছিল ৪১৬ জন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতদিন ডেঙ্গু রোগকে রাজধানী ঢাকাকেন্দ্রিক ধরে নিয়ে সব ধরনের নজরদারি, কর্মকৌশল ও সচেতনতামূলক কাজ নেওয়া হয়েছে। যার অন্যতম কারণ হিসেবে তারা বলেছেন, ডেঙ্গু রোগের বাহক এডিস ইজিপ্টি শহরের মশা, এ থেকেই মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে। কিন্তু ডেঙ্গুর সেকেন্ডারি বাহক হিসেবে অ্যালবোপিকটাসকে তারা ধর্তব্যে আনেননি। সে হিসেবে সচেতনতামূলক প্রোগ্রাম, নজরাদারিও শুরু থেকে নেওয়া হয়নি। কিন্তু এখন তারা বলছেন, রাজধানী ঢাকার মতো ঢাকার বাইরেও এডিস অ্যালবোপিকটাসকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে, এ মশা নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে হবে সমানভাবে।

এদিকে, ঢাকার বাইরে কেন ডেঙ্গু এভাবে ছড়িয়ে পড়লো সে কারণ খুঁজতে কাজ করছে স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা। রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ঢাকার বাইরে কেন এ অবস্থা হলো সে বিষয়টি খুঁজে নিয়ে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউট এর পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, ঢাকার বাইরে যে মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে সে বিষয়ে আমাদের গবেষণা দল নিশ্চিত হয়েছেন। তারা দেখেছেন গ্রামে অ্যালবোপিকটাস রয়েছে। আমরা নিশ্চিত হয়েছি ডেঙ্গুর সেকেন্ডারি ভেক্টর বলা হলেও এডিস অ্যালবোপিকটাস ডেঙ্গু ছড়াচ্ছে।

আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন এই মশা এসব জায়গাতে আগে থেকেই আছে, কিন্তু সেভাবে আগে ডায়াগনোসিস হয়নি। এবার যেহেতু মানুষ সচেতন হয়েছে, ডেঙ্গু টেস্ট হয়েছে তাই জানা যাচ্ছে। জ্বর নিয়ে হয়তো মানুষ গিয়েছে চিকিৎসকের কাছে, তিনি ওষুধ দিয়েছেন, ডায়াগনোসিস প্রপার হয় না, মফস্বলে তো সেরকম টেস্টিং ফ্যাসিলিটিস নাই।

আর অ্যালবোপিকটাস মূলত জন্মায়  যেখানে ন্যাচারালি পানি আটকায় সেসব জায়গায় যেমন গাছের কোঠরে, কচু গাছের পাতাসহ এমন সব জায়গাতে। শহরের ঝোঁপ-ঝাড়েও কিন্তু অ্যালবোপিকটাস পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। আর গ্রামে তো আছেই। আর এডিস এজিপ্টিও গ্রামে রয়েছে, কারণ সেখানেও ‘আরবানাইজেশন’ হচ্ছে।

কেবল ঢাকা শহরে কন্ট্রোল করলেই হবে না সারাদেশে মশা নিয়ন্ত্রণ ও নিধন করতে হবে মন্তব্য করে অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘ম্যালেরিয়ার সময় সারাদেশ জুড়ে কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল, এখনও সেভাবে সারাদেশ জুড়েই কর্মসূচি নিতে হবে। গ্রামেও মশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রাখতে হবে।’

 

/টিএন/

লাইভ

টপ