মতিঝিল থানার ৩০০ গজের মধ্যে চার ক্যাসিনো

Send
রাফসান জানি
প্রকাশিত : ১২:১৪, সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৪৯, সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৯

দিলকুশা স্পোর্টিং ক্লাবরাজধানীর ফকিরাপুলের কালভার্ট রোডে মতিঝিল থানা। আর এই থানার ৩০০ গজের মধ্যেই রয়েছে চারটি ক্যাসিনো। স্থানীয় বাসিন্দা থেকে শুরু করে আশপাশের ব্যবসায়ীদের সবাই জানতো এই ক্যাসিনোগুলোতে প্রতিদিন বসে জুয়ার আসর। আর এগুলো চালাতো যুবলীগের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা। তাদের মাথার ওপরে দলটির কেন্দ্রীয় নেতা, মন্ত্রী, এমপিদের আশীর্বাদ থাকায় তারা এতটাই প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর ছিল যে তাদের ব্যাপারে অভিযোগ করার সাহস পেতেন না কেউ। উল্টো এলাকার ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়ম করে মাসোহারা নিয়ে যেতো যুবলীগের নেতা পরিচয়ধারী এসব ক্যাসিনোর মালিকদের পোষা ক্যাডাররা। চার চারটি ক্যাসিনো নাকের ডগায় চললেও এবং দীর্ঘদিন ধরে এলাকাজুড়ে চাঁদাবাজি চললেও কোনও ধরনের হাঁচি-কাশি দেয়নি মতিঝিল থানা পুলিশ। বরং জুয়ার টাকার বখরা পকেটে পুরে চোখ বন্ধ করে থাকতো তারা, এমন অভিযোগ রয়েছে এই থানার পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, মতিঝিল থানার আশেপাশে থাকা এসব ক্লাব হচ্ছে−ফকিরাপুল ইয়ংমেন্স ক্লাব, ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাব, আরামবাগ ক্রীড়া সংঘ ও দিলকুশা স্পোর্টিং ক্লাব। বাইরে ক্রীড়াঙ্গনের মূলধারার ক্লাব হিসেবে পরিচিতি থাকলেও গত পাঁচ-সাত বছর ধরে এসব ক্লাবের মূল কর্মকাণ্ডই ছিল ক্যাসিনো পরিচালনা ও জুয়া খেলা পরিচালনা। পাশাপাশি বিক্রি হতো বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য। এরমধ্যে দুটি ক্লাবে ২৪ ঘণ্টাই ক্যাসিনো চলতো বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা। এর মধ্যে গত বুধবার ফকিরাপুল ইয়ংমেন্স ক্লাব ও ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে অভিযান চালায় র‌্যাব। আর এর মধ্য দিয়েই এসব ক্লাবের ভেতরে দেশে নিষিদ্ধ ক্যাসিনো ব্যবসা পরিচালনার খবর দেশবাসী জানতে পারে। 

ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবতবে র‌্যাব এই অভিযান চালালেও ঘটনাস্থলের নাকের ডগায় থাকা মতিঝিল থানার কর্মকর্তারা একেবারেই চুপ। এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) থেকেও তেমন কিছু বলা হচ্ছে না। যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বুধবার রাতের ওই অভিযানের পরদিন বলেছেন, শুধু ক্যাসিনো নয়, সব অবৈধ ব্যবসার বিরুদ্ধে অভিযান চলবে।

জানতে চাইলে মতিঝিল বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার আনোয়ার হোসেন ক্যাসিনো ক্লাবগুলো ও এর হোতাদের ব্যাপারে একেবারেই কথা বলতে চাননি। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, আমাদের ঊর্ধ্বতনরা এ ব্যাপারে কথা বলেছেন। এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারবো না।

আরামবাগ ক্রীড়া সংঘতবে ক্লাবের ভেতরে ক্যাসিনো চলার বিষয়টি জানা নেই এমন মন্তব্য করলেও জুয়ার টাকায় এসব ক্লাব চলে বলে মন্তব্য করেছেন মতিঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওমর ফারুক। তিনি বাংলা ট্রিবিউন-এর কনটেন্ট পার্টনার ও জার্মানিভিত্তিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘মতিঝিল এলাকা ক্লাবপাড়া, এখানে জুয়া খেলা হয়। এটা সবাই জানে। ক্লাব চলে জুয়ার টাকায়। ক্যাসিনো-ম্যাসিনো কী আমি বুঝি না। ক্যাসিনোর খবর আমাদের জানা নেই।’

গত (১৪ সেপ্টেম্বর)  যুবলীগের কয়েকজন নেতাকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষোভ প্রকাশের চার দিনের মাথায় ১৮ এপ্রিল রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় চারটি ক্যাসিনোতে অভিযান চালায় র‌্যাব। এর মধ্যে ফকিরাপুলের দুটি ক্যাসিনো সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে। ক্লাবের আড়ালে ক্যাসিনো চালানোর অভিযোগে ফকিরাপুল ইয়ংমেন্স ক্লাব ও ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাব দুটিকে র‌্যাব সিলগালা করলেও বাকি দুটি ক্লাবের কর্তৃপক্ষ নিজেরাই ক্লাব বন্ধ রেখেছে। তবে আরামবাগ ক্রীড়া সংঘ ও দিলকুশা স্পোর্টিং ক্লাব নামের এই দুটি ক্লাবেও ২৪ ঘণ্টা ক্যাসিনো চালানো বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা।

ঘটনার একদিন পর ফকিরাপুল এলাকায় ক্লাবপাড়া ঘুরে দেখা গেছে, মতিঝিল থানার ঠিক পেছনের এক সড়কেই রয়েছে চারটি ক্লাব। প্রথমেই রয়েছে ফকিরাপুল ইয়ংমেন্স ক্লাব, এরপরই আছে ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাব। একটু এগিয়ে গেলে আরও দুটি ক্লাব। সেগুলো হলো আরামবাগ ক্রীড়া সংঘ ও দিলকুশা স্পোর্টিং ক্লাব। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চারটি ক্লাবই ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকত। প্রচুর লোকজন আসা যাওয়া করত।

ফকিরেরপুল ইয়ং মেনস ক্লাবক্লাবের আড়ালে ক্যাসিনো বা জুয়ার আসর বসতো, এটা সবাই জানতো বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, ক্লাবগুলোয় প্রতিদিন শত শত লোক আসে। জুয়া খেলে, এটা সবাই জানে।

ক্লাবগুলোতে নিয়মিত যাতায়াত করা একজন সাবেক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, ক্লাবের ভেতরে জুয়া চলে এটা নতুন না। বিকেল হলে ক্লাবে যাই। বন্ধুরা মিলে কার্ড খেলি। ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে দুটি পার্ট রয়েছে। এক পার্টে কার্ড খেলা হয়, অন্য পার্টে ক্যাসিনো। ক্যাসিনোতে খুব একটা যাওয়া হতো না। এত টাকা নেই।

ঢাকার বনানী, মতিঝিল, ফকিরাপুল ও গুলিস্তানের ক্যাসিনোতে অভিযান পরিচালনা করে র‌্যাব-৩ ও ১। অভিযানে ফকিরাপুল ইয়ংমেন্স ক্লাব, ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাব, মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়া চক্র ও বনানী আহম্মেদ টাওয়ারের গোল্ডেন ঢাকা বাংলাদেশ নামক ক্যাসিনোগুলো সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে।

ফকিরাপুল ইয়ংমেন্স ক্লাবের ক্যাসিনোতে অভিযান চালিয়ে ১৪২ জনকে সাজা দিয়েছেন র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। উদ্ধার করা হয়েছে ২৪ লাখ টাকা ও মদ বিয়ারসহ বিভিন্ন মাদক।  অভিযান শেষে ক্যাসিনোটি সিলগালা করে দিয়েছে র‌্যাব।

র‌্যাব জানিয়েছে, এই ক্যাসিনো পরিচালনা করেন গ্রেফতার হওয়া যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া।

ইয়ংমেন্স ক্লাবের পাশেই রয়েছে ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাব। র‌্যাবের অভিযানে সেখানে পাওয়া গেছে ১০ লাখ ২৭ হাজার ২০০ টাকা, ২০ হাজার ৫০০ জাল টাকা। এছাড়া মদ, বিয়ার এবং যৌন উত্তেজক ট্যাবলেট।

র‌্যাব-৩ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল শাফিউল্লাহ বুলবুল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এখান থেকে কাউকে আটক করা যায়নি। তারা বিকালে পালিয়েছে।’

/আরজে/টিএন/এমএমজে/

লাইভ

টপ