ডেঙ্গুতে মৃত্যু: হাসপাতালের সঙ্গে ‘ডেথ রিভিউ কমিটি’র গরমিল কেন?

Send
জাকিয়া আহমেদ
প্রকাশিত : ২১:০০, সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:৩১, সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৯

7সরকারের রোগ তত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)-এ প্রতিটি হাসপাতাল থেকে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত প্রতিটি মৃত্যুর ঘটনা আসে। ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ঘটনা পর্যালোচনার জন্য ইতোমধ্যেই একটি ডেথ রিভিউ কমিটিও করেছে আইইডিসিআর। হাসপাতাল ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের প্রকাশিত তথ্য মতে, ঢাকাসহ সারাদেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা ২০৩ জন। অথচ শনিবার (২০ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত আইইডিসিআরের ডেথ রিভিউ কমিটি বলছে, ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা মাত্র ৬৮। এই সংখ্যা সারাদেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যার চেয়ে অনেক কম বলে দাবি হাসাপাতাল সংশ্লিষ্ট ও রোগীর স্বজনদের। তাদের মতে, এখানে হিসাবে বড় ধরনের গরমিল রয়েছে। এতে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। এই বিভ্রান্তি দূর করার জন্য ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সব তথ্য আইইডিসিআরের ওয়েব সাইটে দেওয়া উচিত। তাহলে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সব তথ্যই সহজে সবাই পাবে। আর বিষয়টি নিয়ে কোনও জটিলতাও থাকবে না।

গত ৮ আগস্ট রাজধানীর শ্যামলীতে অবস্থিত সিকেডি হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা যায় ১২ বছর বয়সী সাদিয়া। শিশুটি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. তারিক সুমনের বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতো।

ডা. তারিক সুমন বলেন, ‘ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পর সাদিয়াকে প্রথমে ঢাকা শিশু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর অবস্থার অবনতি হলে তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ)-তে রাখার দরকার হয়। কিন্তু ওই সময়ে শিশু হাসপাতালে কোনও আইসিইউ-বেড খালি না থাকায় তাকে অন্য হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। তখন শ্যামলীর সিকেডি হাসপাতালে ভর্তি করাই। সেখানেই চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় সাদিয়া মারা যায়।’ তিনি বলতেন, ‘সাদিয়া ডেঙ্গু ডায়াগনোসিস হয়েছিল, তার অন্য রোগ ছিল না। সে ডেঙ্গুতেই মারা গেছে।’

গত ৪ সেপ্টেম্বর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের আজিমপুর শাখার শিক্ষার্থী ইশরা তাসকিন অস্মিতা। রাজধানীর মিলেনিয়াম হাসপাতালে আইসিউতে থাকা অবস্থায় মারা যায় বলে আইসিইউ-এর ইনচার্জ ডা. মোহাম্মদ সুলতান পারভেজ নিশ্চিত করেন।  তিনি বলেন, ‘অস্মিতা মূলত খিঁচুনি নিয়েই আমাদের হাসপাতালে আসে, কিন্তু তার ডায়াগনোসিস ছিল ডেঙ্গু। ’ 

এদিকে, গত ৫ আগস্ট জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান ইডেন মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী শান্তা আক্তার। হাসপাতালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ডা. সামিউল হাসান বলেন, ‘শান্তা তাদের হাসপাতালে ২২ ঘণ্টা ভর্তি ছিলেন ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমে আক্রান্ত হয়ে।

গত ৬ আগস্ট ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় ৩ বছর সাত মাসের আনাস ইবনে হোসাইন। আনাসের মা খন্দকার আয়শা সিদ্দিকা বলেন, ‘১১দিন বিভিন্ন হাসপাতালে ছোটাছুটি করেছি। এরপর ছেলে মারা যায় লালমাটিয়ার ঢাকা শিশু-নবজাতক ও জেনারেল হাসপাতালে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার ছেলেটা ডেঙ্গু হয়ে মারা গেলো। কেউতো খোঁজ নিতেও এলো না। সরকার যে মৃত্যু তালিকার হিসাব দেয়, তাহলে কী সেখানে আমার ছেলের নাম আছে ?’

গত ২০ জুলাই ৩৪ দিনের মুসা মাহমুদ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর বনশ্রীতে অবস্থিত আল রাজী হাসপাতালে। মুসার মা সানজিদা আলম আঁখি বলেন, ‘‘ছেলে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ছিল, হাসপাতাল থেকে দেওয়া ‘ডেথ সার্টিফিকেটে’ও মৃত্যুর কারণ ডেঙ্গু লেখা হয়েছে।’’

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে প্রতিদিন গণমাধ্যমে ডেঙ্গু সংক্রান্ত প্রতিবেদন পাঠানো হয়। তাতে ঢাকা মহানগরীর ১২টি সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত হাসপাতাল আর ২৯টি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে ডেঙ্গু সংক্রান্ত তথ্য থাকে। এসব হাসপাতাল ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুর খবর সরবরাহ করে। কিন্তু  গণমাধ্যমে পাঠানো উল্লিখিত সিকেডি হাসপাতাল, মিলেনিয়াম হাসপাতাল, জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল, ঢাকা শিশু-নবজাতক ও জেনারেল হাসপাতাল, বনশ্রীর আল রাজী হাসপাতালে নাম স্বাস্থ্য অধিফতরের  তালিকায় নেই।

স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে জানা গেছে, ঢাকা শহরে অন্তত সাড়ে পাঁচশোর মতো বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেল্থ ইমার্জেন্সি সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ডা. আয়শা আক্তার বলেন, ‘হাসপাতাল থেকে সব মৃত্যুর সংবাদ আইইডিসিআরের কাছে পাঠানো হয়।’ কিন্তু বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী অন্তত পাঁচটি হাসপাতালের মৃত্যুর কথা তাদের তালিকাতে নেই। বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এসব হাসপাতালের কথা অন্যান্য নামে লিপিবদ্ধ করা হয়।’

জানতে চাইলে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, ‘‘গণমাধ্যমে যেসব মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়, সেসব বিষয়ে আমরা যোগাযোগ করি। সোশ্যাল মিডিয়াও মনিটরিং করা হয়। সে অনুযায়ী হাসপাতালের খোঁজ নেওয়া হয়। তবে অনেক সময়ই পুরো চিকিৎসা ফাইল আমাদের কাছে না এলে সেটা ‘নিউজ’ হলেও আমাদের তালিকাভুক্ত করতে পারি না।’’

সব মৃত্যুর তথ্য আইইডিসিআরের ওয়েবসাইটে পাবলিক করে দেওয়া গেলে তা সবার জানতে সুবিধা হতো কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘এ পর্যন্ত ২০৩টি মৃত্যুর ঘটনায় ১১৬টি রিভিউ হয়েছে। সেখান থেকে ডেথ রিভিউ কমিটি ডেঙ্গুতে ৬৮জনের মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে। কিন্তু যখন ডেঙ্গুতে সন্দেহজনক মৃত্যু হিসেবে আমরা তালিকা ওয়েবসাইটে দেবো, কিন্তু  ডেথ রিভিউ কমিটি মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হবে না, তখন সেটা ‘কনফিউশন’ তৈরি করবে। এটি আমরা চাই না।’’

এদিকে, সব মৃত্যু, সব রোগীর শতভাগ সার্ভিলেন্স করার মতো সক্ষমতা স্বাস্থ্য অধিদফতর বা আইইডিসিআরের নেই বলে মন্তব্য করেছেন প্রতিষ্ঠানটি সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান। তিনি বলেন, ‘অথচ এটিই ভীষণভাবে প্রয়োজন। এই সংক্রান্ত একটি সার্ভে হওয়া অত্যন্ত দরকার।’ ডেঙ্গুতে দেশে কত মানুষের ‍মৃত্যু হয়েছে, সেটি জানা না গেলে ভবিষ্যতের করণীয় নির্ধারণ করা হবে কী করে, সেই প্রশ্নও তিনি তোলেন। 

/এমএনএইচ/

লাইভ

টপ