গুলশান-বনানীর ‘অভিজাত’ ক্লাব চলছে, মতিঝিল-পল্টনে তালা

Send
আমানুর রহমান রনি, শেখ জাহাঙ্গীর আলম ও রাফসান জানি
প্রকাশিত : ১৮:৪৩, সেপ্টেম্বর ২২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:০৮, সেপ্টেম্বর ২২, ২০১৯

 


রাজধানীর মতিঝিল ও পল্টন এলাকার বেশির ভাগ ক্লাব থেকে জুয়ার সরঞ্জাম সরিয়ে সেগুলোতে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। দুই-একটি খোলা থাকলেও সেখানে কাউকে দেখা যায়নি। ক্লাবের আশেপাশের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখন কেউ আসছে না। যদিও আগে প্রচুর লোক সমাগত হতো। এসব বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি না হলেও ক্লাবের অনেকেই অবশ্য ‘ক্যাসিনোবিরোধী’ চলমান অভিযানকে স্বাগত জানিয়েছেন।


থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে ধানমন্ডি এলাকার ক্লাবগুলোতেও। গুলশান-বনানী এলাকার ক্লাবগুলোর মধ্যে কয়েকটি বন্ধ থাকলেও ‘অভিজাত’ হিসেবে পরিচিতগুলো চলছে আগের মতোই।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান চলছে। সব ক্লাবেই যে ক্যাসিনো, জুয়া বা অনৈতিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়, তেমন নয়। যেগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে সেগুলোতে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
গত শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) থেকে ক্লাবগুলোতে অভিযান শুরু করেছে র‌্যাব। মতিঝিলে শুরু হওয়া এই অভিযান রাজধানী ছাড়িয়ে এরই মধ্যে দেশের অন্য শহরেও বিস্তৃত হয়েছে। এতে দেশের ক্লাবপাড়ায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
রাজধানীর সবচেয়ে বেশি স্পোর্টিং বা খেলাধুলার ক্লাব থাকা মতিঝিল ‘ক্লাবপাড়া’ হিসেবেই পরিচিত। এই এলাকার ক্লাবগুলোর রয়েছে গর্বিত ইতিহাস। তবে এসব ক্লাবের অনেকটিতে আড়ালে জুয়া চলে।
র‌্যাব ও পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মতিঝিলের সোনালী অতীত ক্লাব, মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব, আরামবাগ ক্রীড়া সংঘ, দিলকুশা স্পোর্টিং ক্লাব, ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাব, ভিক্টোরিয়া, আজাদ স্পোর্টিং ক্লাব, ফকিরাপুল ইয়ংমেনস ক্লাব, পল্টনের ঢাকা রেস্টুরেন্ট এবং রিক্রেশন সেন্টারে ক্যাসিনো ও জুয়া হতো। তবে শনিবার (২১ সেপ্টেম্বর) দিনব্যাপী মতিঝিল ও পল্টনের ক্লাবপাড়ায় ঘুরে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। ক্লাবগুলোর বেশির ভাগই বন্ধ। দুয়েকটি খোলা থাকলেও সেখানে আগের মতো ভিড় নেই। সন্ধ্যায় বাতি জ্বালানোরও কেউ নেই।
সোনালী অতীত ক্লাবে নিয়মিত টিভি দেখা হয়
শনিবার সন্ধ্যায় ক্লাবটিতে গিয়ে দেখা যায়, ভেতরের একটি কক্ষে টিভি চলছে। সেখানে বসে কয়েকজন টিভি দেখছেন। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেলো, তারা স্থানীয়। এই ক্লাবে তাদের অনেক স্মৃতি। ক্লাবটির টিনশেড ভবনটির কয়েকটি কক্ষে তালা দেওয়া। এটি মূলত প্রাক্তন ফুটবলারদের ক্লাব।
ক্লাবের সভাপতি হাসানুজ্জামান বাবলু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই অভিযানকে আমরা স্বাগত জানাই। ক্লাবে এটা চলতে পারে না। গুটিকয়েক ক্লাবের জন্য দেশের সব ক্লাবের দুর্নাম হচ্ছে। এটা প্রাক্তন ফুটবলারদের ক্লাব।’ এখানে কোনও জুয়া হয় না, এটা বাংলাদেশের একমাত্র আদর্শ ক্লাব বলে দাবি করেন তিনি।
দিলকুশা স্পোর্টিং ক্লাবে তালা, মোহামেডান নীরব
দিলকুশা স্পোর্টিং ক্লাবের প্রধান ফটকে ঝুলছে তালা। এই ক্লাবে জুয়া চলতো বলে স্থানীয় দোকানিরা অভিযোগ করেন। সন্ধ্যার পর এই ক্লাবের সামনে অনেক গাড়ি পার্কিং থাকতো বলেও অনেকে জানান। তবে শনিবার সন্ধ্যার পর ক্লাবটিতে অন্ধকার দেখা গেছে। আজ রবিবার (২২ সেপ্টেম্বর) ক্লাবটিতে অভিযান চালায় পুলিশ।
এদিকে, অভিযান শুরুর পর মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবও জনশূন্য হয়ে পড়েছে। এই ক্লাবের বাড়তি টিনশেড ঘরে জুয়া হতো বলে স্থানীয় লোকজন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জানিয়েছেন। তবে সেগুলো এখন আর নেই। ক্লাবটিতে রবিবার (২২ সেপ্টেম্বর) অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। 
আরামবাগ ও আজাদ স্পোর্টিং ক্লাবে কেউ নেই
১৯৪৩ সালে আত্মপ্রকাশ হওয়া আজাদ ক্লাব এখন আর খেলাধুলায় অংশ নেয় না। তবে ক্লাবটিতে রাতে তাসের জুয়া হতো বলে অভিযোগ আছে। শনিবার রাতে গিয়ে ক্লাবটিতে অন্ধকার দেখা গেছে। ভেতরেও কাউকে দেখা যায়নি।


মতিঝিলের ক্লাবপাড়ার আরেকটি ঐতিহ্যবাহী ক্লাব আরামবাগ ক্রীড়া সংঘ। শনিবার ক্লাবটিতে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান ফটক খোলা থাকলেও ভেতরে আলো জ্বলেনি। ক্লাবের কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে ভবনের নিচের দোকানগুলো খোলা। এই ক্লাবের দোতলায় জুয়া হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। ক্লাবটির সভাপতি স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর মমিনুল হক সাইদ ও সাধারণ সম্পাদক মো. ইয়াকুব। ক্লাবের সার্বিক অবস্থা জানতে সাধারণ সম্পাদকের নম্বরে কয়েকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। সভাপতির নম্বর বন্ধ পাওয়া গেছে। রবিবার (২২ সেপ্টেম্বর) ক্লাবটিতে অভিযান চালায় পুলিশ।

পুলিশ পাহারায় ওয়ান্ডারার্স, ইয়ংমেনস
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে অভিযান চালানো হয়। বর্তমানে সেখানে পুলিশ পাহারা রয়েছে। ইয়ংমেনসেরও অবস্থা একই। সিলগালার পর রয়েছে পুলিশ পাহারায়। দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যরা জানান, সাধারণ কেউ আর ভেতরে ঢুকতে পারছেন না।
ঢাকা রেস্টুরেন্ট ও রিক্রেশন সেন্টারের দরজায় ঝুলছে লাইসেন্স
পল্টনের প্রীতম-জামান অমিত টাওয়ারের ষষ্ঠ তলায় ঢাকা রেস্টুরেন্ট ও রিক্রেশন সেন্টার তালা দিয়ে মালিকপক্ষ লাপাত্তা। তবে কোলাপসিবল গেটের সঙ্গে বারের ও ট্রেড লাইসেন্স ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। দেলোয়ার হোসেন নামে একজনের নামে এটির লাইসেন্স। রিক্রেশন সেন্টারটি যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি শুরু করেছিলেন। এই ভবনের ১৪ তলায় সম্রাটের সহযোগী স্বপনের ক্যাসিনো ছিল। সেখান থেকে ক্যাসিনোর সরঞ্জাম নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে ভবনটির নিরাপত্তাকর্মীরা জানিয়েছেন। সেখানেও ঝুলছে তালা।
মতিঝিল ও পল্টন এলাকার ক্লাবপাড়াসহ রাজধানীর অন্যান্য এলাকায় ক্যাসিনো চালাতেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া ও তার সহযোগীরা। তবে সম্রাট নিজে সরাসরি ক্যাসিনো দেখাশোনা করতেন না। অভিযোগ রয়েছে, তার ছত্রছায়ায় ক্যাসিনো চালাতেন স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি মোল্লা মো. আবু কাওসার ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর একেএম মমিনুল হক ওরফে সাঈদ। এছাড়া মতিঝিলে আরও কয়েকজন সহযোগী রয়েছে তার। তারা সবাই গা-ঢাকা দিয়েছেন। অপরদিকে আবু কাওসার ও মমিনুল হক দেশের বাইরে। সম্রাট তার অনুসারীদের নিয়ে কাকরাইলে নিজ কার্যালয়েই রয়েছেন।
বন্ধ ফুয়াং ক্লাব
রাজধানীর গুলশান-তেজগাঁও লিংক রোডে অবস্থিত এই ক্লাবে রয়েছে মদের বার, ক্যাসিনো, রেস্টুরেন্ট ও জিমনেশিয়াম। তবে শনিবার (২১ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে দেখা গেছে, আলোচিত এই ক্লাবটি বন্ধ রয়েছে। গেটের বাইরে দু’জন নিরাপত্তাকর্মী রয়েছেন। ক্লাব বন্ধ কেন জানতে চাইলে তারা জানান, সমস্যা আছে, তাই ক্লাব বন্ধ। এখান থেকে চলে যান, আপনিও বাঁচেন, আমাদেরও বাঁচান।
কিছুক্ষণ পর নীল টি-শার্ট পরা এক ব্যক্তি ভেতেরে যেতে চাইলে নিরাপত্তাকর্মী বলেন, ‘কিছু নাই, বন্ধ আছে। পরে আসেন, এখন চলে যান।’ এর পরপরই একটি প্রাইভেটকার থামে ক্লাবটির সামনে। ভেতর থেকে একজন কথা বলেন নিরাপত্তাকর্মীর সঙ্গে। পরে গাড়িটি ক্লাবের পাশের কয়লা রেস্তোরাঁর সামনে দাঁড়ায়।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ফুয়াং ক্লাবের ভেতরে মদের বার, ক্যাসিনো চলে। কয়লা রেস্টুরেন্ট ফুয়াং ক্লাবের অংশ। দুটির মধ্যে ইন-আউট গেটও রয়েছে।
গুলশান ও বনানী ক্লাব চলছে
বনানীর ‘এফ’ ব্লকের ১ নম্বর রোডে অবস্থিত বনানী ক্লাবের ৬ তলা ভবনের পুরোটাই শনিবার (২১ সেপ্টেম্বর) রাতে খোলা থাকতে দেখা গেছে। সামনে দুজন নিরাপত্তাকর্মী নিয়োজিত রয়েছে। কিছুক্ষণ পরপর গাড়ি গেটের সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে এবং নিরাপত্তাকর্মীরা গাড়ির দরজা খুলে তাদের ভেতরে নিয়ে যাচ্ছেন। একজন ভেতরে প্রবেশকারীদের নাম এন্ট্রি করছেন।
বনানী ক্লাবের সিকিউরিটি ইনচার্জ মো. মনিরুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই ক্লাবের সদস্য ছাড়া কেউ প্রবেশ করতে পারে না।’
তিনি বলেন, ‘ক্লাবটিতে সুইমিং পুল, রেস্টুরেন্ট ও জিমনেশিয়াম রয়েছে। তবে কোনও বার বা ক্যাসিনো নেই। এখানে কোনও জুয়া খেলাও হয় না। তাছাড়া অসামাজিক কোনও কার্যকলাপ এখানে হয় না।’
সরেজমিন গুলশান ক্লাবের সামনে অসংখ্য গাড়ি পার্কিং অবস্থায় থাকতে দেখা গেছে শনিবার রাতে। পুরো ক্লাবটি আলোয় ঝলমল করছে। ক্লাবের বাইরে নিরাপত্তাকর্মীরা রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই ক্লাবের সদস্যরা ভেতরে প্রবেশ করছেন।
আবাহনী লিমিটেডে স্বাভাবিক কার্যক্রম
শনিবার সন্ধ্যায় সরেজমিনে দেখা গেছে, ক্লাবের বোর্ডরুমে কয়েকজন বসে আড্ডা দিচ্ছেন। তবে কোনও ধরনের খেলা হচ্ছে না। ক্লাবটির গ্রাউন্ড ম্যানেজার (ফুটবল) বাবুল নন্দী বলেন, ‘আমাদের ক্লাবে অনৈতিক কিছু হয় না। আগে মেম্বাররা কার্ড খেলতেন। এখন তাও বন্ধ রয়েছে। আর মদ বা নেশাজাতীয় সবকিছুর ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।’ ভেতরে মদ খাওয়া তো দূরের কথা, অ্যালকোহল নিয়ে এন্ট্রি নিষিদ্ধ বলেও দাবি করেন তিনি।
বাবুল জানান, ক্লাবের স্বাভাবিক কার্যক্রম অব্যাহত আছে।
অ্যাজাক্স স্পোর্টিং ক্লাবের দরজায় তালা
র‌্যাবর অভিযান শুরুর পর থেকে ক্লাবটি বন্ধ রয়েছে। তবে নিয়মিত সেখানে জুয়াড়িদের আনাগোনা ছিল বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। শুক্রবার বিকাল ৩টা থেকে ক্লাবটিতে অবস্থান নেন র‌্যাবর সদস্যরা। তবে সেদিনও ক্লাব কর্তৃপক্ষ অনুপস্থিত ছিল। রাত ১০টা পর্যন্ত র‌্যাব সদস্যরা ক্লাবটি ঘিরে রাখেন।

বন্ধ রয়েছে ধানমন্ডি ক্লাব
শুক্রবার (২০ সেপ্টেম্বর) রাতে ধানমন্ডি ক্লাবে অভিযান চালিয়ে বারের গোডাউন ২৪ ঘণ্টার জন্য সিলগালা করে দিয়েছিল র‌্যাব। তবে এরপর থেকে পুরো ক্লাবটিই বন্ধ করে রেখেছে কর্তৃপক্ষ। শনিবার (২১ সেপ্টেম্বর) রাতে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ভবনের লেভেল ৬-এর লিফট থেকে নামার মুখের শার্টার নামানো। একইভাবে পেছনের সিঁড়ি দিয়ে গেলেও ক্লাবটি তালাবন্ধ দেখা যায়। ক্লাবটিতে জুয়া খেলার আলামত পেয়েছে র‌্যাব।
অভিযানের পর বন্ধ কলাবাগান ক্রীড়াচক্র
শুক্রবার ক্লাবটিতে অভিযান চালিয়ে সভাপতি সফিকুল ইসলাম ফিরোজসহ পাঁচজনকে আটক করে র‌্যাব। এসময় অবৈধ বিদেশি পিস্তল, ইয়াবা, পাঁচ শতাধিক প্লেয়িং কার্ড ও জুয়ার কয়েন জব্দ করা হয়। অভিযানের পর থেকে ক্লাবটি বন্ধ রাখা হয়েছে। শনিবার সন্ধ্যায় পুরো ক্লাব এলাকায় কোনও আলো ছিল না। ভেতরে একটি কক্ষে তিনজন গার্ড বসে খেলা দেখছিলেন। তারা জানান, অভিযানের পর ক্লাবে আর কেউ আসেনি। আর এমনিতেও ক্লাব বন্ধ রয়েছে।
শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবে কথা বলার জন্য কাউকে পাওয়া যায়নি। তবে ক্লাবের কার্যক্রম স্বাভাবিক থাকতে দেখা গেছে।





/এনএল/এইচআই/এমএমজে/

লাইভ

টপ