মশানিধনে ঢাকার দুই সিটিতে বরাদ্দ বাড়লেও জনবল বাড়েনি

Send
শাহেদ শফিক
প্রকাশিত : ১০:৩৯, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৪৯, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৯

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনরাজধানী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে মশানিধন খাতে বরাদ্দ দ্বিগুণ বাড়িয়ে প্রায় একশ কোটি টাকা করা হয়েছে। কিন্তু সে তুলনায় জনবল বাড়ানো হয়নি। দুই সিটি বলছে, মশানিধন খাতে যে পরিমাণ জনবল রয়েছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। আর নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বরাদ্দের তুলনায় জনবল না থাকায় এই বাজেট বাস্তবায়নে দুই সিটিকে হিমশিম খেতে হবে। এ জন্য দ্রুত এই খাতে জনবল বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন নগর বিশেষজ্ঞরা।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশেন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশেন (ডিএসসিসি)-সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দুই সিটির আয়তন বেড়ে ২৭০ কিলোমিটার হয়েছে। ৯৩টি ওয়ার্ড থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২৯টিতে। এই পুরো এলাকার জন্য করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ মোট জনবল ৭৩৪ জন। এরমধ্যে সরাসরি মশানিধনে কাজ করছেন ৭০৯ জন।

পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা পৌর সংস্থার তুলনায় ডিএনসিসির জনবল ১২ ভাগ কম বলে জানিয়েছেন মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম। এ অবস্থায় এত কম কর্মী দিয়ে নগরীর মশানিধনে সফল হওয়ার বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে সিটি করপোরেশন। ফলে এই খাতে বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

দুই সিটি সূত্রে জানা গেছে, মশানিধন খাতে চলতি অর্থবছরে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ৪৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা এবং উত্তর সিটিতে ৪৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সব মিলিয়ে এই খাতে দুই সিটিতে বরাদ্দ প্রায় একশ’ কোটি টাকা।  

জানতে চাইলে ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, মশানিধন কাজে তার সংস্থায় জনবল ২৯৫ জন।  এরমধ্যে একজন প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, ৪ জন আঞ্চলিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, একজন সমন্বয়কারী (স্বাস্থ্য) ও ৯ জন স্বাস্থ্য পরিদর্শক রয়েছে। এছাড়া, মাঠকর্মী (মশানিধন-কর্মী) রয়েছেন ২৮০ জন। সব মিলিয়ে সংস্থাটিতে জনবল মাত্র ২৯৫ জন। এই হিসাবে প্রতিটি ওয়ার্ডে গড়ে মাত্রা ৪-৫ জন কর্মী রয়েছেন। তবে, সম্প্রতি ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে একমাসের জন্য কিছু জনবল দেয়। যাদের অধিকাংশের বিরুদ্ধেই মশানিধন কাজে অভিজ্ঞতা না থাকার অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে, ডিএসসিসিতে মশানিধন কাজের জন্য একজন প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, ৪ জন আঞ্চলিক বা সহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও ৫ জন স্বাস্থ্য পরিদর্শক রয়েছেন। এছাড়া, মাঠকর্মী (মশানিধন-কর্মী) রয়েছেন ৪২৯ জন। সব মিলিয়ে সংস্থাটিতে মশানিধন কাজের জনবল ৪৩৯ জন।

জানা গেছে, ২০১১ সালের শেষের দিকে দুই সিটি করপোরেশন বিভক্ত হওয়ার পর ২০১২ সালের জানুয়ারিতে দুই সংস্থার পক্ষ থেকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে আলাদা দুটি জনবল কাঠামোর প্রস্তাব পাঠানো হয়। কিন্তু সেটি আজও ঝুলে আছে বলে জানিয়েছে দুই সিটি করপোরেশন।

নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক কোটি ১০ লাখ নাগরিকের শহর কলকাতায় মশানিধন খাতে জনবল ৪ হাজার ৩১৯ জন। কিন্তু প্রায় তিন কোটি ঢাকাবাসীর শহরে রয়েছে জন মাত্র ৭৩৪জন। এটা খুবই হতাশাজনক। ২৭০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের দুই সিটির ১২৯ ওয়ার্ডের প্রতিটিতে কমপক্ষে ২০ জন করে মশানিধন-কর্মী নিয়োগ দিতে হবে। তবেই এই বরাদ্দ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন ও মশানিধন কাজে সফলতা আসার সম্ভাবনা রয়েছে। না হলে খণ্ডকালীন জনবল নিয়ে মশানিধন কিংবা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। তাদের মতে, শুধু বাজেট বাড়িয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। এ জন্য সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘২ কোটির বেশি নাগরিকের রাজধানী ঢাকায় এই সামান্য পরিমাণ মশানিধন-কর্মী কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়। এজন্য অবশ্যই জনবল বাড়াতে হবে। প্রতিদিন প্রতিটি এলাকা মনিটরিং করতে হবে। কর্মী না বাড়িয়ে বাজেট বাড়ালে যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না।’

ড. আদিল মুহাম্মদ খান আরও বলেন, ‘মশানিধন কাজে একটি বিজ্ঞানভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে একজন কর্মীর এরিয়া নির্ধারণ করতে হবে। একইসঙ্গে সে তুলনায় জনবলও নিয়োগ দিতে হবে। কর্মী না বাড়িয়ে বরাদ্দ বাড়ালে তা বাস্তবায়নে সিটি করপোরেশনকে হিমশিম খেতে হবে।’

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের পার্শ্ববর্তী  দেশের কলকাতা শহরে মশানিধন কাজের জন্য রয়েছেন ৪ হাজার ৩১৯ জন কর্মী। কিন্তু আমাদের যে কর্মী রয়েছে তা খুবই নগণ্য। আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। জনবল কাঠামো আরও বাড়ানো দরকার। তবে, আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে কিছু জনবল বাড়িয়েছি।’

প্রায় একই বক্তব্য ডিএসসিসি মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকনেরও। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এত কম জনবল দিয়ে হিমশিম খেতে হবে। যে জনবল রয়েছে, তা  খুবই কম।’ এরপরও কিছু আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি জানান।

জনতে চাইলে ডিএসসিসির সচিব মোস্তফা কামাল মজুমদার বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের যেসব চাহিদা ছিল, আমরা সব শর্ত পূরণ করে পাঠিয়ে দিয়েছি। তবু কেন লোকবল নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না, তা জানি না।’

বিষয়টি সম্পর্কে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘আমরা দুই সিটি করপোরেশন থেকে অর্গানোগ্রামের বিষয়ে যে প্রস্তাবনা পেয়েছি, সেটি চূড়ান্ত করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দিয়েছি। যতদূর জানি জনপ্রশাসনও সেটি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রেখেছে।’

এই বিষয়ে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন ও সচিব ফয়েজ আহম্মদ বলেন, ‘এমন অনেক বিষয় আছে। সিটি করপোরেশনের বিষয়টি কোন পর্যায়ে রয়েছে, তা এই মুহূর্তে বলতে পারছি না। খবর নিয়ে বলতে হবে।’ বিষয়টি নিয়ে কথা বলার জন্য তারা এই প্রতিবেদনকে তাদের দফতের যেতে বলেন। কিন্তু দফতরে গিয়েও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

আরও পড়ুন:

ডেঙ্গু মোকাবিলায় ঢাকা-কলকাতার গল্প



 

/এমএনএইচ/

লাইভ

টপ