এ বছর বাংলাদেশসহ ১২৮টি দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত কয়েকবছরে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পুরো বিশ্বজুড়েই মশাবাহিত রোগের সংখ্যা বাড়ছে। তারা বলছেন, ডেঙ্গু রোগ যেখানে একবার ঢোকে সেখান থেকে বের হয় না। তাই আগামী বছরের কথা মাথায় রেখে এখন থেকেই তারা ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব কমাতে কাজ করছেন। ইতোমধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আলোচনা করছে। এছাড়া জাতীয় গাইড লাইন নিয়েও কাজ করছে তারা।
একইসঙ্গে বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিশ্বে গত ১০ বছরে ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে, বিশ্বের জনসংখ্যার অর্ধেকের মতো মানুষই এখন ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে রয়েছে যার কোনও সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা না থাকলেও সঠিক ব্যবস্থাপনা, সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিলে মৃত্যু ঝুঁকি এক শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা সম্ভব।
একইসঙ্গে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যতো যাই করা হোক না কেন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা করা ‘স্বাস্থ্যের’ কাজ হলেও মশা নিধন না হলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। আর মশা মারার কাজ স্বাস্থ্য অধিদফতরের নয়। এ জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানকে কাজ করতে হবে, মশা নিধন না হলে ডেঙ্গু নির্মূল হবে না।
সরকারের স্বাস্থ্য অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ( ১ অক্টোবর) দেশে ডেঙ্গুতে মোট আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ৮৮ হাজার ৩২৪ জন। যদিও এ হিসাবের মধ্যে দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোর বহির্বিভাগ, দেশজুড়ে ব্যাঙের ছাতার মতো গঁজিয়ে ওঠা বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক-ডায়াগনোস্টিক সেন্টারগুলোতে চিকিৎসা নেওয়া ডেঙ্গু রোগীর তথ্য নেই। এমনকি খোদ রাজধানীর ঢাকার শহরের সব হাসপাতালের ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যারও পুরো তথ্য নেই সরকারের হাতে।
ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব থেকে দেশকে মুক্ত রাখতে কী পদক্ষেপ স্বাস্থ্য অধিদফতর নিচ্ছে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এধরনের কমিউনিকেবল ডিজিজ দেশ এর আগেও এসেছে। তাই বলে তো ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর এসব অসুখের জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল করা হয়নি।
তারচেয়ে বরং কীভাবে এই এডিস মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ করা যায় সে বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। আর তারই অংশ হিসেবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে একটি টিম এসেছে, তাদের সঙ্গে আমাদের ভেক্টর ম্যানেজমেন্ট নিয়ে ওর্য়াকশপ করা হয়েছে এবং পুরো অক্টোবর মাসজুড়েই এ নিয়ে কাজ করা হবে।
অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে ‘ইন্টিগ্রেটেড ভেক্টর ম্যানেজমেন্ট’ বা ‘সমন্বিত বাহক ব্যবস্থাপনা’ যেখানে ম্যালেরিয়া, কালাজ্বরতো থাকছেই, সঙ্গে ডেঙ্গু, জিকাসহ মশাবাহিত রোগগুলো নিয়েও কাজ করা হবে।
তিনি বলেন, কিউলেক্স এবং এডিস মশাবাহিত যেসব নতুন রোগের প্রাদুর্ভাব যেমন ডেঙ্গু, জিকার জন্য কী ধরনের প্রস্তুতি আমাদের থাকা দরকার তার জন্য গাইডলাইন বা স্ট্র্যাটেজি তৈরি করার জন্য আমরা একত্রিত হয়েছিলাম। আরও অন্তত এক সপ্তাহ কাজ করে রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সঙ্গে বসে আলোচনা করবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এরপর সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিয়ে মন্ত্রণালয়সহ সব জায়গাতে পাঠানো হবে।
এরপরে আবার এ বছরের তৈরি গাইডলাইন নতুন করে সংশোধন বা যোজন-বিয়োজন করা হবে। এবারে এমন কিছু লক্ষণ ছিল কীনা-যেগুলো এবারের গাইডলাইনে আসেনি তা বিশ্লেষণ করা হবে। এবারে এই প্রাদুর্ভাবের সময় যে চিকিৎসকরা সেবা দিয়েছেন তাদের সঙ্গে বসে এসব বিষয়ে আলোচনা করা হবে, গাইডগাইন দরকার হলে সেখানেও সম্প্রসারণ করা হবে।
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ডেঙ্গুর জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল দরকার নেই আবার একটি হাসপাতাল দিয়ে আক্রান্ত সবার চিকিৎসা করাও যাবে না। কারণ ডেঙ্গু এখন আর কেবল ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ নাই, গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে গেছে। একটি হাসপাতাল দিয়ে সবার চিকিৎসা সম্ভব হবে না।
তিনি বলেন, আর এমন কিছু করতে হলে এরকম যত রোগ আছে সব কিছুর জন্য পৃথক পৃথক হাসপাতাল করতে হবে, সেটা সম্ভব না আর এটা অনেক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা।
তাই মশা মারার জন্য যা যা করতে হবে সে বিষয়ে মনোযোগ দিতে হবে, ডেঙ্গুর জন্য প্রিভেনশন (প্রতিরোধ) প্রধান, মশা নিধনের সারাবছর কার্যক্রম চালাতে হবে, মশা থাকলে ডেঙ্গু থাকবে, মশা না থাকলে ডেঙ্গু থাকবে না-এটাই মূল কথা। এটা মাথায় রেখে কাজ করতে হবে সংশ্লিষ্টদের।
অধ্যাপক ডা. এ বিএম আব্দুল্লাহ বলেন, কাউকে দোষারোপ না করে কাজ করতে হবে। এখন তারা কাজ করছে, পরে করবে না-এটা হলে মশা নিধন হবে না, মশা নিধনের কাজ সারাবছর চালিয়ে যেতে হবে। সারাদেশে ডেঙ্গু প্রতিরোধে কাজ করতে হবে।
এদিকে, ডেঙ্গু যেহেতু সারাদেশে ছড়িয়েছে তাই এডিস মশা নির্মূলে কেবল ঢাকা নয়, পুরো দেশজুড়ে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন কীটতত্ত্ববিদ ড.কবিরুল বাশার। তিনি বলেন, সবাইকে একসঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে, নয়তো মশা নির্মূল করা যাবে না। মশা নির্মূল না হলে এসব রোগও দেশ থেকে যাবে না।







