মেধাবীদের ‘খুনি’ বানিয়েছে কারা?

Send
সিরাজুল ইসলাম রুবেল
প্রকাশিত : ২১:৩১, অক্টোবর ১৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০৮:০০, অক্টোবর ১৫, ২০১৯

বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষার সময় অপেক্ষারত একজন অভিভাবক

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যাল (বুয়েট)-এ ভর্তি পরীক্ষা দিতে আসা শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা ক্যাম্পাসে এসে আবরারকে নির্যাতনের বিভিন্ন চিত্র দেখে উদ্বিগ্ন। তারা বলছেন, মেধাবীদের খুনি বানিয়েছে অপরাজনীতি। তাদের অভিমত, এভাবে শিক্ষাঙ্গনে পড়তে আসা মেধাবীদের খুনি বানানো এবং মায়ের বুক খালি করা রাজনীতির দরকার নেই।

আজ সোমবার (১৪ অক্টোবর) বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষা দিতে আসা বেশ কয়েকজন পরীক্ষার্থীর অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে হলগুলোতে শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা নির্যাতন করতো বলে শুনেছেন তারা। কিন্তু এর বিরুদ্ধে প্রশাসন কোনও ব্যবস্থা না নেওয়ায় আবরার খুন হয়েছেন বলে দাবি তাদেরও। অভিভাবকরা বলেন, আজকে যারা আবরার হত্যার আসামি, তারা কোনোকালেই খুনি ছিল না। তাদের খুনি বানিয়েছে এই ‘সিস্টেম’।

বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষার সময় অপেক্ষারত কয়েকজন অভিভাবক

আবরার হত্যার প্রতিবাদে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন দেয়ালে নির্যাতনের গ্রাফিতি আঁকাসহ গেটের সঙ্গে পোস্টার লাগিয়েছে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। এসব নির্যাতনের চিত্র দেখে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অভিভাবকরা। তারা জানান, ক্যাম্পাস হবে একজন শিক্ষার্থীর জন্য নিরাপদ স্থান। কিন্তু সেখানে যদি নির্মমভাবে আবরারের মতো মেধাবী শিক্ষার্থীদের পিটিয়ে হত্যা করা হয়, তাহলে অভিভাবকদের স্বস্তি থাকে কোথায়?

ক্যাম্পাসে আবরারকে যেখানে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে সেই শেরেবাংলা হল দেখে মন খারাপ হয়ে গেছে বলে জানান এক ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীর মা সুলতানা তাহমিনা। আজিমপুর থেকে মেয়েকে নিয়ে বুয়েটে আসার সময় আবরারের হলটা দেখেন তিনি। বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এখানে কীসের রাজনীতি চলে, যা মায়ের বুক খালি করে?’ এমন ছাত্র রাজনীতি চান না জানিয়ে তার অসহায়ত্বের জায়গা থেকে প্রশ্ন, ‘এই অবস্থা আমার মেয়ের সঙ্গে হলে আমি কী করতাম বলেন?’

সন্তান দিচ্ছে বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষা, বাইরে অপেক্ষারত স্বজনরা। আবরার হত্যার ঘটনায় তাদের বেশিরভাগই ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি জানান।

কুষ্টিয়া থেকে ভর্তি পরীক্ষার্থী ছেলেকে নিয়ে এসেছেন নিহত আবরারের মায়ের একসময়ের স্কুলবন্ধু মো. রাশেদুল হক। এই ঘটনার পর এই অভিভাবক চাননি তার ছেলেও এখানে পরীক্ষা দিতে আসুক। কিন্তু ছেলের অনুরোধ, বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষা দেবেই। তাই ছেলের অনুরোধে এ ক্যাম্পাসে এলেও আবরারের কথা মনে করে প্রচণ্ড শঙ্কা আর উদ্বেগ বোধ করছিলেন তিনি। বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপচারিতা হলে তিনি জানান, আবরারের মা জগন্নাথ কলেজ থেকে পড়ালেখা শেষ করেন। সংসার জীবনে গিয়ে তার ছেলেদের লেখাপড়ার করানোর জন্য সুযোগ থাকা সত্ত্বেও নিজে চাকরি পর্যন্ত করেননি। আজ তার কী হাল হলো? এই অভিভাবকের মন্তব্য, ‘আমি কোনোভাবেই বুয়েটে খুনের রাজনীতি চাই না। শুধু এখানে না, কোনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অপরাজনীতি থাকুক এটা চাই না।’

এদিকে, অভিভাবকদের বসার জন্য এবং গরমে ঠান্ডা পানির ব্যবস্থা করেছে শিক্ষার্থীরা। এর প্রশংসা করে অভিভাবক হারুন অর রশিদ বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা বিভিন্নভাবে আমাদের সহযোগিতা করেছে। তাদের সঙ্গে আসলে খুনিদের মেলাতে পারছি না।’

বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষার সময় বাইরে অপেক্ষারত তিন অভিভাবক

আরেক অভিভাবককে দেখা যায় আবরারের গ্রাফিতির সামনে বসে থাকতে। তিনি নির্যাতনের চিত্রগুলো দেখে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। সরকারি চাকরিজীবী তাই নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ছেলে-সন্তানকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পড়াশোনা করাতে বাবা-মায়ের যে কত ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, তা বাবা হিসেবে আমি বুঝি। আবরার বুয়েটের ছাত্র ছিল—যেখানে ভর্তির সুযোগ সবাই পায় না। যারা তাকে হত্যা করেছে, তারাও মেধাবী। একইরকম পরিশ্রম করে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে তারাও ভর্তির সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু, এখানের রাজনৈতিক পরিবেশ তাদের মেধা-মূল্যবোধকে নষ্ট করেছে। তাদের প্রথমে সন্ত্রাসী, পরে খুনিও বানিয়েছে। শুধু আবরার নয়, যারা আসামি তাদের বাবা-মায়েরও স্বপ্ন ভেঙে গেছে। হয়তো আসামিদের বিচার হবে। কিন্তু, যে সিস্টেম মেধাবীদের খুনি বানিয়েছে, সেটি পরিবর্তন করতে না পারলে কোনও লাভ নেই। কিছুদিন পর শুনবেন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে আরেক আবরার মারা গেছে।’

পরিবেশ অন্যরকম থাকায় এবার বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে অভিভাবকদের উপস্থিতি ছিল অন্য সময়ের তুলনায় অনেক বেশি

দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতির জন্য এ ধরনের ঘটনা শিক্ষাঙ্গনকেও কলুষিত করছে বলে মনে করছেন ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীর অভিভাবক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী হারুন অর রশিদ। তিনি বলেন, ‘একসময় এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে পারিবারিক সমস্যা নিয়ে অভিভাবকরা পর্যন্ত আসতেন। এসব ক্যাম্পাস দিয়ে হাঁটলে আগে নিরাপদ বোধ করতাম। কিন্তু এখন আর সেই আস্থা নেই। কারণ, এখানে যারা নিরাপদে থাকার কথা তারাই নিরাপদ নয়। আর বুয়েটে যে এতদিন ধরে শিক্ষার্থীদের ওপর নানা ধরনের নির্যাতন চলে এসেছে তা আমাদের জানা ছিল না। শুনেছি, দীর্ঘদিন এসব নির্যাতন চলতো। কিন্তু নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসন কোনও ব্যবস্থা না নেওয়ায় আজকে তা নির্যাতন থেকে হত্যায় রূপ নিয়েছে।’

ছবি: নাসিরুল ইসলাম

 

/এসআইআর/টিএন/এমওএফ/

লাইভ

টপ