জুনিয়র ‘বন্ধু’কে হত্যার পর পিক আপে লাশ নিয়ে পদ্মায় ফেলে সিনিয়র

Send
নুরুজ্জামান লাবু
প্রকাশিত : ২৩:৫২, অক্টোবর ১৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:০৫, অক্টোবর ১৫, ২০১৯

রাজু। পাপ্পু নামে এক কিশোরকে হত্যার অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

কিশোর পাপ্পুর সঙ্গে রাজুর বয়সের ব্যবধান প্রায় ১২ বছরের। তবে বয়সের তফাৎ থাকলেও তারা ছিল সিনিয়র-জুনিয়র বন্ধু। একসঙ্গে চলাফেরা করতো। আড্ডা দিত। কিন্তু হঠাৎ ঘটে মতবিরোধ। নির্দেশ মতো কথা না শোনায় জুনিয়র পাপ্পু (১৫)কে গলা টিপে হত্যা করে সিনিয়র রাজু (২৭)। এরপর সেই মরদেহ গুম করতে একের পর এক চাতুরির আশ্রয় নেয় রাজু। পাপ্পুর লাশ গুম করার জন্য ভাঙারির দোকান থেকে কিনে আনে পুরনো বই-খাতা। বস্তায় লাশ ভরে বই-খাতা দিয়ে ঢেকে রাখে। এরপর পিক আপ ভাড়া করে ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে বস্তায় ভরা পাপ্পুর লাশ নিয়ে যায় মুন্সীগঞ্জের লৌহজং ট্রলার ঘাটে। সেখানে নৌকা ভাড়া করে নদীতে নিয়ে লাশ ফেলে দেয়। মর্মান্তিক এই ঘটনা ঘটেছে গত ৩ অক্টোবর যাত্রাবাড়ী এলাকায়। তবে পুলিশের খাতায় প্রথমে এটি ছিল সূত্রহীন ( ক্লু লেস) মামলা।

নিহত ওই কিশোরের পুরো নাম কুতুব উদ্দিন পাপ্পু। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সিরিয়াস ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগ হত্যাকারী সিনিয়র বন্ধু রাজুকে  গ্রেফতার করেছে। সোমবার ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে খুনের বর্ণনা দিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে সে। নদীতে লাশ ফেলার কারণে পাপ্পুর লাশ এখনও উদ্ধার করা যায়নি।

মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা সিরিয়াস ক্রাইম ইনভেস্টিগেশনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মাহমুদা আফরোজ লাকী বলেন, ‘পাপ্পু নিখোঁজ হওয়ার পর তার পরিবার প্রথমে একটি জিডি করেছিল। আমরা জিডির তদন্ত করছিলাম। তদন্ত করতে গিয়ে তাকে অপহরণ করা হয়েছে বলে জানা যায়। পরে আমরা এক সন্দেভাজন আসামিকে গ্রেফতার করার পর সে হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করে। যেখানে পাপ্পুকে হত্যা করা হয়েছে সেখান থেকে তার জুতা উদ্ধার করা হয়েছে।’

মামলার তদন্ত সূত্র জানায়, ৩০১ নম্বর দক্ষিণ যাত্রাবাড়ী এলাকার বাসায় মায়ের সঙ্গে থাকতো পাপ্পু। গত ৩ অক্টোবর বিকেলে পাপ্পু বাসা থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর থেকে নিখোঁজ ছিল। এর একদিন পর প্রতিবেশী পাভেলের মোবাইলে পাপ্পুর চোখ বাঁধা অবস্থায় একটি ছবি পাঠিয়ে তাকে অপহরণ করা হয়েছে বলে জানানো হয়। অপহরণকারীরা তার পরিবারের কাছে দুই কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। এ ঘটনায় দায়ের হওয়া সাধারণ ডায়েরিটি আমলে নিয়ে ডিবির সিরিয়াস ক্রাইম ইউনিট তদন্ত শুরু করে। পরবর্তীতে ৮ অক্টোবর পাপ্পুর মা যাত্রাবাড়ী থানায় একটি অপহরণ মামলা (নং-৩১) দায়ের করেন। ডিবি পুলিশ অনুসন্ধান করে গত রবিবার যাত্রাবাড়ীর ধলপুর থেকে রাজুকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রাজু হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের লোমহর্ষক বর্ণনা দেয়।

রাজুর স্বীকারোক্তির বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, ঘটনার দিন সে কৌশলে পাপ্পুকে পূর্ব ধোলাইপাড় ৮৫ নং কবিরাজবাগ রোডের মোবারক চৌধুরী রানার ভাড়া করা একটি গোডাউনে নিয়ে যায়। সেখানে পরিকল্পনা অনুযায়ী আগে থেকে কিনে রাখা মদ খায় একসঙ্গে। এর এক পর্যায়ে সে ঝগড়ার সৃষ্টি করে পাপ্পুকে গলাটিপে হত্যা করে। পরবর্তীতে লাশটি গুম করার জন্য রাতেই পাশের একটি ভাঙারি দোকান থেকে ৫০ কেজি পুরাতন বই কিনে। পরে যাত্রাবাড়ীর ফল মার্কেট থেকে দুটি সাদা প্লাস্টিকের বস্তা কিনে আনে। ভাঙারির দোকান থেকে পুরাতন বই ও বস্তা নিয়ে সেই গোডাউনে যায়। সেখানে প্রথমে সে পাপ্পুর লাশ হাত-পা বেঁধে পলিথিন দিয়ে পেঁচিয়ে বস্তায় ভরে। এসময় অপহরণের গল্প ফাঁদার বিষয়টি মাথায় আসে তার। সেভাবে বেঁধে পাপ্পুর ছবিও তোলে। পরে বস্তার ভেতরে লাশের চারপাশে বই ঢুকিয়ে বস্তার মুখ বেঁধে রাখে। আরেক বস্তায় শুধু বই ঢুকিয়ে গোডাউনে রাখে।

স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে রাজু বলেছে, পরদিন এক সহযোগীর মাধ্যমে ভাঙারির মাল নেওয়ার জন্য একটি পিক আপ ভাড়া করে। সকাল সোয়া ১১টার দিকে পিক আপে লাশের বস্তা ও বইয়ের বস্তা তুলে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং ট্রলারঘাটে যায়। সেখানে গিয়ে পিক আপ থেকে লাশের বস্তাসহ দুটি বস্তা নামায়। এসময় তার সঙ্গে এক সহযোগীও ছিল। পরবর্তীতে একটি ট্রলার ভাড়া করে বস্তাগুলো ট্রলারে তুলে পদ্মা রিসোর্ট এলাকার পদ্মার শাখা নদীর তীরে বস্তা দুটি নামিয়ে পিক আপের চালককে ঘাটে পাঠিয়ে দেয়। সেখানেই সে বস্তাগুলো পানিতে ফেলে দেয়। এসময় ট্রলার চালক তাকে বস্তা ফেলে দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে সে এগুলো পল্লী বিদ্যুতের পুরাতন মিটার জানিয়ে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে তাই ফেলে দিচ্ছে বলে জানায়। পরে ওই ট্রলারেই সে ঘাটে ফিরে এসে পিক আপটি নিয়ে ঢাকায় ফিরে আসে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ঢাকায় ফিরে এসে রাজু ভিকটিমের পরিবারের কাছ থেকে অপহরণের কথা বলে মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টা করে। এজন্য লাশ গুমের পরদিন গুলিস্তান থেকে একটি নোকিয়া মোবাইল ও অন্যের নামে রেজিস্ট্রেশন করা একটি সিম ক্রয় করে। ওই মোবাইল থেকে সে একবার মুক্তিপণ চেয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে পুলিশ তাকে ট্র্যাক করতে পারে এই ভয়ে সিমটি আরেকটি মোবাইলে চালু করে পাপ্পুর প্রতিবেশী পাভেলের কাছে ইমো অ্যাপসের মাধ্যমে ছবি পাঠিয়ে দুই কোটি টাকা দাবি করে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, পাপ্পুরা যাত্রাবাড়ী এলাকার স্থানীয়। রাজু তার চেয়ে অনেক সিনিয়র হলেও তাদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। রাজুর চাইতে পাপ্পুদের অর্থ সম্পদ বেশি বলে সে জানতে পারে। অর্থের লোভে ও পাপ্পু তার কথা মান্য না করায় তাকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল।

মামলার আরেক তদন্ত তদারক কর্মকর্তা সিরিয়াস ক্রাইম ইনভেস্টিগেশনের সহকারী কমিশনার (এসি) আশরাফ উল্লাহ বলেন, ‘এটি একটি ক্লু-লেস মামলা ছিল। আমার তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় আসামিকে শনাক্ত করি। আসামি হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছে। আমরা এখন ভিকটিমের লাশটি উদ্ধারের চেষ্টা করছি।’   

 

/টিএন/

লাইভ

টপ