মানবাধিকার ইস্যুতে বিভিন্ন রাষ্ট্রের দেওয়া সুপারিশের অগ্রগতি আশানুরূপ নয়

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ০০:০৮, অক্টোবর ১৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:১৫, অক্টোবর ১৬, ২০১৯

মানবাধিকার বিষয়ক সেমিনারে আলোচকরা

বাংলাদেশকে গত চার বছরে মানবাধিকার সংক্রান্ত বিভিন্ন ইস্যুতে ২৫১টি সুপারিশ পাঠিয়েছে বিশ্বের ১০৫টি দেশ। এরমধ্যে ১৭৮টি সুপারিশ গ্রহণ করেছে সরকার। তবে যেগুলো গ্রহণ করেছে সেগুলোর বাস্তাবয়নও আশানুরূপ নয়।

মঙ্গলবার (১৫ অক্টোবর) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘ইউপিআর ২০১৮ এর এক বছর : আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে?’ শীর্ষক দিনব্যাপী এক সেমিনারে এ তথ্য তুলে ধরেছে হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ (এইচআরএফবি)।

সেমিনারে বক্তারা জানান, বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ থাকায় গত চার বছরে বিভিন্ন ইস্যুতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সরকারকে ২৫১টি সুপারিশ পাঠায়। এই সুপারিশগুলোর বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার তাদের চূড়ান্ত মতামত দেয় ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে। সেখানে দেখা যায়, সরকার ১৭৮টি সুপারিশ গ্রহণ করলেও ৭৩টি গ্রহণ করেনি বা মন্তব্য দিয়ে (নোটেড) রেখেছে।

সেমিনারে এইচআরএফবি আহ্বায়ক ও আসক এর নির্বাহী পরিচালক শীপা হাফিজা বলেন, ইউপিআর ২০১৮ পরবর্তী এক বছরে সরকারের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করে। আমরা লক্ষ্য করছি যে এক্ষেত্রে অগ্রগতি আশানুরূপ নয়। এ অঙ্গীকারগুলো পূরণে সরকার কিভাবে কাজ করে যাচ্ছে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কিভাবে সমন্বয় হচ্ছে—তা স্পষ্ট নয়। এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে নাগরিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে এ নিয়ে কোনও আলোচনার উদ্যোগ আমরা দেখছি না।

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী জেড আই খান পান্না বলেন, নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার চর্চার ক্ষেত্র সংকুচিত হওয়ার কারণে বর্তমানে অসুস্থ রাজনীতি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে যা আমাদের জন্য অশনি সংকেত।

বেসরকারি আইনি সহায়তা দানকারী সংস্থা ব্লাস্টের অনাররি নির্বাহী পরিচালক সারা হোসেন বলেন, বহুল সমালোচিত তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০১৩ এর ৫৭ ধারা বিলুপ্ত হলেও এ আইনের আওতায় দায়ের করা মামলাগুলো চলমান রয়েছে। সেগুলো প্রত্যাহার করার কোনও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। বরং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন গ্রহণ করা হয়েছে, যেখানে মত প্রকাশের স্বাধীনতা পরিপন্থী ৫৭ ধারার অনুরূপ কয়েকটি ধারা সন্নিবেশিত করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হলেও গুম বলে কিছু নাই বলে সরকার বার বার বলে আসছে, তারা কোন চিন্তা থেকে বিষয়টি অস্বীকার করে যাচ্ছে তা স্পষ্ট নয়। কেননা, বাস্তবে এ ধরনের অনেক ঘটনার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যে কোনও গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারভিত্তিক সভ্য সমাজের জন্য জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতা অপরিহার্য। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব প্রকৃতপক্ষে প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব ম্যান্ডেট পূরণকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

সরকারি চাকরি আইন-২০১৮ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) স্বাধীনভাবে কার্যক্রম পরিচালনার অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে সংশয় প্রকাশ করেন তিনি। এ আইনে সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মামলা করার আগে সরকারের অনুমতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকায় দুদক তার কার্যকারিতা হারাবে বলেও সংশয় তার।

আলোচনা শেষে ফোরামের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে ইউপিআরের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার জন্য সাতটি দাবি জানিয়েছে মানবাধিকার ফোরাম।

এগুলো হচ্ছে:

 সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে সঙ্গে নিয়ে গ্রহণ করা সুপারিশগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা যেখানে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা, প্রয়োজনীয় কর্মসূচি ও কোন মন্ত্রণালয় কোন পর্যবেক্ষণ বাস্তবায়ন করবে তা সবিস্তারে উল্লেখ থাকবে;

 কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে আলোচনা করা;

 কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণের জন্য একটি কার্যকর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করার জন্য একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় কমিটি গঠন করা;

 বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় সংসদ সদস্যদের সম্পৃক্ত করা এবং সংসদে আলোচনা করা;

 বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যে প্রতিবন্ধকতাগুলো কাজ করছে তা চিহ্নিত করা এবং উত্তরণের উপায় নির্ধারণের জন্য নাগরিক সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা করা;

 জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে ২০২০ সালে বাস্তবায়নের অগ্রগতি সংক্রান্ত মধ্যবর্তী প্রতিবেদন উপস্থাপন করা;

 ইউপিআর বিষয়ে নাগরিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো।

সেমিনারে বিভিন্ন মানবাধিকারকর্মী, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন, জাতীয় প্রতিষ্ঠান এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

স্বাগত বক্তব্য রাখেন এইচআরএফবি-এর আহ্বায়ক এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এর নির্বাহী পরিচালক শীপা হাফিজা।

বিশেষ বক্তব্য রাখেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (জাতিসংঘ) নাহিদা সোবহান। এরপর নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত প্রথম অধিবেশনে আসক নির্বাহী পরিষদের সেক্রেটারি জেনারেল তাহমিনা রহমানের সঞ্চালনায় প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন তামান্না হক রীতি।

 

/আরজে/টিএন/

লাইভ

টপ