১৫ বছর পূর্তি উদযাপন ইউল্যাব যেন ১২ হাজার বছর টিকে থাকে: কাজী শাহেদ আহমেদ

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ১৮:২২, অক্টোবর ১৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৪৩, অক্টোবর ১৬, ২০১৯

ইউল্যাবের ১৫ বছরে পদার্পণ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানকে স্মারক উপহার দিয়ে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন প্রতিষ্ঠানটির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য জুদিথা ওলমাখার

হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগুতে এগুতে ১৫ বছর পাড়ি দিয়ে ফেললো দেশের অন্যতম সেরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ‘ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব)’। একজন বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরও সাহিত্য পড়তে ভালো লাগতে পারে কিংবা ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়া শিক্ষার্থীরও বিবিএ-তে ডিগ্রি নেওয়ার ইচ্ছা থাকা বিচিত্র নয়। কিন্তু, প্রচলিত উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় এমন কিছু আগে চিন্তা করাও কঠিন ছিল। শিক্ষার্থীদের এই সাধ প্রথম পূরণ করেছে ইউল্যাব। বলা যায়,  শিক্ষাগ্রহণের ক্ষেত্রে এমন স্বাধীনতা আনার উদ্দেশ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করে একটি মাইলফলক পাড়ি দিলো ইউল্যাব। ২০০৪ সালে স্বল্প পরিসরে  যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠানটি আজকে বিশাল এক পরিবার। বর্তমানে এর শিক্ষার্থী সংখ্যা সাড়ে ৪ হাজারের বেশি।

ইউল্যাবে শিক্ষার্থীদের বিশ্বে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো করে যোগ্য করে গড়ে তোলা হয় পুঁথিগত বিদ্যার পাশাপাশি ব্যবহারিক শিক্ষার মাধ্যমে বলে জানিয়েছেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্নদ্রষ্টা ও প্রতিষ্ঠাতা জেমকন গ্রুপের চেয়ারম্যান কাজী শাহেদ আহমেদ।

১৫ বছর পূর্তি উদযাপন অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছেন ইউল্যাবের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি কাজী শাহেদ আহমেদ

ইউল্যাব প্রতিষ্ঠার ১৫ বছরকে স্মরণীয় করে রাখতে বুধবার (১৬ অক্টোবর) রাজধানীর ধানমন্ডি প্রধান ক্যাম্পাসে আয়োজন করা হয় এক অনুষ্ঠান। কেক কেটে উদযাপন করা হয় ইউল্যাবের ১৫ বছর। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন অ্যাসোসিয়েশন অব প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিজ অব বাংলাদেশের (এপিইউবি) সভাপতি শেখ কবির হোসেন। অনুষ্ঠানের শুরুতেই ইউল্যাবের থিম সং পরিবেশন করে ইউল্যাব সাংস্কৃতিক সংসদ। 

প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, শিক্ষা নিয়ে যেমন সবার অবদান আছে তেমনি এই প্রতিষ্ঠানেরও অবদান আছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কেন অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো সরকারি সহায়তা পাবে না এটা অনেক সময় আলোচনায় উঠে এসেছে। আমি এভাবে কোনোদিন বিষয়টি নিয়ে ভাবিনি। আমরা বছরে অনেক অর্থ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দেই। এখানে সরকারি বেসরকারি চিহ্নিত করা সম্ভব হবে না শেষ বিচারে। শিক্ষাক্ষেত্রে যত বিনিয়োগ হবে সেটা জাতির বিকাশেই কাজে আসবে।

ইউল্যাবের ১৫ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছেন প্রধান অতিথি পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে অ্যাসোসিয়েশন অব প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিজ অব বাংলাদেশ (এপিইউবি)-এর সভাপতি শেখ কবির হোসেন বলেন, বাংলাদেশে ১০৩টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। এরমধ্যে কার্যক্রম চলছে ৯৩টির মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে। এসব বিশ্ববিদ্যালয় কিন্তু দেশের জন্য, সরকারের জন্য, যুব সমাজের জন্য। এই প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিগুলো অনেক দিক দিয়ে সাহায্য করে। বলা হয় যে, আমাদের বেতন বেশি। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে তো বেতন না নেওয়ারই কথা। কারণ, সেখানে টাকা সরকার থেকে দেয়। আজকে কোটি কোটি টাকা খরচ হচ্ছে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পেছনে। কিন্তু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের পেছনে সরকারের কোনও টাকা খরচ হয় না। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক কিংবা এডিবি’র প্রজেক্ট থেকে অল্প কিছু পায়। আজকে একটা বিল্ডিং করতে কোটি কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। এভাবে আমরা কিন্তু ইউনিভার্সিটিগুলো চালাচ্ছি।

বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন অ্যাসোসিয়েশন অব প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিজ অব বাংলাদেশ (এপিইউবি)-এর সভাপতি শেখ কবির হোসেন

তিনি আরও বলেন, আমাদের সরকার কিন্তু শিক্ষার দিকে বিশেষ নজর দিয়েছে। অনেক জায়গায় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হচ্ছে, কেউ কেউ ভবন নির্মাণে সহায়তা পাচ্ছে। কিন্তু, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় কিছুই পায় না। আমরা সরকারকে বলেছিলাম, ঢাকার বাইরে হলেও একটি জায়গা আমাদের দিন। তা কিন্তু আমরা পাইনি। অথচ কতভাবে কত জায়গা চলে যাচ্ছে। সরকারের সহযোগিতা যদি আমাদের সঙ্গে থাকে তাহলে কিন্তু এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অধিকতর সেবা দিতে পারে।   

ইউল্যাবের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সভাপতি কাজী শাহেদ আহমেদ বলেন, একটি ইউনিভার্সিটি করা খুব কঠিন কাজ। কী কারণ জানতাম না, কিন্তু ইউনিভার্সিটি আমাকে করতেই হবে। কেউ রাজি না, যাকেই ডাকি তারা কেউ রাজি হয় না। একটি ইউনিভার্সিটি করার ইচ্ছা সবারই হয়তো হয়, আবার নাও হতে পারে। ইউনিভার্সিটি করতে হলে ডান পকেটে ১০ লাখ আর বাম পকেটে ৯০ লাখ টাকা নিয়ে নামতে হবে। কোথায় যাবে, কী হবে কিচ্ছু চিন্তা করতে হবে না। একদিন দেখবেন প্রায় খালি হয়ে গেছে দুই পকেট। সর্বনিম্ন দুই বছরের মধ্যে আমি ইউনিভার্সিটির পারমিশন পেয়েছি।

অনুষ্ঠানে দর্শক ও শ্রোতাদের সঙ্গে সামনের সারিতে উপবিষ্ট ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ও অতিথিরা

তিনি আরও বলেন, দুই পকেট খালি হয়ে যাওয়ার পর এবার হিসাব করে দেখলাম ১০০ কোটি টাকা লাগবে এবং খুব তাড়াতাড়ি। আমার প্রতিজ্ঞা ছিল যে আমি এক পয়সা কোনোদিন ফেরত নেবো না। এই বলে আমি ১০০ কোটি টাকা জোগাড় করে দিয়ে দিলাম। অনেক সময় লাগলো, সেই ফাউন্ডেশন ডে আর আজকে ইউল্যাবের ১৫ বছর। আপনাদের সবার কাছে দোয়া চাচ্ছি যেন এই ইউনিভার্সিটি ১২ হাজার বছর টিকে থাকে।

ইউল্যাবের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সহ-সভাপতি ড. কাজী আনিস আহমেদ বলেন, আমি যুক্তরাষ্ট্রে লেখাপড়া শেষ করে দেশে ফিরে আসি ২০০৪ সালের জানুয়ারিতে। তার কিছুদিন পরেই আমার বাবা এবং ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি কাজী শাহেদ আহমেদ প্রকল্প পরিচালক হিসেবে আমাকে দায়িত্ব দেন। তখন সরকারের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ আদেশ ছিল যে অক্টোবরের মধ্যেই চালু করতে হবে, না হলে বিশ্ববিদ্যালয় কালো তালিকাভুক্ত হয়ে যাবে। সেটা আমাদের জন্য খুবই স্বল্প সময় ছিল। সে সময় আমাদের ক্যাম্পাস ছিল মহাখালীতে একটি ভবনে। যেদিন আমি দায়িত্বপ্রাপ্ত হলাম সেদিন দেখলাম আমাদের একটি বিল্ডিং আছে কিন্তু ভেতরে কিছু নেই। স্টাফ বলতে আমি, জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম আর দুইজন কর্মী ছিলেন। কিন্তু আমি এক মুহূর্তের জন্য ঘাবড়াই নাই। কারণ, আমি জানতাম আমার পেছনে বাবা আছেন, আমার পরিবার আছে এবং ড. রফিকুল ইসলামের মতো একজন আছেন।

তিনি আরও বলেন, যেকোনও কিছু, সে জিনিস যতই বড় হোক না কেন, তার গোড়াতে থাকে খুবই ছোট কিছু পদক্ষেপ, কিছু ব্যক্তি মানুষের উদ্যোগ। মহাখালীর বিল্ডিং থেকে একসময় আমরা এই বিল্ডিংয়ে এলাম, পাশাপাশি আরেকটা বিল্ডিং আছে। তার থেকেও চমৎকার মোহাম্মদপুরে আমাদের বিশাল মাঠসম্পন্ন স্থায়ী ক্যাম্পাস তৈরি প্রায় হয়ে গেছে। সেখানে অনেক সুযোগ-সুবিধা আছে। আমাদের একদম প্রথম দিকের শিক্ষার্থী যারা ছিল তারা কিন্তু আজকের ইউল্যাবের সুযোগ-সুবিধাগুলো পায়নি। তারপরও আমি বলবো–তারা একটি অভিজ্ঞতা পেয়েছে, যেটা অন্য কারও পক্ষে পাওয়া সম্ভব না। যেকোনও কিছুর সূচনালগ্নে থাকতে পারার মধ্যে কিন্তু একটি বিশেষ সৌভাগ্য আছে, একটি বিশেষ অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ আছে যদি সেটা নিতে জানা যায়। একটি ইউনিভার্সিটির জন্য ১৫ বছর কোনও সময় নয়, একটি ইউনিভার্সিটি দেড় হাজার বছরের জন্য।

বক্তব্য রাখছেন ইউল্যাবের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য জাতীয় অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম

জাতীয় অধ্যাপক এবং ইউল্যাবের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য ড. রফিকুল ইসলাম বলেন, আমি গত ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত আছি। কাজী শাহেদ আহমেদ যখন ‘আজকের কাগজ’ পত্রিকা বের করেন, তখন থেকে আমি তার সঙ্গে ছিলাম। কিন্তু তখন পত্রিকার পাশাপাশি মাথায় বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরপাক খাচ্ছিলো। তিনি এ দেশের সব বুদ্ধিজীবীকে নিয়ে একাধিক আলোচনা সভা করেন। তাদের কাছ থেকে জানতে চান–একটি আদর্শ বিশ্ববিদ্যালয় কীভাবে স্থাপন করা যায়। শেষ পর্যন্ত আমরা ঠিক করলাম, এটিকে লিবারেল আর্টস বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ দেওয়া যেতে পারে।

তিনি আরও বলেন, লিবারেল আর্টসের ধারণা এসেছে এজন্য যে, আমাদের দেশের প্রধান কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স এবং মাস্টার্সের ব্যবস্থা ছিল একটি বিষয়ের সঙ্গে সাবসিডিয়ারি দুটি বিষয় নিয়ে। এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। কিন্তু লিবারেল আর্টস শিক্ষার একটি সুবিধা হচ্ছে, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং মেজর করে হয়তো মিউজিকে মাইনর করতে পারছে। অর্থাৎ এই যে স্বাধীনতা, এর কারণ জ্ঞানার্জনের মধ্যে বেড়া দেওয়া ঠিক না। আমাদের শিক্ষার্থীদের স্বাধীনতা দেওয়া উচিত যে তারা কী পড়তে চায়। ইউল্যাবে আমরা জেনারেল এডুকেশন বিভাগের মাধ্যমে বাংলা ভাষা, সাহিত্য, ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যসহ ১০টি বিষয় আবশ্যিক করেছি। এগুলোতে উত্তীর্ণ না হলে কেউ ডিগ্রি পাবে না।

এ সময় ইউল্যাবের উপাচার্য ড. এইচ এম জহিরুল হক সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে সমাপনী বক্তব্য রাখেন।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ইউল্যাব বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য আমিনা আহমেদ, তাহিরা হক, জুদিথা ওলমাখার, বোর্ড অব ট্রাস্টিজের বিশেষ উপদেষ্টা প্রফেসর ইমরান রহমান, উপ-উপাচার্য প্রফেসর সামসাদ মর্তুজা, ট্রেজারার মিলন কুমার ভট্টাচার্য, রেজিস্ট্রার অধ্যাপক আখতার আহমেদসহ বিভাগীয় প্রধানগণ, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা। অনুষ্ঠান শেষে প্রধান অতিথি ও বিশেষ অতিথির হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেওয়া হয়। প্রাথমিক অনুষ্ঠানের পর ইউল্যাব অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন বিশেষ এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।       

ছবি: সাজ্জাদ হোসেন

/এসও/টিএন/এমওএফ/

লাইভ

টপ