সরকারের শুদ্ধাচারনীতি কী?

Send
শফিকুল ইসলাম
প্রকাশিত : ০৭:৪৫, অক্টোবর ১৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০৭:৪৫, অক্টোবর ১৮, ২০১৯

বাংলাদেশ সরকার

দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজের গতি বাড়ানোর পাশাপাশি সেবার মান উন্নয়নে সরকার বেশ কিছু পরিকল্পনা নিয়েছে। এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য সরকার ‘জাতীয় শুদ্ধাচার বাস্তবায়ন কৌশল’ নামে একটি কর্মপত্রও হাতে নিয়েছে। ইতোমধ্যে এই কৌশল বাস্তবায়নও শুরু হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।

এদিকে, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে যারা সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী উত্তম সেবা দেন, তাদের প্রতিবছর একবার শুদ্ধাচার পুরস্কার দেওয়া হয়। এই পুরস্কার পাওয়ার জন্য যোগ্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের খুঁজে বের করতে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে রয়েছে কমিটি। 

সরকারের শুদ্ধাচারনীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘‘সুশাসন প্রতিষ্ঠায় আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। সে আলোকে আইনকানুন, নিয়মনীতি, পরিকল্পনা ও বিভিন্ন কৌশল প্রণয়ন করা হয়েছে। এসব কৌশল বাস্তবায়ন অব্যাহত আছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য কেবল রাষ্ট্রীয় নিয়মনীতি, আইনকানুন প্রণয়ন ও প্রয়োগই যথেষ্ট নয়, এজন্য সামগ্রিক ও নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রম হাতে নেওয়া প্রয়োজন। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সামগ্রিক উদ্যোগের সহায়ক কৌশল হিসেবে ‘সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়: জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল’ প্রণয়ন করা হয়েছে।’’

সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রণীত জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলপত্রে শুদ্ধাচারের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত আইন-কানুন, নিয়মনীতি ও গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের সংবিধানের চেতনা নির্দেশ করে যে, বাংলাদেশ হবে একটি ন্যায়ভিত্তিক, শুদ্ধাচারী সমাজ; এর নাগরিকরা পরিবার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান ও সুশীল সমাজও হবে দুর্নীতিমুক্ত-শুদ্ধাচারী। ব্যক্তিমানুষের জীবন-সম্পত্তির নিরাপত্তা, অধিকার সংরক্ষণ ও সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রের আইনকানুন ও বিধিবিধান প্রণীত হয়েছে।

প্রসঙ্গত, ১৯৭২ সালের সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনায় কতিপয় মূলনীতি নির্ধারিত হয়। সেই অনুযায়ী সরকারের প্রত্যয় হলো—১) মানুষের ওপর মানুষের শোষণ থেকে মুক্ত ন্যায়ানুগ ও সাম্যবাদী সমাজলাভ নিশ্চিতকরণ। ২) মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ। ৩) মানব সত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিতকরণ। ৪) সব নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিতকরণ। ৫) নাগরিকের মধ্যে সম্পদের সুষম বণ্টন ও সুষম সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতকরণ। ৬) জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে মহিলাদের অংশগ্রহণ ও সুযোগের সমতা নিশ্চিতকরণ। ৭) প্রত্যেকের যোগ্যতা বিবেচনা করে কর্ম অনুযায়ী পারিশ্রমিক নিশ্চিতকরণ। ৮) কোনও ব্যক্তিকে অনুপার্জিত আয় ভোগ থেকে অসমর্থকরণ।

এই সূত্রে রাষ্ট্র-সমাজে কার্যকরভাবে ন্যায়-সততা প্রতিষ্ঠা ও সফলতার সঙ্গে দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠা সরকারের একটি মূল নীতি বলেও মনে করে মন্ত্রিরিষদ বিভাগ।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রজাতন্ত্রের  যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী উত্তম সেবা দেবেন, সরকার তাদের পুরস্কৃত করবে। এজন্য রয়েছে পৃথক গেজেট। ২০১৭ সালের ৬ এপ্রিল জারি করা ‘শুদ্ধাচার পুরস্কার প্রদান নীতিমালা-২০১৭’ সংক্রান্ত গেজেটে বলা হয়েছে, ‘সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়: জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল’ শিরোনামে জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল  সরকারের সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এ শুদ্ধাচার কৌশল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তার কর্মকৌশল প্রণয়ন করা হয়েছে।

গেজেটে আরও বলা হয়েছে, সরকারের মন্ত্রণালয় বিভাগ বা রাষ্ট্রীয় অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নির্বাচিত কর্মচারীদের পুরস্কার দেওয়ার উদ্দেশ্যে শুদ্ধাচার পুরস্কার নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। শুদ্ধাচার চর্চায় এই পুরস্কার পাওয়ার ক্ষেত্রে যারা নির্বাচিত হবেন, তারা হলেন—১) মন্ত্রণালয় বা বিভাগের সিনিয়র সচিব বা সচিব। ২) প্রতিটি মন্ত্রণালয় বা বিভাগের গ্রেড ১ থেকে গ্রেড ১০ ভুক্ত একজন এবং গ্রেড ১১ থেকে  ২০ পর্যন্ত একজনসহ মোট দুই জন কর্মচারী। ৩) মন্ত্রণালয় বিভাগ বা রাষ্ট্রীয় অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের ভেতর থেকে একজন কর্মচারী, ৪)  মন্ত্রণালয় বিভাগ বা রাষ্ট্রীয় অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মাঠপর্যায়ের আঞ্চলিক কার্যালয়গুলো থেকে একজন কর্মচারী, ৫) মন্ত্রণালয় বিভাগ বা রাষ্ট্রীয় অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মাঠ পর্যায়ের আঞ্চলিক কার্যালয়গুলোর গ্রেড ৩ থেকে ১০ ভুক্ত একজন গ্রেড ১১ থেকে ২০ পর্যন্ত একজন কর্মচারী, ৬) মাঠপর্যায়ের জেলাগুলোর ভেতর থেকে একজন কর্মচারী, ৭) মন্ত্রণালয় বিভাগ বা রাষ্ট্রীয় অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মাঠপর্যায়ের উপজেলা কার্যালয়গুলোর প্রধানদের ভেতর থেকে একজন কর্মচারী এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত হবেন।

গেজেটের ৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে কর্মচারী বলতে মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সব কর্মকর্তা কর্মচারীকে বোঝাবে।

‘শুদ্ধাচার নীতিমালা’ সংক্রান্ত গেজেটের ৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, নীতিমালায় বর্ণিত সূচকের ভিত্তিতে এবং প্রদত্ত পদ্ধতি অনুসরণ করে এ পুরস্কার দেওয়ার জন্য প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী বাছাই বা নির্বাচন করা হবে। পুরস্কার  দেওয়ার জন্য সুপারিশ করার ক্ষেত্রে শুদ্ধাচার চর্চার জন্য নির্ধারিত গুণাবলীর ১৮টি সূচকের প্রতিটির জন্য ৫ নম্বর করে মোট ৯০ নম্বর এবং মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, দফতর বা সংস্থার ধার্য করা অন্যান্য কার্যক্রমে ১০ নম্বরসহ মোট ১০০ নম্বর বিবেচনা করা যেতে পারে।’ 

শুদ্ধাচার পুরস্কারের জন্য ১৮টি গুণ থাকতে হবে। সেগুলো হলো—কর্মচারীর পেশাগত জ্ঞান, দক্ষতা ও সততার নিদর্শন স্থাপন করা, নির্ভরযোগ্যতা ও কর্তব্য নিষ্ঠা, শৃঙ্খলাবোধ, সহকর্মীদের সঙ্গে আচরণ, সেবাগ্রহীতার সঙ্গে আচরণ, প্রতিষ্ঠানের বিধিবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা, সমন্বয় ও নেতৃত্বদানের ক্ষমতা, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যাবহারে পারদর্শিতা, পেশাগত স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিষয়ক নিরাপত্তা সচেতনতা, ছুটি গ্রহণের প্রবণতা, উদ্ভাবনী চর্চার সক্ষমতা, বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি বাস্তবায়নে তৎপরতা, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার, স্বতঃপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশে আগ্রহ, উপস্থাপন দক্ষতা, ই-ফাইল ব্যবহারে আগ্রহ, অভিযোগ প্রতিকারে সহযোগিতা করা। 

গেজেটে আরও বলা হয়েছে, শুদ্ধাচার পুরস্কার পাওয়ার  উল্লিখিত সূচকের ১০০ নম্বরের মধ্যে কর্মচারীকে অবশ্যই ৮০ নম্বর পেতে হবে। ওই নম্বর না পেলে ওই কর্মচারী এই পুরস্কার পাওয়ার জন্য প্রাথমিকভাবে বিবেচিত হবেন না। তবে, বিবেচিত কর্মচারীদের মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া কর্মচারী শুদ্ধাচার পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হবেন। সিনিয়র সচিব বা সচিবদের মধ্যে এই পুরস্কার পাওয়ার জন্য যোগ্য কর্মচারী নির্বাচনের জন্য মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে গঠিত বাছাই কমিটি শুদ্ধাচার পুরস্কারের জন্য কর্মচারী চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করবেন। তবে, আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রধানদের ভেতর থেকে কর্মচারী বাছাইয়ের জন্য আঞ্চলিক প্রধানের নেতৃত্বে, জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা বাছাইয়ের জন্য আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রধানের নেতৃত্বে, উপজেলা পর্যায়ের কর্মচারী বাছাইয়ের জন্য জেলা কার্যালয়ের প্রধানদের নেতৃত্বে পৃথক বাছাই কমিটি থাকবে।

প্রতিবছর সরকারের শুদ্ধাচার পুরস্কার প্রাপ্ত কর্মচারীরা পুরস্কার হিসেবেএকটি সার্টিফিকেট ও একমাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ পাবেন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাবেক সচিব আলী ইমাম মজুমদার জানিয়েছেন, ‘জাতীয় শুদ্ধাচার এর মূল অর্থ হচ্ছে—রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থাকতে হবে প্রজাতন্ত্রের সব কর্মচারীকে। এর মধ্যে যারা ভালো করবেন, তাদের উৎসাহ দিতে সরকার যে পুরস্কার প্রথা চালু করেছেন, সে ক্ষেত্রে জাতীয় শুদ্ধাচার পুরস্কারের জন্য যোগ্য কর্মচারী নির্বাচনের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলদের সতর্ক থাকতে হবে। কোনোভাবেই এই পুরস্কারের জন্য ভুল ব্যাক্তি বাছাই করা ঠিক হবে না। 

জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব মোহম্মদ শফিউল আলম বলেন, ‘শুদ্ধাচারনীতি বাস্তবায়ন প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারীর দায়িত্ব। এ দায়িত্ব অবহেলায় যেমন তিরস্কার থাকবে, তেমনি ভালো কাজের জন্য পুরস্কারও থাকিবে। সরকারের জরি করা শুদ্ধাচার নীতিমালার গেজেটে উল্লেখ না থাকলেও শুদ্ধাচার পুরস্কার সনদ বাতিল করতে সরকারের কোথাও বাধা নেই। সরকার চাইলে যেকোনও সময় যে কারও পুরস্কার বাতিল করতে পারে।’

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘শুদ্ধাচার নীতিমালা হচ্ছে জনগণের প্রতি সরকারের অঙ্গীকার। যা বাস্তবায়ন করা প্রজাতন্ত্রের সব কর্মচারীর দায়িত্ব।’এই দায়িত্ব পালনে অবহেলার কোনও সুযোগ নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

 

/এমএনএইচ/

লাইভ

টপ