দেশে সব ক্যাসিনো বন্ধ, সন্দেহভাজনরা নজরদারিতে

Send
রাফসান জানি
প্রকাশিত : ২২:৩৬, অক্টোবর ১৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০৭:৫৭, অক্টোবর ১৯, ২০১৯

ক্যাসিনো
দেশে আর কোনও ক্যাসিনো খোলা নেই। ক্যাসিনোর সঙ্গে বেশিরভাগ ‘গডফাদার’কেই গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়া, তদন্তে কারও নাম এলে তথ্য যাচাই করে তাদেরও গ্রেফতার করবে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের সঙ্গে যুক্ত  কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপকালে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

প্রসঙ্গত, ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু করে র‌্যাব। অভিযানে সাতজন গডফাদারসহ ১৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এছাড়া, বিভিন্ন ক্যাসিনোতে র‌্যাবের অভিযানে ২০১ জনকে আর্থিক জরিমানার পাশাপাশি বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে ক্যাসিনোর সঙ্গে জড়িত আরও কয়েকজন ব্যক্তির নাম জানা গেছে। এর মধ্যে অধিকাংশই অভিযান শুরুর পর গা-ঢাকা দিয়েছেন, কেউ কেউ পালিয়েছে দেশ ছেড়ে।  

অভিযান শুরুর প্রথম দিনেই (১৮ সেপ্টেম্বর) গ্রেফতার করা হয় যুবলীগ দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূইয়াকে। তিনি ইয়াংম্যান্স ক্লাব পরিচালনা করতেন। ২০ সেপ্টেম্বর সাতজন দেহরক্ষীসহ গ্রেফতার করা হয় যুবলীগ নেতা ও প্রভাবশালী ঠিকাদার জি কে শামীমকে। একইদিন রাতে গ্রেফতার করা হয় কলাবাগান ক্রীড়া চক্রের সভাপতি শফিকুল আলম ফিরোজকে। ৩০ সেপ্টেম্বর গ্রেফতার হন অনলাইনে ক্যাসিনো পরিচালনাকারী  সেলিম প্রধান। ৬ অক্টোবর কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে গ্রেফতার করা হয় ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট ও সহ-সভাপতি এমরানুল হক আরমানকে। সর্বশেষ ৬ অক্টোবর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান মিজান ওরফে পাগলা মিজানকে গ্রেফতার করার হয় শ্রীমঙ্গল থেকে। ক্যাসিনোর সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতারের পরপরেই যুবলীগ থেকে তাদের বহিষ্কার করা হয়।

ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরুর পর থেকে ১১টি ক্যাসিনো ও ক্লাবে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এরমধ্যে ঢাকায় ৮টি ও চট্টগ্রামে ৩টি। এসব ক্যাসিনো ও ক্লাব থেকে কয়েক কোটি টাকা মূল্যের ক্যাসিনো সামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছে।

অভিযান চালানো ক্লাবগুলো হলো—ফকিরাপুল ইয়াংম্যান্স ক্লাব, ওয়ান্ডার্স ক্লাব, মুক্তিযোদ্ধা চিত্তবিনোদন ক্লাব, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্র, গোল্ডেন ঢাকা বাংলাদেশ, কলাবাগান ক্রীড়া চক্র, ধানমন্ডি ক্লাব, ফু-ওয়াং ক্লাব, চট্টগ্রামের মুক্তিযোদ্ধা ক্লাব, আবহানী ক্লাব ও মোহামেডাম ক্লাব।

রিমান্ডে নেওয়ার সময় সম্রাট

ঢাকার ইয়ং ম্যান্স ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্রের জুয়ার আসর ও বারে অভিযানের সময় ২০১ জনকে আর্থিক জরিমানাসহ বিভিন্ন মেয়াদে মাদক মামলায় কারাদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এর মধ্যে ১৯ জনকে একবছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা ও অনাদায়ে দেড় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ১৬১ জনকে ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ৫ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে এক মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, ২১ জনকে ছয় মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ২ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে সাত দিন বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।

র‌্যাবের অভিযানে এ পর্যন্ত দেশি-বিদেশি মুদ্রাসহ প্রায় ৮ কোটি ৪৫ লাখ নগদ টাকা জব্দ করা হয়েছে। এছাড়া, উদ্ধার হয়েছে ১৬৬ কোটি ২৭ লাখ টাকা এফডিআর, ১৩২টি বিভিন্ন ব্যাংকের চেক বই এবং ৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকার চেক। আরও জব্দ করা হয়েছে ৭ ভরি অলঙ্কার (৮ কেজি)। যার আনুমানিক মূল্য চার কোটি টাকা।

অভিযানে গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের কাছ থেকে বৈধ-অবৈধ অস্ত্র মিলিয়ে  ২৫টি আগ্নেয়াস্ত্র  জব্দ করা হয়েছে। যেগুলো বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার এবং অবৈধ অস্ত্র হিসেবে জব্দ করা হয়। পাশাপাশি বিপুল পরিমাণে ইয়াবা, বিদেশি মদ ও অন্যান্য অ্যালকোহলও জব্দ করা হয়েছে। খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়া ও ইসমাইলন হোসেন চৌধুরী সম্রাটের অফিস থেকে জব্দ করা হয়েছে টর্চারের কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের লাঠি ও ইলেকট্রিক শক দেওয়া মেশিন।

ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে বিভিন্ন থানায় মামলা

খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়ার বিরুদ্ধে গুলশান থানায় অস্ত্র, মাদকদ্রব্য ও মানি লন্ডারিং আইনে তিনটি এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মতিঝিল থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

এদিকে, মতিঝিল থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে  ঢাকা ওয়ান্ডার্স ক্লাবের পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে  একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

জি কে শামীমের বিরুদ্ধে গুলশান থানায় অস্ত্র, মাদক ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে দায়ের করা হয়েছে তিনটি মামলা।

কলাবাগান ক্রীড়া চক্রের সভাপতি শফিকুল আলম ফিরোজের বিরুদ্ধে ধানমন্ডি থানায় অস্ত্র আইনে এবং গুলশান থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি করে মামলা করা করেছে র‌্যাব।  

খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া (হেলমেট পরা)

ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের অংশীদার এনামুল হক এনু ও তার ভাই রুপন ভুঁইয়ার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে গেন্ডারিয়া থানায় একটি, সূত্রাপুর থানায় দুটি এবং বিশেষ ক্ষমতা আইনে দুটি, ওয়ারী থানায় অস্ত্র আইনে একটি ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে একটি করে মামলা করা হয়েছে।

মাদকদ্রব্য উদ্ধারের ঘটনায় ফু-ওয়াং ক্লাবের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইন ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি করে মামলা করা হয়েছে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায়।

অনলাইনে অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসায়ী সেলিম প্রধানসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে গুলশান থানায় মাদক ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা হয়েছে। 

ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের বিরুদ্ধে রমনা থানায় অস্ত্র ও মাদকদ্রব্য আইনে এবং আরমানের বিরুদ্ধে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থানায় ও রমনায় মাদকদ্রব্য আইনে মামলা দায়ের করেছে র‌্যাব।

জিকে শামীম

হাবিবুর রহমান মিজান ওরফে পাগলা মিজানের বিরুদ্ধে শ্রীমঙ্গল থানায় অস্ত্র আইনে ও রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

এসব মামলার মধ্যে ৯টি মামলার তদন্তভার পেয়েছে র‌্যাব। বাকিগুলো সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ ও সিআইডি তদন্ত করছে। তদন্ত চলার সময় ক্যাসিনোর সঙ্গে জড়িত আরও যাদের তথ্য পাওয়া যাবে তাদেরও আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে বলে জানিয়েছেন র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল মো. সারওয়ার-বিন-কাশেম।

র‌্যাবের  এই কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অভিযান শুরুর একমাস পরে আমরা বলতে পারি, বাংলাদেশে এখন আর কোনও ক্যাসিনো খোলা নেই। ক্যাসিনোর সঙ্গে জড়িত হাই প্রোফাইল যারা ছিলেন, তাদের প্রায় প্রত্যেককে আইনের নিয়ে এসেছি।’ এরপর মামলার তদন্তে কারও নাম বেরিয়ে এলে তথ্য যাচাই তাদের গ্রেফতার করা হবে বলেও তিনি জানান।

/এমএনএইচ/

লাইভ

টপ