ঢাবি হলের গেস্টরুমে ‘শিক্ষার্থী নির্যাতন’ বন্ধে নতুন পদক্ষেপ

Send
সিরাজুল ইসলাম রুবেল
প্রকাশিত : ১৮:০৫, অক্টোবর ১৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:৪১, অক্টোবর ১৯, ২০১৯

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলের গেস্টরুমঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আবাসিক হলের গেস্টরুমে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নির্যাতন করা হয় বলে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে এ ব্যাপারে অভিযোগ করা হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তাই নতুন করে তারা কর্মসূচি দেওয়ার কথা ভাবছেন। তবে এই অভিযোগকে ‘ঢালাও বক্তব্য’ আখ্যা দিয়ে প্রশাসন বলছে, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাছাড়া প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে নতুন করে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

বিভিন্ন হলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হলগুলোর গেস্টরুমে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ডেকে নিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। আচরণ শেখানোর নামে গেস্টরুমে যেতে বাধ্য করা এবং জোর করে মিছিল মিটিং করানো হয়। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদাসীনতাকে দায়ী করেন বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের নেতারা।

প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এখন থেকে প্রশাসনকে না জানিয়ে কোনও শিক্ষার্থী হলে উঠতে পারবেন না। প্রথম বর্ষ থেকেই সিটের ব্যবস্থা ও ভুক্তভোগীদের জন্য অভিযোগ বক্স রাখা হবে। বহিরাগতদের হল ছাড়ার নির্দেশসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের সভাপতি ফয়েজ উল্লাহ এ বিষয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের গেস্টরুমে শিক্ষার্থীদের নির্যাতন বন্ধে প্রশাসনের উদাসীনতা রয়েছে। এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে আমরা বিভিন্ন সময় দাবি জানিয়েছি, কিন্তু কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। নির্যাতন বন্ধে আগামী সপ্তাহে আমরা উপাচার্যের কাছে স্মারকলিপি পেশ করবো। একইসঙ্গে নির্যাতনকারীদের শাস্তিরও দাবি জানানো হবে।’

ছাত্র ফেডারেশনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি আবু রায়হান বলেন, ‘গেস্টরুম ও গণরুমের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান অনেক আগে থেকে। এটি বন্ধের জন্য আমরা প্রশাসনকে লিখিতভাবে জানাবো।’

সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের (মার্কসবাদী অংশ) বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি সালমান সিদ্দিকী বলেন, ‘প্রশাসন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের সহযোগিতায় দায়িত্বে আসে। তাই তাদের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে কথা বলতে ভয় পায়। বর্তমান প্রশাসন শিক্ষার্থীবান্ধব নয়। শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদে অচিরেই আমরা ১১টি ছাত্র সংগঠন এবং শিক্ষকদের নিয়ে আলোচনায় বসবো।’

এ বিষয়ে ডাকসুর ভিপি নুরুল হক নুর বলেন, ‘হলগুলোতে গেস্টরুম নির্যাতনের সঙ্গে ছাত্রলীগ সরাসরি জড়িত। আমি হলে থাকতেও এ ধরনের নির্যাতন হতো। গেস্টরুম-গণরুম বন্ধে আমি অনেক আগে থেকেই প্রতিবাদ করে আসছি। গত ২ এপ্রিল এসএম হলে প্রতিবাদ করতে গিয়ে ছাত্রলীগের হামলার শিকার হয়েছি। প্রশাসন বলেছিল বিচার করবে। লিখিত অভিযোগ দিয়েও বিচার পাইনি। এটি বন্ধে শিক্ষার্থীদের সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। তাদের মুখ খুলতে হবে।’

এ ব্যাপারে কথা হয় ডাকসুর জিএস গোলাম রাব্বানীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘হলগুলোতে কোনও টর্চার সেল আছে কিনা আমার জানা নেই। গেস্টরুমে লাভ টুগেদার হয়। তবে শিক্ষার্থীরা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দিলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেবো। অতি দ্রুত হলগুলোতে ডাকসু থেকে প্রতিনিধি পাঠানো হবে। টর্চার সেল আছে কিনা তারা তা দেখবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলের গেস্টরুমজানতে চাইলে বিজয় একাত্তর হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. এজেএম শফিউল আলম ভুঁইয়া বলেন, ‘এটির বিরুদ্ধে এখন শিক্ষার্থীদের সচেতন হতে হবে। তাদের মধ্যে যে দাবি উঠেছে সেটি ভালো। ভুক্তভোগীরা যদি সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ করে প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে। অনেক সময় তথ্য-প্রমাণের অভাবে বিচার করা যায় না। এ ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থীদের মুখ খুলে কথা বলতে হবে। শুধু প্রশাসনকে দুষলে চলবে না।’

প্রক্টর অধ্যাপক ড. একেএম গোলাম রব্বানী বলেন, ‘এসব বিষয়ে প্রশাসন নিরব ছিল—এটা ঢালাও বক্তব্য। কোনও অভিযোগ পেলে আমরা অতীতেও ব্যবস্থা নিয়েছি। এখন থেকে বিভিন্ন হলে অভিযোগ বক্স দেবো। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা নাম প্রকাশ না করেও অভিযোগ করতে পারবেন।’

এ ব্যাপারে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হলগুলোতে যেসব ঘটনা ঘটে সে বিষয়ে হলপ্রশাসনের কাছে কোনও অভিযোগ এলে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ আছে। এসব ঘটনা কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়। ইতোমধ্যে হলের প্রভোস্টদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। এখন থেকে যারা প্রথম বর্ষ থেকে হলে উঠবে, তাদের হল প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করেই উঠতে হবে। আর যেসব শিক্ষার্থী হলে আছে তাদের আসন বণ্টনের ক্ষেত্রেও আমরা ভাবছি।’

ভিসি আরও বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনের ক্ষেত্রে প্রশাসন নীরব থাকার কথা নয়, এখন থেকে এসব বিষয়ে অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসবের কোনও স্থান নেই।’

প্রশাসনের বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ভিপি নুর বলেন, ‘সব সময় দেখেছি চাপে পড়লে প্রশাসন কিছু পদক্ষেপ নেয়। তবে সেগুলো বাস্তবায়ন তাদের জন্য কঠিন হয়ে যায়।’

এদিকে, প্রশাসনের পদক্ষেপের বিষয়ে ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় বলেন, ‘প্রশাসনের উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। তাদের পদক্ষেপ বাস্তবায়নে ছাত্রলীগ সব সময় পাশে থাকবে।’ তবে হলের গেস্টরুমে শিক্ষার্থীদের নির্যাতনের বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘কাউকে জোর করে কোনও কাজ করানো হয় না। তবে মাঝেমধ্যে দুই-একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। যারা এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেওয়া হয়।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গেস্টরুম নিয়ে যে অভিযোগ করা হচ্ছে সেটি ভাওতাবাজি ছাড়া কিছুই না। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আমাদের এক ধরনের মিথষ্ক্রিয়া হয়। আমরা শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক আদর্শের কথা বলি। কোনও শিক্ষার্থীকে নির্যাতন করা হয় না। আর আমরাও চাই প্রথম বর্ষের একজন শিক্ষার্থী প্রশাসনের মাধ্যমে হলে উঠুক। কোনও রাজনৈতিক দলের হয়ে হলে না থাকুক এটা আমাদেরও দাবি।’

 

/আইএ/টিএন/

লাইভ

টপ