যেখানে রাস্তাজুড়েই মানুষ পারাপার

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ০৯:২৬, অক্টোবর ২২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:০৫, অক্টোবর ২২, ২০১৯

রাসেল স্কয়ারে এভাবেই চলে রাস্তা পারাপার

ধানমন্ডি রাসেল স্কয়ার সিগন্যাল। ট্রাফিক পুলিশ গাড়ি থামালে শুরু হয় মানুষ পারাপার। সেটি আর থামে না। সিগন্যাল উঠে গেলেও গাড়ির ফাঁক গলে, হাত তুলে গাড়ি থামিয়ে, আঙুলের বা চোখের ইশারায় আগে পিছে সাইড হয়ে মানুষ পার হচ্ছে। সিগন্যাল থেকে আর ২০০ গজ এগোতেই আবারও রাস্তা পারাপারের জন্য গাড়ির ব্রেক,আর  ড্রাইভারের গালির শব্দ। ইশারায় যদি গাড়ি না থামে, তবে পারাপারের জন্য অপেক্ষায় থাকা ব্যক্তিরা উচ্চ স্বরে গালি দিতে থাকেন— ‘ওই মানুষ পার হয় চোখে দেখো না?’

রাসেল স্কয়ার থেকে ধানমন্ডি ২৭ পর্যন্ত রাস্তা পার হওয়ার জেব্রা ক্রসিং আছে তিনটি, সিগন্যাল দুটি, ওভারব্রিজ আছে দুটি। কিন্তু মানুষ রাস্তা পার হয় ১২টি পয়েন্ট দিয়ে। এরমধ্যে ছয়টি পয়েন্ট ব্যস্ততম জায়গায়, যেখানে গাড়ি থামার কোনও সুযোগ বা কারণই নেই। এই অনিয়মের পারাপার,আর পরিবহন চালক ও হেলপারের অসহযোগিতামূলক আচরণে কমানো যাচ্ছে না সড়ক দুর্ঘটনা।

কেবল এই রাস্তা না, রাজধানীর বড় বড় চার রাস্তার মোড়ের একই চিত্র। কাওরান বাজার সার্ক ফোয়ারা, বাংলা মটর, আগারগাঁও,শ্যামলী, কলেজ  গেট, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের সামনের সড়ক—  কোথাও গাড়ি দেখে মানুষ রাস্তা পার হয় না। এসব জায়গায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রাস্তা দিয়ে তারা বেপরোয়া হাঁটা দেয়, গাড়িরই যেন দায়িত্ব মানুষজন দেখেশুনে চলা।

রাসেল স্কয়ার

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল থেকে হুইল চেয়ারে এক রোগী নিয়ে বেরিয়ে আসলেন পরাগ হোসেন।  গাড়ি চলাচল না দেখেই তিনি রাস্তা পার হওয়া শুরু করলেন। হুইল চেয়ারে রোগী নিয়ে  তিনি মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে থেকে দুটি প্রাইভেট কার ও কয়েকটি মোটরসাইকেল যাওয়ার অপেক্ষা করলেন। তারপর বাকি রাস্তাটুকু পার হলেন। কেন রাস্তায় গাড়ি না থামতে এভাবে পার হলেন জানতে চাইলে পরাগ হোসেন বলেন, ‘ওপারে এক্সরের সিরিয়াল আছে। কখন গাড়ি থামবে তার কোনও ঠিক নেই। রওনা দিলে গাড়িচালকরা দেখে থেমে যান।’ তার কাছে জানা গেলো, যিনি হুইল চেয়ারে বসা ছিলেন, তিনি পথচারী হিসেবে রাস্তা পার হতে গিয়ে পা ভেঙেছেন ২১দিন আগে।

নাগরিক অধিকার নিয়ে কাজ করেন যারা তারা বলছেন, এই জায়গায় আমরা বেশ জটিল অবস্থায় পড়ে যাই। আলসেমি আর অসচেতনতার কারণে আমরা জীবন বাজি রেখে এই কাজগুলো অহরহ করছি। একদিকে পরিবহনের ভয়ঙ্কর অসংবেদনশীল আচরণ, আরেকদিকে নাগরিকের অসচেতনতা। এই দুইয়ের মধ্যে পুরো সেক্টরটা পিছিয়ে পড়ে বারবার।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণ মতে, ২০১৫ সাল থেকে সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী বিগত চার বছরে ২১ হাজার ৩৮৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৯ হাজার ৩১৫জন নিহত ও ৬৯ হাজার ৪২৮ জন আহত হয়েছেন। জনগণকে সচেতন করা গেলে, পাঠ্যপুস্তকে নিরাপত্তার ইস্যু অন্তর্ভুক্ত করে বিষয়গুলো শেখানো গেলে, দুর্ঘটনার শঙ্কা কমবে— এমনটাই মনে করেন যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই বিশেষ দিবসের মধ্য দিয়ে সচেতনতা কর্মকাণ্ড যেটা আশা করেছিলাম, সেটা পাইনি। বছরে ১০ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ দিচ্ছে , তারপরও এই দিবসকে ঘিরে সচেতনতা কর্মসূচি নেই। ’

রাসেল স্কয়ার

তিনি আরও বলেন, ‘নাগরিকরা আইন ভঙ্গ করে সড়কের যত্রতত্র চলাচল করছে সেটা যেমন সত্য, আইন শেখানো রাষ্ট্রের দায়িত্ব, সেটা কতটা শেখানো হচ্ছে তা বিবেচনায় নিতে হবে।’ 

যথাযথ অবকাঠামো দিতে পারলে এবং সচেতনতা কার্যক্রম অব্যাহত রাখা গেলে সমস্যার সমাধান সম্ভব বলে মনে করেন বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) সাবেক পরিচালক ড. হাসিব মোহাম্মদ আহসান।  তিনি বলেন,‘যথেষ্ট এবং স্বাচ্ছন্দ্যময় করে নাগরিককে ফুটপাত দিলে এবং পুরো ঢাকা শহরে যদি তার রাস্তা পারাপারের সহজ সুযোগ করে দেওয়া যায়, তবে পরিস্থিতি বদলাবে। এসব না করে নাগরিককে দোষারোপ করা যাবে না।’

ড. হাসিব মোহাম্মদ আহসান আরও বলেন,‘রাস্তায় কোনও চিহ্ন নেই,ফুটপাতগুলোর কোনোটাতে হাঁটা যায় কোনোটাতে হাঁটা যায় না। সেখানে তাকে হাঁটা শিখিয়ে লাভ নেই। ঢাকা শহরে গ্রাম থেকে মানুষ আসে, তাদের শেখার উপযোগী কোনও প্রচারণা নেই। এসবতো একটা নির্দিষ্ট সময়ে প্রচার করবেন, অন্যসময় করবেন না এমন না। ধারাবাহিকভাবে এই প্রচারণা চালানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে ।’ 

 

/এপিএইচ/

লাইভ

টপ