ঢাকা লিট ফেস্টের দ্বিতীয় দিন ভিনদেশিদের কণ্ঠে বাংলার গল্প

Send
বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
প্রকাশিত : ২২:২৬, নভেম্বর ০৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:৩৬, নভেম্বর ০৮, ২০১৯

পপপতুমুল বৃষ্টিতেও সহস্র মানুষের পদচারণায় উচ্ছল ছিল ঢাকা লিট ফেস্টের দ্বিতীয় দিন। দেশি-বিদেশি সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের খ্যাতিমান মানুষদের অংশগ্রহণে নানা আয়োজনে মুখরিত ছিল সারা দিন। শুক্রবার (৮ নভেম্বর) নানা আয়োজনের মধ্যে শশী থারুরের কণ্ঠে বিশ্ব অঙ্গনে নানা ঘটনায় বঙ্গবন্ধুর অবদানের গল্প সবার নজর কেড়েছে। দিনশেষে আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ মিলনায়তনে ‘শেখ হাসিনা: অ্যা ডটার্স টেল’ দেখার জন্য ছিল উপচেপড়া ভিড়।

একই অডিটোরিয়ামে ‘ইন দ্য টাইম অব দ্য আদারস’ শিরোনামের সেশনে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমেরিকান লেখক নাদিম জামান। সেখানে সঞ্চালক রিফাত মুনিম ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখার ক্ষেত্রে লেখকের ভাবনা জানতে চান। ‘একটি সত্য ঘটনায় প্রচুর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ চরিত্র থাকে। তাদের প্রত্যেকের আবার আলাদা আলাদা গল্প থাকে। আলাদা অক্ষ থাকে। এগুলোকে সুন্দরভাবে সাজানো গেলেই সব গল্প মিলে একটি উপন্যাসে রূপ নেয়।’ ঐতিহাসিক উপন্যাস নিয়ে নিজের ভাবনা এভাবেই বর্ণনা করেন নাদিম জামান।

‘ইন দ্য টাইম অব দ্য আদারস’ নাদিম জামানের প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস। যার প্রেক্ষাপট বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। এই ঐতিহাসিক উপন্যাসের চরিত্র ইমতিয়াজের ১৯৭১ সালের মার্চে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা হয় এই সেশনে। নাদিম জামান বলেন, ‘সত্য ঘটনার অনুপ্রেরণায় কিছু চরিত্র সৃষ্টির মাধ্যমে বাংলাদেশে স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত মানুষগুলোর বাইরেও আরও কিছু চরিত্র আছে। সাধারণ মানুষ কীভাবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ দেখেছে, সে সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সদস্য এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের জীবন কেমন ছিল–সেসব ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এ উপন্যাসে।’

লিট ফেস্টের দ্বিতীয় দিন সকাল ছিল শিশুদের। সকালের সেশনে কসমিক টেন্ট ও নজরুল মঞ্চজুড়ে ছিল শিশুদের কলতান। কসমিক টেন্টে বিজ্ঞান বাক্সের রাতুল খানের সঙ্গে শিশুরা মেতেছিল বিজ্ঞান নিয়ে মজার সব খেলায়। ‘ফান উইথ ফিজিকস’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে রাতুল খান সাত থেকে দশ বছর বয়সী শিশুদের সঙ্গে পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। উপহার হিসেবে বিজ্ঞানসামগ্রী পেয়ে খুশি শিশুরাও।

একই সময়ে শিশুদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন ব্রিটিশ চিত্রকর, অ্যানিমেটর ও লেখক ক্রুটিস জবলিং। নজরুল মঞ্চে ‘চিলড্রেন'স ওয়ার্ল্ডস ফ্যান্টাসি’ শীর্ষক আয়োজন ছিল ছয় থেকে দশ বছর বয়সী শিশুদের জন্য। শিশুরা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনছিল জবলিংয়ের সৃষ্ট বিভিন্ন চরিত্রের গল্প। বিখ্যাত ওয়্যারওয়ার্ল্ডস, ম্যাক্স হেলসিং ও মনোসটার হান্টার সিরিজ নিয়ে এ সময় শিশুদের সঙ্গে কথা বলেন জবলিং।

কসমিক টেন্টে ‘হিরোজ কামস ফ্রম এভরিহোয়্যার’ শীর্ষক রোমাঞ্চকর আলোচনায় রুমানা হাবিবের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন জনপ্রিয় বাংলা কমিক কার্টুনিস্ট ও কমিক লেখক রাঙামাটির সব্যসাচী চাকমা। আরও উপস্থিত ছিলেন অ্যানিমেশন ডিজাইনার সামির আসরান রহমান। সেশনটিতে জনপ্রিয় কিছু কমিক চরিত্র নিয়ে আলোচনা করা হয়।

সব্যসাচী চাকমা তার জনপ্রিয় কমিক চরিত্র ‘জুম’ চরিত্রটি বর্ণনা করেন। তিনি পেশায় একজন পশুচিকিৎসকও। চরিত্রটি বাংলাদেশের রাঙামাটিকে উপস্থাপন করে। তিনি একজন প্রকৃতিপ্রেমী এবং প্রাকৃতিক শক্তিকেই তিনি এই চরিত্রের মধ্য দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন, যা বিভিন্ন পরিবেশের চিত্র তুলে ধরে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য ‘জুম’-এর সুপার পাওয়ার বৃক্ষনির্ভর।

single pic template-1-Recovered-Recoveredলিট ফেস্টের দ্বিতীয় দিনের সেশন ‘নো ওয়ার্ল্ড ফর উইমেন’ বাংলা একাডেমির লনে অনুষ্ঠিত হয়। প্যানেলিস্ট হিসেবে ছিলেন ভারতীয় পুরস্কারজয়ী লেখিকা ও সাংবাদিক প্রিয়াঙ্কা দুবে, জাতিসংঘে বাংলাদেশের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মিয়া সেপ্পো, বাংলাদেশের নারীবাদী লেখক, মানবাধিকার কর্মী, উন্নয়নকর্মী ও নারীপক্ষের সদস্য মাহীন সুলতান। সঞ্চালক ছিলেন সমাজকর্মী তাশফি হোসেইন। সেশনের শুরুতেই প্রিয়াঙ্কা দুবে তার বই সম্পর্কে বলেন, ‘নারীদের কোনও দেশ নেই, তারা সব সমাজেই অত্যাচার ও নিগ্রহের শিকার।’

সঞ্চালক তাশফি হোসেইন বইটি লেখার অভিজ্ঞতা এবং এটি কীভাবে জীবনকে প্রভাবিত করেছে জানতে চাইলে প্রিয়াঙ্কা বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এ ধরনের সহিংসতা বেশি দেখা যায়। আমি বিভিন্ন অধ্যায়ে বিভিন্ন অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেছি। কীভাবে ভুক্তভোগীকেই দোষ দেওয়া হয় তা নিয়ে আমি অবাক হয়েছিলাম। এটার জন্য সম্পূর্ণ পরিবারকেই কষ্ট সহ্য করতে হয়।’

মাহীন সুলতান বলেন, ‘আমাদের দেশে এ সহিংসতা এক ধরনের আতঙ্কে রূপ নিয়েছে। যারা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে তারা নিগ্রহের শিকার হতে থাকে।’

জাতিসংঘে নিজের কাজের অভিজ্ঞতা থেকে মিয়া সেপ্পো বলেন, ‘জাতিসংঘে কাজ করার সুবিধার্থে আমি বিভিন্ন দেশে লিঙ্গবৈষম্য নিয়ে কাজ করেছি। বাংলাদেশে কাজ করতে গিয়ে প্রতিনিয়তই আমি কয়েকটি শব্দ বারবার শুনেছি। সেগুলো হলো–শারীরিক নিপীড়ন, ধর্ষণ। কিন্তু আমি লক্ষ করেছি, এ দেশে ফোকাস পরিবর্তন হয়ে নির্যাতনকারীর দিক থেকে নির্যাতিতের দিকে চলে যায়। যেখানে শাস্তি হওয়া উচিত নির্যাতনকারীর, যেখানে সেমিংয়ের শিকার হতে হয় ভুক্তভোগীকেই। এটা খুবই লজ্জা দেয় আমাকে।’

বাংলা একাডেমির লনে অনুষ্ঠিত হয় আনন্দঘন কবিতা আবৃত্তি। এতে উপস্থিত ছিলেন কবি কামাল চৌধুরী; কবি ও লেখক কাইসার হক; ভারতীয় কবি, সাংবাদিক ও নৃত্যশিল্পী তিশানি দোশি এবং পাকিস্তানি কবি, মোটিভেশনাল স্পিকার ও হিপহপ আর্টিস্ট জোহাব জি খান।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই জোহাব জি খান তার ‘ইমাজিন’ কবিতাটি আবৃত্তি করে শোনান। জোহাব বিশ্বজুড়ে ২০টিরও বেশি দেশে কবিতা কর্মশালা পরিবেশন ও পরিচালনা করেছেন। তিনি তার হিপহপ আবৃত্তি দিয়ে দর্শকদের মাতিয়ে রাখেন। স্টেজ থেকে নেমে দর্শকদের কাছ থেকে শব্দ নিয়ে তা দিয়ে হিপহপ কবিতা আবৃত্তি করে মুগ্ধ করেন সবাইকে। আরও একটি জনপ্রিয় কবিতা ‘আই রাইট’ আবৃত্তি করে শোনান তিনি।

তিশানি দোশি তার জনপ্রিয় কাব্যগ্রন্থ ‘গার্লস আর কামিং আউট অব দ্য ওডস’ থেকে ‘দ্য আর্ট অব লুজিং’ আবৃত্তি করে শোনান।

দুপুরে আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ অডিটোরিয়ামে ‘সমাজ ও সত্তা: দ্বান্দ্বিক বিরোধ’ শীর্ষক আলোচনা হয়। এতে অংশ নেন কথাসাহিত্যিক হরিশংকর জলদাস, শাহীন আক্তার, আনিসুল হক ও মাসরুর আরেফিন।

এ সময় হরিশংকর জলদাস বলেন, ‘প্যান্ট শার্ট পরা ভদ্রলোকদের হরিজনরা বিশ্বাস করে না। তারা মনে করে, তথাকথিত ভদ্রলোকেরা চালাকি করে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করে চলে যায়। এজন্য তাদের সঙ্গে দীর্ঘদিন মেলামেশা করে “রামগোলাম” উপন্যাসটা লিখেছি। তাদের এই প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে যে, আমি তোমাদেরই লোক। এটি লেখকের সঙ্গে ব্যক্তিসত্তার দ্বন্দ্ব। সমাজের এই দ্বন্দ্ব এবং বিরোধ লেখকদের বারবার উৎসাহিত করে।’

কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক বলেন, ‘একটা কথা আছে, লেখক চার কারণে লেখে। নিজের ইগো থেকে লেখক নিজেকে প্রকাশ করতে চায়। গুরুত্ব অর্জন করতে চায় এবং কেউ কেউ পৃথিবীর কল্যাণও করতে চায়।’ এক দার্শনিকের কোড দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের এবং জগতের সম্পর্ক, জলের ভেতর মাছের যে স্বাধীনতা, পুরো প্রকৃতি এবং পৃথিবীর সঙ্গে আমাদের সঙ্গে সেই সম্পর্ক। এটার সঙ্গে যোগ করে বলতে চাই, মাঝে মাঝে আমরা উঠে বাতাসটাও নিই, শুধু জলের মধ্যে বিচরণ সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের বেদনাটা আমাদের সবার মনে নানাভাবে স্পর্শ করে এবং নানাভাবে এটা আমরা প্রকাশ করি।’

কথাসাহিত্যিক মাসরুর আরেফিন বলেন, ‘সাহিত্য কোনও প্রেসক্রিপশন দিয়ে হয় না। লেখকের দ্বন্দ্ব প্রতি মুহূর্তে নিজের ভেতরে। লেখালেখির জায়গাটা একদমই একান্ত, মারমুখী জায়গা এটা না। লেখার টেবিলে সারা পৃথিবীর কোনও দ্বন্দ্ব ও হইচই থাকে না। ওটা থাকে মাথার ভেতরে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আমাদের পৃথিবীটাকে চিনি। লেখককে তার পৃথিবীটা ভালোভাবে চিনে ফেলতে হয়। লেখক যাই বলতে চান না কেন, শেষে তাকে গল্প নির্মাণ করতে হয়। ভাবতে হয়, যেন গল্পটা মানুষকে ধরে রাখতে পারে।’

শাহীন আক্তার বলেন, ‘গত শতাব্দীর অর্থাৎ চল্লিশের দশক যেটা মূলকেন্দ্র উপন্যাসের, সেটা ছিটেফোঁটা আমাদের কাছে এসেছে। আমার কাছে মনে হয়েছে, এখন সময় এসেছে আমাদের আরও পেছনে ফিরে দেখার।’

একই অডিটোরিয়ামে ‘স্টেট অব স্টেটলেসনেস’ শীর্ষক সেশনে গর্গ চট্টোপাধ্যায়ের সঞ্চালনায় উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটিং মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের চেয়ারপারসন তাসনিম সিদ্দিকী, ভারতীয় লেখক সম্রাট চৌধুরী ও আমেরিকান সাংবাদিক জেফ্রি গেটেলম্যান।

একটি রাষ্ট্রে বসবাস করেও রাষ্ট্রহীন হওয়া বলতে কী বোঝায়? গর্গ চ্যাটার্জির এমন প্রশ্নের উত্তরে তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, ‘এটা সম্পর্কিত সেই মানুষদের সঙ্গে, যারা ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে বিভিন্ন সময় বাস্তুহারা হয়েছে অথবা স্বেচ্ছায় বাস্তুভিটা ছেড়ে উত্তম জীবন অন্বেষণে অন্য কোথাও চলে গেছে।’

/এফএ/এমএএ/এমওএফ/

লাইভ

টপ