যৌন নির্যাতনের প্রমাণ মিললেও শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তির নির্দেশ নেই

Send
এস এম আববাস
প্রকাশিত : ২৩:২২, নভেম্বর ১০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:৩০, নভেম্বর ১১, ২০১৯

যৌন হয়রানিশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কিংবা প্রতিষ্ঠানের বাইরে যৌন নির্যাতনের প্রমাণ মিললেও শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না শিক্ষাপ্রশাসন। যৌন নির্যাতনের বিষয়টি এড়িয়ে অন্য অপরাধের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে অনেকটা লোক দেখানো। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

নারায়ণগঞ্জের অক্সফোর্ড স্কুলের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্তে যৌন নির্যাতনের অভিযোগের প্রমাণ মিলেছে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে শিক্ষা-বাণিজ্যের অভিযোগের সত্যতাও পাওয়া গেছে। তবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেয়নি শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বরখাস্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে বেতন-ভাতা কেনও বন্ধ হবে না, শুধু তা জানতে চেয়ে নোটিশ করা হয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের কান্দাপাড়া অক্সফোর্ড স্কুলের সহকারী শিক্ষক আশরাফুল ইসলাম আরিফ শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় নম্বর কম দেওয়ার ভয় দেখিয়ে যৌন নির্যাতন চালাতো। এ ঘটনা ফাঁস হওয়ার পর ২৭ জুন স্কুলটিতে র‌্যাব অভিযান চালিয়ে সহকারী শিক্ষক আরিফ ও প্রধান শিক্ষক জুলফিকার রফিকুল ইসলামকে আটক করে।

অভিযোগ ছিল, ২০ জনের মতো ছাত্রীকে নিজ ফ্ল্যাটে নিয়ে ধর্ষণ করে আরিফ। মামলার পর জবানবন্দিতে ধর্ষণের কথা স্বীকার করে ওই শিক্ষক। এই ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে তদন্ত করেন জেলা মাধ্যমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার। তদন্তে নির্যাতনের প্রমাণ পায় তদন্ত কমিটি। এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষা-বাণিজ্য হয় বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটির প্রাথমিক, নিম্ন মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের কোনোটিতেই পাঠদানের অনুমতি ও একাডেমিক স্বীকৃতি নেই। তবে এডুকেশন ইনস্টিটিউশন আইডেন্টিফিকেশন (ইআইআইএন) নম্বর রয়েছে। এই প্রতিবেদন পাওয়ার পর উপ-সচিব আনোয়ারুল হক স্বাক্ষরিত ১৮ অক্টোবর কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ। অভিযুক্ত শিক্ষকের বেতন-ভাতা বন্ধে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালককে পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন পাঠাতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে স্কুলের প্রধান শিক্ষক জুলফিকার রফিকুল ইসলাম বলেন, অভিযুক্ত শিক্ষককে ২৪ জুলাই বরখাস্ত করা হয়েছে। শিক্ষা-বাণিজ্য নিয়ে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অভিযোগ সত্য নয়। টিউশন ফি ৪০০ টাকা নেওয়া হয় ।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব জাবেদ আহমেদ বলেন, ‘কীভাবে এমনটা হয়েছে বা কী ভুল হয়েছে, সংশ্লিষ্ট শাখা কী করেছে তা অফিস চলাকালে খোঁজ নিয়ে জানানো সম্ভব হবে।’

একইভাবে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণ পাওয়া গেলেও তা এড়িয়ে গিয়ে চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার কালিপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ মো. এনামুল হকের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের অভিযোগে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে একই কলেজের প্রভাষক দ্বীন ইসলামকে থাপ্পড় মারা, বিধিবহির্ভূত হিসেবে তার প্রধান শিক্ষক এবং পরে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে তার (অধ্যক্ষের) নিয়োগের অভিযোগ প্রমাণের কারণে কেন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না, তা জানতে চেয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর। গত ২৪ সেপ্টেম্বর অধিদফতরের সহকারী পরিচালক (কলেজ-৩) শাখা থেকে কারণ দর্শানো নোটিশ করা হয়। তদন্তে কলেজের অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে প্রমাণ পাওয়া গেলেও অধ্যক্ষ তার বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য নয় বলে দাবি করেছেন।

জানতে চাইলে অধ্যক্ষ মো. এনামুল বলেন, ‘এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা, থাপ্পড় মারার বিষয়টিও মিথ্যা।’

একজন নারীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক তৈরি করে তার প্রতি অন্যায় করা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা। ’

এদিকে, ঢাকা কমার্স কলেজে টিউটোরিয়াল কোচিং প্রোগ্রামের নামে প্রতি বছর ১২ কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত শুরু করেছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর। কিন্তু, নারী শিক্ষককে যৌন নির্যাতনে একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ থাকলেও সে বিষয়ে কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ২৫ সেপ্টেম্বর মিরপুর কমার্স কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান সাইদুর রহমানের বিচার দাবিতে ক্যাম্পাসের সামনে প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। গণমাধ্যেমে সংবাদ প্রকাশের পর প্রতিষ্ঠানটি লোক দেখানো একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কিন্তু, বিষয়টি নিয়ে তৎপরতা নেই মন্ত্রণালয় কিংবা অধিদফতরের।

অভিযোগের বিষয়ে কোনও কথা বলতে রাজি হননি সাইদুর রহমান।

এছাড়া গত কয়েক মাসে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ছাত্রীদের যৌন হয়রানির অভিযোগে কয়েকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও কোনও সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হয়নি কবে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। আবার সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও নির্দিষ্ট সময়ে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের বিষয়ে কোনও তৎপরতা নেই অধিদফতরের।

মন্ত্রণালয় যৌন হয়রানি প্রতিরোধে হাইকোর্টের আদেশ বাস্তবায়নে নির্দেশনা দিলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তা মানছে কিনা তারও মনিটরিং নেই।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের পরিচালক (মাধ্যমিক) অধ্যাপক. ড. আবদুল মান্নান বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি উচ্চ আদালতের নির্দেশ মানতে বাধ্য করার। ইতোমধ্যে মনিটরিং শুরু হয়ে গেছে। যেসব প্রতিষ্ঠান উচ্চ আদালতের নির্দেশ মানবে না, তাদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে এমপিও বন্ধ করা হবে, পাঠদান ও অ্যাকাডেমিক স্বীকৃতি বন্ধ করার সুপারিশ করা হবে।’

/এনআই/ওআর/এমওএফ/

লাইভ

টপ