অভিভাবকদের ধৈর্যের অভাবে বাধার মুখে শিশুর বিকাশ

Send
উদিসা ইসলাম০৪:১৮, সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৫

children psychologyবাবার সঙ্গে মোটরসাইকেলে স্কুল থেকে বাসায় ফিরছিল শিশু নাহিল। প্রচণ্ড জ্যামে ফুটপাত দিয়ে কখনও রাস্তার সিগনাল অমান্য করে ছুটে চলেছে মোটরসাইকেল। হঠাৎ সামনে পড়ে যায় এক রিকশাচালক। কষে ধমক লাগান বাবা। রিকশাওয়ালা পাল্টা যুক্তি দেখাতেই গালিগালাজ শুরু করেন সেই অভিভাবক। খেয়াল করলেন না- পেছনে থাকা শিশুটি কানখাড়া করে শুনে নিচ্ছে কোন পরিস্থিতি কাকে কী গালি দিতে হয়!
শিশু মনোবিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যক্তি, পরিবার, সামাজিক পর্যায়ে মূল্যবোধের যে অবক্ষয় হচ্ছে এবং শিশুর অপরাধ প্রবণতা যে হারে বেড়ে চলেছে তার নেপথ্যে অভিভাবকদের অসহিষ্ণু আচরণ অনেকটাই দায়ী।অভিভাবকদের আইন না মানা, আচরণে শালীনতা না রাখার বলি হচ্ছে শিশুরা।
পথশিশুদের অপরাধ প্রবণতা নিয়ে যথেষ্ট গবেষণা হলেও মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত পরিবারের শিশুরা কিভাবে হতাশাগ্রস্ত বা প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠছে সেসব নিয়ে গবেষণা নেই। ভোগবাদী অর্থনীতির লাগামহীন প্রতিযোগিতা সংক্রমিত হচ্ছে উঠতি বয়সী কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সন্তানকে কষ্টসহিষ্ণু ও স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলা জরুরি। সে যেন পারিবারিক জটিলতায় পড়লেও হতাশাগ্রস্ত না হয়ে পড়ে সেজন্য তাকে আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তুলতে সামাজিক পরিবেশ থাকা জরুরি।
একটি শিশু চকোলেট খেয়ে খোসাটা বাসার মধ্যে নির্দিষ্ট জায়গায় না ফেলে ঘরের মেঝেতে ফেলে দিল। বাসায় কাজের সহায়তাকারী হিসেবে যিনি আছেন তাকে সেটা তুলে নিতে বললেন শিশুটির মা। শিশুটিকে শেখানো হলো না এটা আসলে কোথায় ফেলতে হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের কাজে শিশুদের উদ্যোগী না করায় মেধাবিকাশে জটিলতা দেখা যায়। সে হয়ে ওঠে পরনির্ভরশীল। এমনকি স্কুলের ব্যাগটিও স্কুল গেট থেকে গাড়িচালক গাড়ি পর্যন্ত নিয়ে যান। এতে করে পরে অন্য কাজের প্রতিও অনীহা তৈরি হয় শিশুর।
সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক মাহবুবা নাসরিন বলেন, বাবা মা যদি বাসার কাজে সহায়তাকারীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করে সেটা শিশুর মানসিকতায় ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাদের মধ্যে তথ্য লুকানো ও অপরাধপ্রবণতা বাড়তে থাকে।

রাজধানীর একটি ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যেসব কিশোর-কিশোরীরা মাদকাসক্ত কিংবা ধূমপান করছে- খোঁজ নিলে জানা যায় তাদের পরিবারে নানা অসংগতি রয়েছে। বাসায় হয়তো বাবা-মা সময় দেন না, পরিবারের অন্য সদস্যদের বিষয়ে নেতিবাচক আলাপ শিশুদের সামনে করা হয় কিংবা নিজেদের জীবনের নেতিবাচক কাজগুলো যেমন ঘুষ নেওয়া-দেওয়ার মতো ঘটনাগুলো অবলীলায় শিশুদের সামনে বলা হয়; এসবেই শিশুটিকে অপরাধের সাথে পরিচিত করে। 

এ বিষয়ে মনোবিজ্ঞানী ডা. মোহিত কামাল বলেন, ‘এ ধরনের পরনির্ভরশীল জীবন যাপনে অভ্যস্ত শিশুর দ্রুত মাদকাসক্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। বস্তির শিশুরা একভাবে মাদকাসক্ত হচ্ছে আবার পথশিশুরা অন্যভাবে হচ্ছে। ঠিক তেমনই মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের মাদকাসক্ত হয়ে পড়ার সুযোগ পরিবার থেকেই তৈরি হয়। অসহিষ্ণু অভিভাবকদের মধ্যে যারা ভোগবিলাসিতার জন্য অন্যায়ের পথ বেছে নেন তাদের সন্তানদের ভেতর অস্থিরতার মাত্রা বেশি থাকে। ওই অস্থিরতাই তাদের মাদকের দিকে টেনে নেয়।’

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আহমেদ হেলালের মতে, শিশুর কোনও বিষয়ে কেউ অভিযোগ করলে অভিভাবকরা সাধারণত সেই সমালোচনা নিতে পারেন না। শিশুর সামনেই অভিযোগকারীর প্রতি আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। এতে শিশুটি আরও বেশি নেতিবাচক কাজে উৎসাহী হয়। তিনি বলেন, শিশুর সামনে কারও সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করা ঠিক নয়। এমনকি শ্রেণি বিভাজন তৈরি হয়, এমন কথাও বলা উচিত নয়। অভিভাবকদের কাউন্সিলিংয়ের সুযোগ আমাদের সমাজে নেই বলেও সমস্যাগুলো দিন দিন বাড়ছে বলেও জানান তিনি।

 

/এফএ/

লাইভ

টপ