বড়দিনের উৎসব থেকে হারিয়েছে কীর্তন ও বৈঠক

সাদ্দিফ অভি
২৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৮:২২আপডেট : ২৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ১০:১৬

বড়দিনের উৎসব থেকে হারিয়েছে কীর্তন ও বৈঠক শুধু ক্রিসমাস ট্রি সাজানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই যিশু খ্রিস্টের জন্মদিন পালন। বড়দিনের আয়োজনে যুগে যুগে পাল্টেছে ধরন আর যোগ হয়েছে নতুন নতুন চল। তবে সবকিছুর মধ্যে বড়দিনের কীর্তন বা ক্রিসমাস ক্যারল হারিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। বড়দিনে ব্যাপক আকারে গ্রামে ও শহরে এই রীতি চালু থাকলেও এখন তুলনামূলক তা অনেকটা কমে এসেছে। হয়তো এই কীর্তন একসময় হারিয়েও যেতে পারে বলে মনে করেন যিশু খ্রিস্টের অনুসারীরা। 

খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের সবার কাছে একটি পুণ্যময় দিন হিসেবে পরিচিত বড় দিন। যিশু খ্রিস্টের জন্ম কবে হয়েছিল, এনিয়ে স্পষ্ট করে উল্লেখ নেই পবিত্র বাইবেলে। খ্রিস্ট ধর্মের প্রবর্তকের জন্ম হয়েছিল অলৌকিকভাবে। খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস অনুযায়ী,  যিশু খ্রিস্ট পৃথিবীতে মানুষের রূপ গ্রহণ করে জন্মগ্রহণ করেন। পৃথিবীর সব পাপ থেকে মানুষকে মুক্তি দিতে, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে আরও সুসংহত করতেই যিশুর আগমন। যিশুর আগমনের এই ক্ষণ স্মরণ করতেই তাঁর অনুসারীরা বিশ্বব্যাপী ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে ২৫ ডিসেম্বর বড়দিন পালন করে থাকে। তাদের বিশ্বাস ডিসেম্বরেরই কোনও এক সময় যিশুর জন্ম।         

হারিয়ে গেছে ক্রিসমাস ক্যারল বা কীর্তন

৩৩৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে রোমান বর্ষপঞ্জিতে ২৫ ডিসেম্বরকে বড়দিন উৎসব হিসেবে উদযাপন করার নির্দেশনা দেওয়া হয় বলে জানা যায়। রোমান সাম্রাজ্যে খ্রিস্ট ধর্ম রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ধীরে ধীরে ব্যাপক আকারে জনপ্রিয় হয়ে বড়দিন উৎসবে রূপ নেয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যিশুর অনুসারীরা প্রার্থনার পাশাপাশি উৎসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে বড়দিন পালন করে। বড়দিন উৎসবে তারা ‘ক্রিসমাস ক্যারল’ বা আনন্দ গানের আয়োজন করে। আর  এই সংস্কৃতি আমাদের বাংলাদেশি সংস্কৃতিতে ‘বড়দিনের কীর্তন’ হিসেবে জায়গা করে নেয়।

একসময় বড়দিন মানেই ছিল কীর্তন গানের প্রস্তুতি। ১০-১২ দিন ধরে চলতো প্রস্তুতি। গ্রামে গ্রামে এমনকি শহরেও ছিল এই আয়োজন। বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে গাওয়া হতো কীর্তন গান। ডিসেম্বরের ২৩ ও ২৪ তারিখ রাতে যিশুর অনুসারীরা সম্মিলিতভাবে ঘুরে ঘুরে প্রতিবেশিদের বাড়ি বাড়ি যেতো। প্রায় সারারাত জেগে গাওয়া হতো কীর্তন গান, চলতো ভোর পর্যন্ত। গান পরিবেশনের পরে হইচই করে প্রতিটি বাড়িতে হতো খাওয়া দাওয়া। এখন সেই আনন্দ আর চোখে পড়ে না। হারিয়ে গেছে আবহমান কালের এই কীর্তন গান।

হারিয়েছে বৈঠকও

এছাড়া, হারিয়ে গেছে বড়দিনের বৈঠকও। আগে গ্রামাঞ্চলে বাড়ি বাড়ি বৈঠক বসতো। বড়দিনের আগে কয়েক দিন ধরে এই বৈঠকে গান-বাজনাসহ বিভিন্ন পিঠাপুলি ভাগাভাগি করে একসঙ্গে খাওয়া হতো। তাতে পারস্পরিক মিলন,ভ্রাতৃত্ব,সামাজিকতা ও জীবন ভাগাভাগি হতো। এখন এসব বৈঠক হারিয়ে গেছে। পালাগান,কীর্তন প্রতিযোগিতা, বিভিন্ন অঞ্চলে নাটক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রচলন ছিল বড়দিন উপলক্ষে।

বাংলাদেশ খ্রিস্টান অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের খ্রিস্টান ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের সচিব নির্মল রোজারিও বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘একসময় গ্রামেগঞ্জে কীর্তন হতো, সেটা ক্যারলে রূপ নিয়েছে। তারপরও কীর্তন হয়। ঢাকাতেও একসময় হয়েছে। কীর্তনের আগের যে রেওয়াজ ছিল এখন সেটা নেই। আরেকটা ছিল বৈঠক, সবাই মিলে একটি ক্ষুদ্র সমাজ ছিল। ঢোল বাজাতে বাজাতে কীর্তন করতো, গান করতো, পিঠা খেতো। একবাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে যেতো। কিন্তু সেগুলো এখন হারিয়ে গেছে। এছাড়া, ঢেঁকি দিয়ে চাল গুঁড়া করে যে পিঠা তৈরি করতো, তাও হারিয়ে যাচ্ছে।’         

পিঠার জায়গা দখল করেছে কেক

ভাওয়াল অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী বিবিক্কা পিঠার স্থান ছিল একসময় বড়দিনে, এখন সেটা দখল করে নিয়েছে কেক। পশ্চিমা বিশ্বের অনুকরণে সব অঞ্চলেই বড়দিনে কেকের প্রচলন বাড়ছে। শহরের আয়োজনে আগে কেক যুক্ত থাকলেও এখন সেটা ছড়িয়েছে গ্রাম পর্যন্ত। 

কলাগাছ থেকে ক্রিসমাস ট্রি

একসময় বড়দিন আয়োজনে গ্রামের বাড়িতে মাটির দেয়ালে কিংবা কাদামাটি দিয়ে বেড়া লেপন করে নানা রঙের নকশা-ফুল আঁকা হতো। কাগজের ঝালোর দিয়ে সাজানোর রীতি এখনও আছে। তবে একসময় বাড়ির উঠোনে কলাগাছ পুঁতে, রঙিন বেলুন ও গাঁদা ফুল দিয়ে সুন্দর করে গেট সাজানো হতো। এখন ক্রিসমাস ট্রি রঙিন বাতি দিয়ে সাজানো হয়।

নির্মল রোজারিও আরও বলেন, ‘বড়দিনের আয়োজনে নতুন নতুন সংযোজন হচ্ছে। ছোটবেলায় কলাগাছ দিয়ে আমাদের ঘর সাজাতাম। তার মধ্যে গাঁদা ফুল দিতাম। এখন সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে ক্রিসমাস ট্রি। শহর থেকে ক্রিসমাস ট্রি এখন গ্রামে চলে গেছে। আবার খাবার-দাবারের মধ্যে অনেক পরিবর্তন এসেছে। একসময় আমরা শুধু পিঠা খেতাম। এখন সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে কেক। কেকের সঙ্গে আরও যুক্ত হয়েছে পোলাও কোর্মা।’

তেজগাঁও ক্যাথলিক চার্চের ফাদার রিপন ডি রোজারিও বলেন, ‘একসময় আমরা একে অন্যের সঙ্গে মেলামেশার মাধ্যমে খুব আনন্দ জাঁকজমকপূর্ণভাবে বড়দিন পালন করতাম। এখন শুধু কেন্দ্রিকতা, যার যার বিশ্বাসের কেন্দ্রিকতা। এখন বাহ্যিকতা শুধু আনন্দ। পোশাকের বাহ্যিকতা বেশি, ভেতরে আধ্যাত্মিকতা কম। আগে বড়দিন পালনের প্রস্তুতি অনেকদিন ধরে নেওয়া হতো। কিন্তু সেটা ফিকে হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। সবকিছু শহরকেন্দ্রিক হওয়ায় আগের মতো কিছু নেই। আগের গ্রামে যেতাম, পিঠাসহ অনেক আয়োজন হতো। এখন সেগুলো নেই।’

/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
মেক্সিকোর বিপক্কে তিন পরিবর্তন নিয়ে নামছে ইংল্যান্ড
মেক্সিকোর বিপক্কে তিন পরিবর্তন নিয়ে নামছে ইংল্যান্ড
ব্রাজিলকে বিদায় করা হাল্যান্ডকে নিয়ে যা লিখলো ফিফা
ব্রাজিলকে বিদায় করা হাল্যান্ডকে নিয়ে যা লিখলো ফিফা
১৯৯০ সালের পর শেষ ষোলোতেই বিদায় নিলো ব্রাজিল 
১৯৯০ সালের পর শেষ ষোলোতেই বিদায় নিলো ব্রাজিল 
ব্রাজিলকে বিদায় করে কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ে
ব্রাজিলকে বিদায় করে কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ে
সর্বাধিক পঠিত
নামিদামি হোটেলের সবজি এত মজার হয় কেন? জানুন বাবুর্চিদের ট্রিকস
নামিদামি হোটেলের সবজি এত মজার হয় কেন? জানুন বাবুর্চিদের ট্রিকস
মেসির ইন্টার মায়ামিতে যাচ্ছেন ভোজিনহা!
মেসির ইন্টার মায়ামিতে যাচ্ছেন ভোজিনহা!
জুলাইয়ে কাদের হাতে স্নাইপার রাইফেল ছিল জানালেন চিফ প্রসিকিউটর
জুলাইয়ে কাদের হাতে স্নাইপার রাইফেল ছিল জানালেন চিফ প্রসিকিউটর
‘ট্রাফিক পুলিশকে অনুরোধ না করতে সব মন্ত্রীকে সতর্ক করেছেন প্রধানমন্ত্রী’  
‘ট্রাফিক পুলিশকে অনুরোধ না করতে সব মন্ত্রীকে সতর্ক করেছেন প্রধানমন্ত্রী’  
প্রাক্তন দুই স্ত্রীর শুভকামনা সঙ্গে নিয়ে আজ আমিরের বিয়ে
প্রাক্তন দুই স্ত্রীর শুভকামনা সঙ্গে নিয়ে আজ আমিরের বিয়ে