Vision  ad on bangla Tribune

আজাদের চলে যাওয়া এবং কিছু ভাবনা

রাশেদ রাফি২০:৪৪, আগস্ট ২৬, ২০১৫

Rafi৯ আগস্ট প্রথম আলোয় আজাদের মৃত্যু সংবাদটা আসে। আজাদের সাথে সর্বশেষ আমার ফোনে কথা হয় রমজানের আগে। চিকিৎসার সব চেষ্টা শেষে আজাদ তখন ওর নিজ বাড়িতে। গত কয়েক বছরে কয়েকজন কাছের মানুষের মৃত্যু দেখে ক্যান্সার আক্রান্ত আজাদের চলে যাওয়ার প্রস্তুতি আমার কাছে এতোই স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল যে আমি ওকে আয়ু বৃদ্ধির কোনও মিথ্যা আশ্বাস না দেখিয়ে সোজা বলে দিয়েছিলাম, ‘ঠিক আছে আজাদ তাহলে যাও, আমরাও আসছি যে কোনও সময়ে’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ছাপচিত্র বিভাগের মেধাবী ছাত্র খন্দকার জামিল ইকবাল আজাদের থাইরয়েড ক্যান্সার ধরা পড়ে ২০১২ সালে। কলকাতা টাটা মেমোরিয়াল থেকে ড. সৌমেন রায়ের পরামর্শে ওকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সিঙ্গাপুরে। অসুখটা অনেকদূর গড়িয়ে গেলেও সিঙ্গাপুরের সফল চিকিৎসার পর আজাদ ২০১৩ সালে চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক হিসেবে যোগদান করতে সক্ষম হয়। অবশ্য এর মাঝে সে রীতিমত ডাক্তার দেখিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু, শেষ রক্ষাটা আর হলো না। কয়েক মাস আগে আবার বিছানায় পড়তে হলো তাকে।

রোজার ঈদের আগে আজাদকে যখন নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে রাখা হয়েছিল তখনই আজাদেকে নিয়ে এ লেখাটা তৈরি করবো বলে চিন্তা করেছিলাম। ঠিক করেছিলাম লেখাটার নাম দিবো ‘ঈদ ও আজাদের টলোমলো প্রাণ’। ওই লেখায় বুঝাতে চেয়েছিলাম যে আমাদের আজাদের প্রাণ এখন কচু পাতার টলমলে পানির মতো যা একটা ধমকা বাতাস এলে ঈদের আগেই পড়ে যেতে পারে। কিন্তু ওটা আর লেখা হয়নি কারণ আমাদের পত্রিকাওয়ালারা এমন কঠিন সত্য ছাপাবেননা, তারা ছাপাবে্ন আমাদের বেশিরভাগ মানুষ রহস্যে ঢাকা যে অসত্যে বিশ্বাস করে তা, কারণ তা না হলে তাদের পত্রিকা কেউ কিনবেনা। আজাদ যে চলে যাবে সে বিষয়ে ১০০ ভাগ নিশ্চিত হওয়া সত্ত্বেও আমরা বলতে পারছিলামনা যে আজাদ চলে যাবে। এর পেছনে কাজ করেছে দুটি জিনিস, এক- আমাদের লালিত বিশ্বাস, দুই-  কঠিন সত্য গ্রহণে আমাদের অহেতুক ভয়। একথা বলার পর আমি যে কথাটা বলবো- তা শুনতে স্ববিরোধীই মনে হবে কিন্তু এমন বিষয়গুলো প্রায়ই ঘটতে দেখি বলেই বলছি। ৮ আগস্ট দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের মেধাবী চিত্রশিল্পী ফারুক ভাই (চারু ফারুক) ও সেই অনুষদের সহযোগী  অধ্যাপক আব্দুল মোমেন মিল্টন ভাই এর কাছ থেকে আজাদের মৃত্যু সংবাদের ফোনগুলো পর পর আসার আগেই আমার মন বারবার বলছিল- আজাদের খবরটা জানতে হবে। অথচ গত এক মাস ব্যস্ততার কারণে আজাদের কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। তাহলে ৮ আগস্ট, যেদিন ভোরে আজাদ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেল,  সেদিন কেন এমনভাবে আজাদের বিষয়ে জানার জন্য মন আনচান করছিল। এমন বিষয়গুলোর কোনও ব্যাখ্যা আমাদের কাছে নেই। তবে একথা বলা যায় যে- পৃথিবীর প্রতিটা মানুষ ভিন্ন ভিন্ন ব্যাক্তিত্ব, অভিজ্ঞতা, অনুভূতি ও পরিবেশ নিয়ে বড় হয় বলে একই জ্ঞান ধারণ করা সত্ত্বেও একেকজন হয় একেক রকম।

ফিরে যাই আজাদের কথায়। আজাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালে ‘আমরা মানুষের জন্য’ নামক সংগঠনের সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিল।  ২০১২ সালে আজাদের ক্যান্সার ধরা পড়লে এ সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা জনাব সবুজ শিশির আজাদের চিকিৎসার জন্য টাকা সংগ্রহে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। অথচ ২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে হুট করেই তিনি চলে গেলেন পৃথিবী ছেড়ে। ২০১৪ সালের ২৭ আগস্ট লিভার ক্যন্সারে আক্রান্ত হয়ে পৃথিবী ছেড়ে যান সবুজ শিশিরের ছোট ভাই কামরুল ইসলাম। এবার ৮ আগস্ট চলে গেল আজাদ। একসাথে থাকা এই মানুষগুলোর এভাবে অকালে চলে যাওয়ার বিষয়টা ভাবলে কেমন মনে হয়না? আসলে শুধু মনে হওয়া পর্যন্তই শেষ এর বেশি আমরা আর এগুতে পারিনা।  

সবুজ শিশির মানুষের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার জন্যই গড়ে তুলেছিলেন ‘আমরা মানুষের জন্য সংগঠনটি। অথচ নিজের স্বাস্থ্য ও জীবন গঠনের প্রতি ছিলেন উদাসীন, আর তাই মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ছিলেন চিরকুমার। আজাদও ছিল চিরকুমার। সবুজ শিশির ও আজাদ একটা বিশেষ জীবনদর্শনের চর্চা করে গেছেন। আর তা হলো ত্যাগ ও ধৈর্যের আলোয় হৃদয়কে আলোকিত করে মানব সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া। সবুজ শিশির রবীন্দ্রনাথের ভক্ত ছিলেন কিন্তু অমরত্বের প্রতি রবীন্দ্রনাথের আকর্ষনের সমালোচনা করেছেন অকুন্ঠ চিত্তে। তিনি বলতেন অমরত্বের প্রতি মনোযোগ না দিয়ে নিজের ভেতরে জ্বলতে থাকা আলোকে উজ্জ্বল করার প্রতি মনোযোগী হলে রবীন্দ্রনাথ আরও অনেক কালজয়ী লেখা দিয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু সেটা করতে পারেননি বলেই তার অনেক লেখায় মনে হয়েছে- হয়েও হয়নি।

আমি কোন ভাববাদী দার্শনিক নই, কিন্তু আমার মনে এখন একটা ভাবনা জমেছে আর তা হলো এই যে সবুজ শিশিরের মতো নিবেদিত প্রাণ মানুষেরা কোনও পুরস্কার চায়নি।

আমার  বিশ্বাস তাদের আত্মা সারা পৃথিবী ঘুরে-ঘুরে আলোক প্রত্যাশী সব মানুষের মননে-মগজে ত্যাগ ও ধৈর্যের আলো ঢালছে যে আলোয় আগামী পৃথিবী জ্বলে উঠবে, আমরা পাবো লোভ, ভোগ, হিংসা, ক্রোধ, মিথ্যা, দম্ভ ও অহংকার মুক্ত এক অনন্য পৃথিবী...


লেখক: প্রধান নির্বাহী, ফুল-পাখি-চাঁদ-নদী।

ইমেইল-  sea.sky.rafi@gmail.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ