Vision  ad on bangla Tribune

বীরাঙ্গনার জীবন কাটল যৌনপল্লীতে

শরিফুল ইসলাম পলাশ০০:২২, ডিসেম্বর ০১, ২০১৫

ছদ্মনাম- জোসনা‘মুক্তিযুদ্ধের সময় জান-মাল বাঁচানের জইন্যে মাসের পর মাস পলায়া বেড়াইছি। কিন্তু শেষরক্ষা হয় নাই। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানিগো হাতে ধরা পড়তে হইছে। গেরামের রাজাকাররা ধইরা মিলিটারি ক্যাম্পে আনছে। রাত তিনটা থেকে বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত চলছে নির্যাতন। ডরে-যন্ত্রণায় অসুস্থ হইয়া পড়ছি। উদ্ধার হইছি পরে। কিছুদিন চিকিৎসা কইরে সুস্থ হইছি। বাপ-মায় জোর কইরে গেরামের এক রাজাকারের সঙ্গে বিয়া দিছিল। দ্যাশ স্বাধীন হওনের পর গেরামের লোকজনের অপমান আর আকথা-কুকথার জ্বালায় এই অন্ধকার জগতে আইছিলাম।’ কথাগুলো বলছিলেন মাদারীপুর যৌনপল্লীর এক সাবেক কর্মী। বীরাঙ্গনা হয়েও ব্যবহার করতে পারেন না নিজের আসল পরিচয়। পল্লীতে তাকে নিতে হয়েছে ছদ্মনাম- জোসনা।

জন্ম মাদারীপুরে, চার ভাই দুই বোনের মধ্যে জোসনা সবার বড়। স্বাধীনতার পর নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখেছিলেন, কিন্তু তথাকথিত সমাজ তার স্বপ্ন পূরণ হতে দেয়নি। লোকলজ্জা আর বিরূপ পরিস্থিতির কারণে আশ্রয় নিয়েছেন মাদারীপুরের যৌনপল্লীতে। প্রায় চার দশক সেখানেই কাটিয়েছেন।

জীবন সায়াহ্নে দাঁড়িয়ে মানসিক প্রতিবন্ধী এক ছেলে আর নাতি-নাতনিদের নিয়ে বেঁচে-বর্তে আছেন জোসনা। তবে মনে মনে অপেক্ষায় আছেন, একদিন মিলবে স্বীকৃতি। কিছুটা হলেও পাবেন সম্মান।

স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরও প্রায় অন্তরালে থাকা এই বীরাঙ্গনার জীবনের গল্প জানতে সম্প্রতি এ প্রতিবেদক যান মাদারীপুরে। এক এনজিওকর্মীর মাধ্যমে মুঠোফোনে যোগাযোগের সূত্র ধরে জোসনার সন্ধান মেলে। মাদারীপুর শহরের পুরান বাজার এলাকায় থাকেন জোসনা। কিছুদিন আগেই এ শহরের শতবর্ষী একটি যৌনপল্লী উচ্ছেদ করা হয়েছে। গড়ে উঠছে সুপার মার্কেট। মার্কেটের গলিতে ঢুকে বীরাঙ্গনা জোসনার খোঁজ করতেই পাওয়া গেল বাসার ঠিকানা। বাজারের একটি গলিতে দেখা হলো প্রায় ৬৫ বছর বয়সী এই নারীর সঙ্গে। নিজের জমিতে গড়ে তোলা ছোট্ট আবাসস্থল। সন্তানদের কথা ভেবে শুরুতে নিজের জীবনের গল্প প্রকাশ করতে চাননি তিনি।

অনেক জায়গায় ঘোরার পর মহিষের চর এলাকায় গেরামের বাড়িতে গিয়া উঠছি। দিনে বাড়িতে থাকতাম, আর শীতের রাইতে ছোটমা আমাগোরে তিন-চারটা লেপ-কম্বলের নিচে লুকায় রাখতো।

কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর মুখ খোলেন। স্মৃতি হাতড়ে বলতে শুরু করেন সব ঘটনা। ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় বৈশাখ মাসের মেলায় পাকিস্তানিরা হানা দেয়। জ্বালাও-পোড়াও শুরু করে। তহন আমার বয়স ১২-১৩। বাপ-মায়ের সাথে জানের ভয়ে এই গেরাম সেই গেরাম পলায়া বেড়াইছি। অনেক জায়গায় ঘোরার পর মহিষের চর এলাকায় গেরামের বাড়িতে গিয়া উঠছি। দিনে বাড়িতে থাকতাম, আর শীতের রাইতে ছোট  মা আমাগোরে তিন-চারটা লেপ-কম্বলের নিচে লুকায় রাখতো। দিনগুলো খুব কষ্টের আছিল। নদী দিয়ে লাশ ভাইসে যাইতো, মাছ খাওন যাইতো না। গ্রাম ফাঁকা, লোকজন নাই। কোনও কিছু কিনে আনার মতো অবস্থাও ছিল না।

একটু থেমে তিনি বলেন, ‘এক সময় গেরামের রাজাগারগো নজরে পইড়ে যাই। এক রাইতে তিনটার দিকে রাজাকার আর মিলিটারিরা আমারে ধইরে জুট মিলে লইয়ে যায়, হেইহানেই তহন মিলিটারিগো ক্যাম্প আছিল। বয়স কম ছিল, ডরে-অত্যাচারে অসুস্থ হই পড়ছি। আমরা বিহারি কাকা বলে একজনরে ডাকতাম, তিনিই মিলিটারিগো বুঝাইয়া আমারে উদ্ধার করছে। গেরামে গিয়া বেশ কিছুদিন চিকিৎসা করাইয়া সুস্থ হইছি। পরে ছোট মায়ের সঙ্গে তার বাপের বাড়িতে গিয়া ঠাঁই লইছি। কিন্তু সেইহানে যাওনের পরও লাভ হয় নাই। রাজাকারগো অত্যাচার থন বাঁচতে বাপ-মায় জোর কইরে খালেক সরদার নামের এক রাজাকারের সঙ্গে বিয়ে দিছে। বিয়া মাইনা নেই নাই, তার বাড়িতেও যাই নাই। হেয় আমার নানার বাড়িতে আইলে পলায়া থাকতাম।’

এখন দিন কাটছে কেমন জানতে চাইলে বলেন, অহন বয়স হইছে, পল্লীও উচ্ছেদ হইছে। যা জমাইছিলাম বইস্যা বইস্যা খাইতাছি। আমার এক ছেলে এক মেয়ে, মেয়ের বিয়া দিছি। এক ছেলে পাগল তারে নিয়াও বিপদে আছি।  ছেলে, ছেলের বউ-বাচ্চা নিয়ে আমাগো পাঁচজনের সংসার। নিজের বলতে সামান্য জমি ছাড়া আর কিছু নাই। এই জীবনে চাওয়া-পাওয়ার কিছু নাই। বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি নিয়ে সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে চাই শুধু।

যৌনকর্মীদের অধিকার বিষয়ে কর্মরত সেক্স ওয়ার্কাস নেটওয়ার্ক-এর সাবেক সভানেত্রী জয়া শিকদার বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের পর শুধু সময় পার হয়েছে। কিন্তু বীরাঙ্গনাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়নি। অনেক নির্যাতিত নারী এখনো লোকচক্ষুর অড়ালে দিন যাপন করছেন। জোসনাও তাদেরই একজন। তিনি লজ্জায় তার অতীতের কথা কারও কাছে প্রকাশ করতে চান না। কয়েক বছর আগে ভারতে একটি সেমিনারে অংশ নিতে গিয়ে তিনি তার না জানা কথাগুলো আমাদের সঙ্গে শেয়ার করেন। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক, আমাদের জন্য লজ্জারও। আমি মনে করি, তার মতো বীরাঙ্গনাদের অধিকার রক্ষার জন্য রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলদের সক্রিয় হওয়া উচিত।’

বীরাঙ্গনা জোসনার গল্পটা জানা ছিল না মাদারীপুর জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা মাহমুদা আক্তারের। আলাপকালে তিনি বলেন, 'আমি তার নাম শুনেছি, কিন্তু তিনি বীরাঙ্গনা তা আমার জানা নেই। তিনি কখনও আমাদের জানাননি। একাত্তরে সম্ভ্রম হারানো নারীর তালিকা তৈরির সময় তার খোঁজ আমরা পাইনি।'
তিনি আরও বলেন, 'একজন বীরাঙ্গনা যৌনপল্লীতে থাকবেন। এটি মেনে নেওয়ার মতো নয়। তিনি আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হবে। বিষয়টা আমি দেখছি।’

 

/এফএ/

লাইভ

টপ