behind the news
Vision  ad on bangla Tribune

'মৃত্যুর পর স্যালুট চাই না, জীবিত থাকতে সম্মান চাই'

হানিফ উল্লাহ আকাশ, নেত্রকোনা০৬:৪৯, ডিসেম্বর ০২, ২০১৫

মো. নূরুল হুদাদেশের স্বাধীনতার জন্য সরকারি চাকরি ছেড়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন নেত্রকোনার মো. নূরুল হুদা। ১৯৭১ সালের আগে ছিলেন, কিশোরগঞ্জের একটি থানার সমবায় অফিসার। কিন্তু দেশের ডাকে চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে যোগ দিলেন যুদ্ধে। দায়িত্ব নিলেন নেত্রকোনার যুদ্ধকালীন সময়ের প্লাটুন কমান্ডারের।

বাংলা ট্রিবিউনকে যুদ্ধজয়ের গল্প শোনানো সময় নূরুল হুদা আক্ষেপ করে বলেন, ‘স্বপ্ন দেখেছিলাম একটি  সোনার বাংলার। কিন্তু দীর্ঘ নয় মাস অস্ত্রহাতে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করার পর  একি দেখলাম! এ কোন দেশ, কেমন স্বাধীনতা অর্জিত হলো আমাদের? নিরস্ত্র বাঙালির বুকে যারা যুদ্ধের সময় পাক হানাদারদের অস্ত্র চালাতে সহযোগিতা করেছিল, তারাই আবার ক্ষমতার আসনে অধিষ্ঠিত। তাদের গাড়িতে আমার ভাইয়ের বুকের তাজা রক্তে অর্জিত লাল-সবুজ পতাকা ওড়ে। আর মুক্তিকামী মানুষের অতন্দ্র প্রহরীরা পেলেন শুধুই অবহেলা।’ 

একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. নূরুল হুদার জন্ম ১৯৪৮ সালে নেত্রকোনা জেলার আটপাড়া উপজেলার চারগাতীয়া গ্রামের মৌলভী আফতাব উদ্দিনের পরিবারে।  তিনি মা-বাবার প্রথম ছেলে। চারাগাতীয়া উপজেলার তেলীগাতি ডিগ্রি কলেজ থেকে বিএ পাস করে কিশোরগঞ্জ থানা সমবায় কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন। যোগ দেওয়ার পরপরই দেশের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। তিনি বসে থাকার পাত্র নন।  দেশের টানে ঝাঁপিয়ে পড়েন মুক্তির সংগ্রামে। সরকারি চাকরি ছাড়ার পর সোজা চলে গেলেন ভারতের তোড়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে। সেখান থেকে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ শেষে কাজী আলম কোম্পানির অধীনে প্লাটুন কমান্ডার হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন।

এই প্রসঙ্গে এবার তার মুখেই শুনি—‘নেত্রকোনা জেলার মদন উপজেলায় পাক হানাদারদের সঙ্গে প্রায় ৩১ ঘণ্টা যুদ্ধ করার পর পাকবাহিনী পিছু হটে। প্রথম যুদ্ধেই এই বিজয় অনেক সাহস আর শক্তি জোগায় আমাদের মনে। এই যুদ্ধে একজন মুক্তিযুদ্ধা শহীদ হন। আহত হন আরও ১৭ জন। আর পাকিস্তানি শত্রুদের মধ্যে মেজর আব্দুস সালামসহ প্রায় ১৩০ জন নিহত হন।  আমরা ৪ প্লাটুনে বিভক্ত হয়ে যুদ্ধ করি। পার্শ্ববর্তী জেলার রাজাপুর, ধর্মপাশা, তাড়াইল, নীলগঞ্জ, কিশোরগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে সম্মুখ সমরে অংশ নিই।’

রণাঙ্গনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে নূরুল হুদা বলেন,  অক্টোবরের শেষ দিকে দেশ স্বাধীন হওয়াটা কেমন যেন হতাশায় পরিণত হচ্ছিল। পুরো কোম্পানিই যেন ছিন্নভিন্ন গিয়েছিল। গোলাবারুদ শেষ, অস্ত্রসংকট। সবার মাঝে কেমন যেন হতাশার ছাপ। তবু ছাড় দেব না পাকসেনাদের, এমন প্রত্যয় ছিল আমাদের। এরই মাঝে হঠাৎ একটি আশার আলো নিয়ে আসলেন সাফাত আহম্মেদ খান তার গোলন্দাজ বাহিনী নিয়ে। ক্যাপ্টেন হামিদের নেতৃত্বে আবার সংগঠিত হয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ি আমরা। এদিকে, একের পর এক স্বাধীন হতে থাকে দেশের বিভিন্ন জেলা। ’

যুদ্ধজয়ের গল্প বলতে বলতে আক্ষেপের সুরও ভেসে ওঠে প্লাটুন কমান্ডার নূরুল হুদার কণ্ঠে। বলেন, ‘বুকের তাজা রক্ত দিয়ে দেশ স্বাধীন করার জন্য মরণপণ লড়াই করলাম। যুদ্ধশেষে কী পেলাম আমরা? স্বাধীনতার পর স্বাধীন রাষ্ট্রের মানুষের কাছে শুধু অবহেলা। আমি যুদ্ধ শেষ করে আবার চাকরিতে যোগদান করি। এরপর ৩৬ বছরের চাকরিজীবনে ৪২ বার বদলি করা হয়েছে আমাকে। আমার মুক্তিযোদ্ধা ভাইয়েরা সচিবালয়ে প্রবেশ করলে মূল্যায়ণ পান না। অনেক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা এখন অনেক ক্ষমতাশালী। তাদের দাপটে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা আজ অবহেলিত। এ জন্যই কি যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম?

মো. নূরুল হুদা ও রেহানা সুলতানা দম্পতির দুই মেয়ে। বড় মেয়ে রেজিয়া সুলতানা ও ছোট মেয়ে ফৌজিয়া সুলতানা। নূরুল হুদার দাবি, সরকার যেন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করে। প্রকৃত যোদ্ধাদের মূল্যায়ন করে। তাহলেই লাখো শহীদের রক্তে অর্জিত স্বাধীনতার সম্মান রক্ষা পাবে। তিনি বলেন, ‘আমরা মুক্তিযোদ্ধারা কেবল মৃত্যুর পর স্যালুট চাই না, জীবিত থাকতেও  প্রাপ্ত সম্মান চাই। আশা করি, এই সম্মানটুকু নিশ্চিত করবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার।’

/এমএনএইচ/

Global Brand  ad on Bangla Tribune

লাইভ

IPDC  ad on bangla Tribune
টপ