behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

পরীক্ষা শেষ হতেই একদৌড়ে যুদ্ধে

রশিদ আল রুহানী০৬:৫৩, ডিসেম্বর ০৩, ২০১৫

মুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দিন আহমেদমহিউদ্দিন আহমেদ। জন্ম ফরিদপুরে হলেও নিজের গ্রাম মাদারীপুরের শিবচর। ১৯৭১ সালে ১৫ বছরের উদ্দাম কিশোর। দেশ স্বাধীনের একবুক স্বপ্ন নিয়ে মেট্রিক পরীক্ষা শেষ করার পরদিনই সতীর্থদের সঙ্গে চলে যান যুদ্ধে। বাবার নিষেধ অমান্য করেই!

যুদ্ধের পর স্বাধীন দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে বেছে নেন শিক্ষকতা পেশা। যুদ্ধের ময়দানে যেমন ধরেছেন অস্ত্র, যুদ্ধ শেষে সেই হাতে ধরেছেন কলম। তবে যে স্বপ্ন দেখেছিলেন দেশকে নিয়ে, তা স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরও বাস্তবায়ন হয়নি। মনে আক্ষেপ অনেক।

১৯৭৩ সাল থেকেই ঢাকায় আছেন মহিউদ্দিন। পুরান ঢাকার লালবাগের ঐতিহ্যবাহী ‘ওয়েস্ট এন্ড হাইস্কুলে শিক্ষকতা করেছেন চার যুগ ধরে। বয়স ৬০ পার হয়েছে। এখন পুরান ঢাকার একটি ভাড়া বাসায় অলস সময় কাটান। দিন গুনছেন কবে বেসরকারি চাকরিজীবী মুক্তিযোদ্ধাদের চাকরির বয়স ৬৫ বছর করা হবে। হলেই আবার ছুটে যাবেন স্কুলে। ছোট ছেলে মেয়েদের পড়াবেন আর শোনাবেন যুদ্ধের গল্প।

মহিউদ্দিন আহমেদ

যুদ্ধের গল্প শুনতে চাইলে মহিউদ্দিন বলেন, ‘তখন বয়স ছিল কম। তারপরও এটুকু বুঝতাম- ‘আমার দেশ, আমি এই দেশের শীতল বাতাসের শীতল নিঃশ্বাস নিতে চাই। এই বাতাসকে আপন করে পেতে চাই। স্বাধীন হতে চাই, শান্তিতে ঘুমোতে চাই। কিন্তু সেই শান্তি হাতছাড়া হয়ে যাবে মানতে পারিনি। তাই জয়ের নেশা আমাকে যুদ্ধে যাবার প্রেরণা দিয়েছিল।’

‘মেট্রিকের শেষ পরীক্ষার আগের দিনই পরীক্ষা কেন্দ্রে বোমা পড়ে। তাছাড়া পরীক্ষার মধ্যে এলাকার বড় ভাই ও বন্ধুরা মিলে পরিকল্পনা করি ভারতে গিয়ে ট্রেনিং নেব এবং দেশে ফিরে যুদ্ধ করব। পরীক্ষা শেষ হবার পরদিনই আমার নেতৃত্বে প্রায় ৪০-৫০ জন ভারতে যায় ট্রেনিংয়ের জন্য। চার মাস ট্রেনিং নিয়ে অক্টোবরে দেশে ফিরে যশোর থেকে যুদ্ধ শুরু করি। বাবার পাট বিক্রির টাকা নিয়ে ভারতে গিয়েছিলাম।’

পরিবার থেকে বাধা ছিল?

‘পাকিস্তানিরা জুট মিলে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছিল। বিভিন্ন কল-কারখানা বন্ধ করে দিচ্ছিল। আমি আব্বাকে বললাম ঘরে যত পাট আছে সব বিক্রি করে টাকা ঘরে রেখে দিতে। আব্বা বুঝতে পেরেছিলেন আমি যুদ্ধে যাব। তিনি যেতে দিতে চাইলেন না। আমি ৪৫ মণ পাট নৌকায় নিয়ে বাজারে নিয়ে বিক্রি করলাম। তখন পাটের মন ছিল ৪৫ টাকা। আর সেই পাট বিক্রির টাকা নিয়ে একটা বড় নৌকা ভাড়া করে আমি এলাকার বড় ভাই ও বন্ধুদের নিয়ে বাড়ি থেকে বিদায় নেবার আগে নদীর পাড়ে তাদের রেখে একা বাড়িতে গেলাম। ভেবেছিলাম আব্বার সাথে কথা বলে যাব আর মা ভাত রান্না করছে সেই ভাত খেয়ে যাব। কিন্তু আব্বা যেতে দিবে না, লাঠি নিয়ে গেটে দাঁড়িয়ে ছিল। আব্বার ভয়ে লুকিয়ে পড়ি। এদিকে নদীর পাড়ে আমার জন্য সবাই অপেক্ষা করছিল। আমার কাছে সব টাকা। আমি না গেলে তারাও যেতে পারবে না। মাকে বললাম তাড়াতাড়ি ভাত দিতে। আমি খেয়েই চলে যাব। মা বললো, ‘ভাত হয়নি’। মাকে বললাম কাঁচা ভাতই দিতে। সেই ভাত দুই প্লেটের মাঝে রেখে মাড় ঝরিয়ে চিংড়ি ভুনা দিয়ে খেয়েই চলে গেলাম। কিছু কাপড় গুছিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু নিতে পারলাম না আব্বার ভয়ে।

বলতে বলতে দু-চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারলেন না মুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দিন আহমেদ।

মুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দিন আহমেদ

পানি মুছতে মুছতে আবার বললেন, ‘আমার যেতে দেরি দেখে আমার বন্ধুরা আমাকে কয়েকবার ডাক দিয়েছে। কিন্তু বেশিক্ষণ ডাকতে পারেনি কারণ আমার বাড়ির পাশেই মুসলিম লীগের এক চেয়ারম্যানের বাড়ি। সে জেনে গেলে সমস্যা্ হবে।

পরে নদীর পাড়ে গিয়ে দেখি আমাকে রেখেই তারা চলে গেছে। একটি ভিক্ষুকের নৌকা দেখতে পেয়ে তাকে বললাম, কত ভিক্ষা পেয়েছো? সে বললো, আধা কেজি চাউল আর চার-পাঁচ আনা পয়সা। তাকে বললাম, তোমাকে আমি ১০ টাকা দেব আমাকে ওই গ্রামে রেখে এসো। তার নৌকাটি ফুটো ছিল। আমি নিজেই নৌকা চালিয়ে দ্রুত গেলাম। গিয়ে সবাইকে পাই। আমাকে পেয়ে সবাই অনেক খুশি হয়েছিল। পরে সবাই মিলে গেলাম ভারতে। ’

তারপর?

‘ভারতে যাবার পরে বারাকপুরের একটি ক্যাম্পে একমাস আমাদের রেখেছিল। পরে সেখান থেকে অনেককেই ট্রেনিং-এর জন্য বাছাই করা হলো। কিন্তু একদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের বড় বোনের বড় ছেলে ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরী আমাদের জানালেন এত মানুষকে ট্রেনিং দেওয়া সম্ভব না। তখন তিনি আমাদের একটা বুদ্ধি দিলেন। তিনি বললেন, একজন শ্রমিক নেতা আব্দুল মান্নান আসবেন শ্রমিকদের ট্রেনিং দিতে। তখন তোমরা নিজেদের শ্রমিক বলে পরিচয় দেবে। শ্রমিক বলে পরিচয় দেওয়ার পরেই আমরা ট্রেনিং এর জন্য সিলেক্টেড হই।’

তারপর কলকাতায় প্রাথমিক শারীরিক প্রশিক্ষণ করায় প্রায় দেড় মাস। পরে বিহারে অস্ত্র দিয়ে ২৮ দিন প্রশিক্ষণ করায়। পরে অক্টোবরে দেশে এসে যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকেই প্রথম যুদ্ধ শুরু করি নভেম্বর মাসে।

যুদ্ধে সাহসী অভিযান ছিল কোনটি?

আমি মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আব্দুল ওহাবের নেতৃত্বে যুদ্ধ করেছিলাম। প্রথম অভিযানেই দশটির মধ্যে ৯টি গুলি খরচ করেছিলাম। আমি অনেক সাহসী ছিলাম। প্রতিটি যুদ্ধেই আমি অনেক সাহসী অভিযান চালিয়েছিলাম। যশোর ক্যান্টনমেন্ট মুক্ত করার পরে আমরা ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজে দুই দিন অবস্থান করি। পরে ঝিনাইদহ পার করে মাগুরায় সবচেয়ে বড় অভিযান চালিয়েছিলাম। ওখানে একজন পীর ছিল যে মুসলিম লীগের রাজাকার। তার বাড়ি ঘেরাও দিতে অনেক কষ্ট হয়েছিল। এই যুদ্ধ ছিল অনেক ভয়ংকর। সেখানে পাকিস্তানি আর্মি ছিল আনুমাণিক অর্ধশত। তারা  ছিল শক্তিশালী। সে তুলনায় আমাদের কিছুই ছিল না তবে সংখ্যায় আমরা বেশি ছিলাম। প্রায় এক’শ জনের বেশি ছিলাম। প্রায় ৬ ঘণ্টার ওপরে সরাসরি গুলি বিনিময় চলে আমাদের। পরে তারা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় তারা। এই যুদ্ধে কেউ শহীদ হয়নি তবে আহত হয়েছিলেন কয়েকজন। আমি সেখান থেকেই হাতে গুলি লেগে আহত হই। তবে সামান্য। একটু অপরাশেন করে ব্যান্ডেজ দিয়ে রাখি। পরে ওষুধ খাওয়ার পরে সেরে যায়।

কোনও স্মরণীয় ঘটনা?

একবার একটি নৌকায় আমাদের ৪৯ জনের ওপর হামলা হয়েছিল। গুলি লেগে নৌকা ফুটো হয়ে মাঝনদীতে নৌকা ডুবে গিয়েছিল। সেখানে কয়েকজন মারা গিয়েছিল। আমিসহ আরও অনেকেই পাড়ে উঠতে পেরিছিলাম। কিন্তু তাদের মধ্যে অনেকেই পায়ে হেঁটে লুকিয়ে বাড়িতে চলে আসে। এসে আমার আব্বা-মাকে বলেছিল আমি নাকি শহীদ হয়েছি। আমার আব্বা-মা আমার জন্য কাঁদতে কাঁদতে পাগলের মতো হয়ে যায়। আমি মারা গেছি ভেবে আমার আত্মীয়-স্বজনরা আমার জন্য অনেক দোয়া করতো। কিন্তু দেশ যেদিন স্বাধীন হয় সেদিনই আমি বাড়ি ফিরি। আমাকে দেখে সবার সে কী খুশি। ওই দিনটি ছিল আমার জন্য অন্যতম একটি দিন।  

 

যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছেন, এখনকার অনুভূতি কেমন?

যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি। সে অনুভূতির কথা বলে বোঝানো সম্ভব না। নিজের রক্তের বিনিময়ে দেশটি পেয়েছি নিজের করে খুব ভালো লাগতো। অহংকার করি, গর্ব হয় আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। দেশে এখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে কিন্তু অনেক আগেই হবার দরকার ছিল। আমরা এতে অনেক খুশি। আর চাই এই বিচার যেন অতি দ্রুত শেষ করা হয়। না হলে এরা আবারও ষড়যন্ত্র করবে।

এসবের সঙ্গে সঙ্গে কিছু আক্ষেপও আছে। যে স্বপ্ন নিয়ে দেশের জন্য যুদ্ধ করেছিলাম তা পূরণ হয়নি আজও। এখন মানুষের জীবনের কোনও নিরাপত্তা নেই। মানুষের মনে হাহাকার। দেশ স্বাধীন করেছি কিন্তু এমন হাহাকার দেখতে চাইনি কখনও। যুদ্ধের আগে এতটা হাহাকার ছিল না। দেশের মানুষ তখনকার তুলনায় এখন অনেক অশান্তিতে রয়েছে। তবে আশা করি দ্রুত পরিবর্তন হবে।

ছবি:  আশিকুল ইসলাম

/আরএআর/এফএ/

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ