চামড়ার নিচে মাংস নেই একফোঁটা, ফিসফিসিয়ে বলে জয় বাংলা

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ১৫:৫৬, ডিসেম্বর ০৩, ২০১৫ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:৪১, ডিসেম্বর ১৭, ২০১৫

রোকেয়া কবীরমুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নারীরা কখনও গেরিলা যুদ্ধে, কখনও সম্মুখযুদ্ধে, কখনও সেবিকা হিসেবে, কখনওবা বার্তাবাহক হিসেবে অমূল্য অবদান রেখেছেন। কিন্তু তাদের অভিযোগ- এখনও নারীদের কথা আসলে কেবল নির্যাতনের শিকার নারী বা শহীদ জায়া জননীর বিষয়গুলোই আসে। মুক্তিযুদ্ধে তাদের ভূমিকা জনসম্মুখে আসে না। নারীনেত্রী রোকেয়া কবীর মুক্তিযুদ্ধের সাত মাস শরণার্থী শিবিরে কাজ করেছেন, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা দেশে প্রবেশের আগে তাদের রাজনৈতিক দীক্ষা দিয়েছেন তিনি। যুদ্ধকালীন ক্যাম্প ও প্রশিক্ষণ ক্যাম্পগুলোতেও গান গেয়ে, কবিতা পড়ে, মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসও জুগিয়েছেন, আবার আগরতলা ক্যাম্পে নারী মুক্তিযোদ্ধাদের বিশেষ বাহিনী গঠন করা হলে প্লাটুন কমান্ডারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন রোকেয়া। ক্যাম্পে যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহারসহ গেরিলা প্রশিক্ষণ নেন। মুক্তিযুদ্ধের পর ক্রাফট হোস্টেলে থেকে যুদ্ধকালীন ক্যাম্পগুলোতে আশ্রিত ছেলেমেয়েদের জন্য স্কুল পরিচালনা এবং গান্ধীবল্লভ (জিবি) হাসপাতালে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের নার্সিংয়ের দায়িত্ব পালন করেন। এসব কাজে তার সঙ্গে সক্রিয় ছিলেন ফৌজিয়া মোসলেম, মতিয়া চৌধুরী, আয়শা খানম প্রমুখ। যুদ্ধের সেইসব দিনগুলো নিয়ে রোকেয়া কবীর কথা বলেছেন বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে।

মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতির সময়টা কেমন ছিল?

৬২’তে যখন স্কুলের ছাত্রী তখনই মিছিল মিটিং-এ যেতাম। সেটা ছিল নিয়ম ভেঙে কিছু একটা করার উত্তেজনা। এরপর ৬৫ থেকে ৬৯-এর আন্দোলনে সক্রিয় ছিলাম ছাত্র ইউনিয়নের সাথে। এরপর ১৯৭১-এর ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় শুরু হয় যুদ্ধের প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণ। এতে অংশ নিয়েছিলাম আমরা অনেকে। মেয়েরা দলে দলে যোগ দেয়। বাংলার দামাল মেয়েদের সশস্ত্র মার্চপাস্টের এই দলে তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়ন নেত্রী কাজী রোকেয়া সুলতানা রাকা, ডা. নেলি, আয়শা খানম, তাজিম সুলতানা, কাজী মমতা খানম, রওশন আরা, নাজমা বেগম চুনী, জিয়াউন নাহার রোজী, বেবী মওদুদসহ অনেকেই ছিলেন।

১ মার্চ যখন জাতীয় সংসদের বৈঠক বাতিল হলো আমরা সব রাস্তায় নামলাম। তখন বোঝা গেল সশস্ত্র সংগ্রামর মধ্য দিয়েই যেতে হবে, আর কোনও উপায় নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে ডামি রাইফেল নিয়ে (কাঠের) আমরা প্রতিদিন সকালে প্রশিক্ষণ নেওয়া শুরু করি যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে। সেখানে মার্চপাস্ট থেকে শুরু করে রোলিং, রেকি সবই শিখলাম। এরপর পার্টির সিদ্ধান্তে দেশের মানুষের কাছে বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য ৮/১০দিন পর আমরা ঢাকার রাস্তায় প্রদর্শনীমূলক মার্চপাস্ট করলাম।

 

নারী মুক্তিযোদ্ধা

 

এটার মধ্য দিয়ে জাতি একটা ইঙ্গিত পেয়েছিল যে যুদ্ধ করতে হবে। আর তার সাথে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সেই জ্বালাময়ী ভাষণ ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। যুদ্ধ একরকম শুরু হয়ে গেল।

 

এরপর?

এরপর ঢাকায় পাড়ায় পাড়ায়, রংপুর, যশোর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, পাবনাসহ নানা জায়গায় ছেলেমেয়েরা যাতে প্রস্তুতি নিতে পারে সে ব্যবস্থা করে দেওয়া হলো। এটা করতে করতেই ২৫ মার্চ চলে এলো। আমরা তখন কলাবাগানে। আমরা ভেবেছিলাম সেনারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এলাকায় আক্রমণে গেলে এ রাস্তা ব্যবহার করতে পারে। আমরা রাস্তাজুড়ে ব্যারিকেড দেই। আমাদের সাথে আমার বোন মনিরা আক্তার এবং ওই পাড়ার সাধারণ জনগণ ছিল। পার্টি থেকেই ১৩ তারিখের পর হলে না থাকার নির্দেশ ছিল বলে আমরা কলাবাগানে ভাইয়ের বাসায় থাকতাম। ২৫ মার্চ সন্ধ্যা থেকে বেরিকেড দিয়ে কলাবাগানে দাঁড়ানো আমরা। যখন ১১টা বাজে তখন অন্যরা বললো, আপা রাত হইসে, আপনারা চলে যান, আমরা থাকি।

নারী মুক্তিযোদ্ধা-১

সেই রাতে যা ঘটার তাতো ঘটলোই। এরপর আমাদের থাকার জায়গা অনিরাপদ হয়ে গেল। সকালে এক বাসা তো বিকেলে আরেক বাসা। এরই মধ্যে ২৭ মার্চ আমরা দুই বোন বের হয়ে রোকেয়া হলের দিকে গেলাম। জগন্নাথ হল দেখে মেডিক্যাল কলেজে গেলাম। কেন সেসময় বের হয়েছি সেজন্য বকাবকি খেতে হলো সহযোদ্ধাদের কাছে। পার্টির লোকজন বলল বাসায় যাও, পরবর্তী নির্দেশ দেওয়া হবে। ওই কয়দিন ড. নার্গিসের বাসায় থাকলাম। পরে আমরা ৩১ মার্চ ঢাকা থেকে নৌকাযোগে কাপাসিয়ায় মতিউর রহমানের (প্রথম আলো সম্পাদক) নানার বাসার উদ্দেশে রওনা হলাম। নৌকাতেই দেখা হয়ে গেল মতিয়া চৌধুরী, বজলুর রহমান, ড. সারোয়ার আলী, রত্না আপাসহ আরও পরিচিত মুখের সাখে। ওখান থেকে এক দুইজন করে সুযোগ বুঝে আগারতলার দিকে যেতে শুরু করলাম।

আমি গেরিলা যুদ্ধের জন্য অযোগ্য ঘোষিত হলাম। একমাত্র কারণ ঢাকায় ডামি রাইফেল নিয়ে করা সেই মিছিলের ছবি। আমি ওটাতে নেতৃত্ব দিয়েছি, সবার প্রথমে আমার ছবি। সবাই চিনে ফেলবে। এমনকি দেশে বা দেশ থেকে বের হওয়ার পথে আমি কোনও যানবাহনে চড়তে পারিনি। নৌকায় লুকিয়ে থেকেছি, আলপথে হেঁটে গেছি।

সেখানে কবে পৌঁছালেন?

অন্যরা চলে গিয়েছিল।পক্স হওয়ায় একটা মাস আমাকে সেখানেই থাকতে হয়েছিল। সেখানে থাকা অবস্থায় পার্টি থেকে চিরকুট পেয়ে শ্রমিক নেতা সহিদুল্লাহ ভাইয়ের সঙ্গে কসবা সীমান্ত দিয়ে আগরতলায় ক্রাফট হোস্টেল ক্যাম্পে পৌঁছালাম ৪ মে।

ওখানে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করে প্রশিক্ষণে পাঠানো হতো। প্রশিক্ষণ নিয়ে ফিরে এসে দলে দলে দেশেও ঢুকছে। আমি গেরিলা যুদ্ধের জন্য অযোগ্য ঘোষিত হলাম। তার একমাত্র কারণ ঢাকায় ডামি রাইফেল নিয়ে করা সেই মিছিলের ছবি। আমি ওটাতে নেতৃত্ব দিয়েছি, সবার প্রথমে আমার ছবি। সবাই চিনে ফেলবে। এমনকি দেশে বা দেশ থেকে বের হওয়ার পথে আমি কোনও যানবাহনে চড়তে পারিনি। নৌকায় লুকিয়ে থেকেছি, আলপথে হেঁটে গেছি।

এই মুখ চেনার কারণে যখন গেরিলা প্রশিক্ষণ নিয়েও যুদ্ধক্ষেত্রে যেতে পারলাম না তখন আমি মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করার, সংগঠনের সাংগাঠনিক দায়িত্ব পালন করা, শরণার্থী শিবিরে গিয়ে যুবকদের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত করে তোলার কাজটা করা এবং যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা ও সম্ভাব্য শঙ্কার জায়গাগুলো নিয়ে তাদের উদ্বুদ্ধ করতাম। আবার তারা অস্ত্র প্রশিক্ষণ নিয়ে ফিরে আসার পর তাদের সাথে আলাপ করতে হতো নানা পদ্ধতিগত দিকগুলো নিয়ে। দেশে পাঠানোর আগে তাদের রাজনৈতিক শিক্ষা দেওয়া হতো।

নারী মুক্তিযোদ্ধা-২

 

অস্থায়ী হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক পাওয়া যেত, কিন্তু নার্সের অভাব ছিল। বিভিন্ন ক্যাম্প থেকে নারীদের এনে, যারা হয়তো সশস্ত্র যুদ্ধে যাবে না কিন্তু এখানে কাজ করতে পারে তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার কাজটাও আমরা করতাম। এসময় কমিউনিস্ট পার্টি ন্যাপ মিলে যৌথ কমান্ডে ক্যাম্পে লাইব্রেরি করার সিদ্ধান্ত হয়। কারণ আমরা তখনও জানি না এত তাড়াতাড়ি স্বাধীন হবে। আমরা ভিয়েতনামের যুদ্ধ মাথায় রেখে এগুচ্ছি। সেক্ষেত্রে ছেলেমেয়েরা যেন মুর্খ না থাকে, শিক্ষা পায় সেজন্য ক্লাস ফোর থেকে নাইন পর্যন্ত ইংরেজি বাংলা অংক ইতিহাস ভূগোল পড়াতাম। সেটার জন্য শরণার্থী শিবিরে শিবিরে শিক্ষক খুঁজে বের করার ব্যবস্থা করা হলো।

আগরতলার সাধারণ মানুষ আমাদের পক্ষে ছিলেন। আমাদের দেখলেই বলত জয় বাংলার লোক। অনেক সহায়তা করেছে। কিন্তু একটা দিনের কথা মনে পড়ে। শেষের দিকে যুদ্ধ তখন। একদিন হঠাৎ আগরতলায় কয়েকটা বোমা পড়ে এবং দুইজন লোক মারা যায়। তাদের মানুষ যখন মারা গেল তখন আচরণ একটু বৈরি হয়েছিল। সাধারণ মানুষতো তাদের নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবছিল।

 

অস্থায়ী হাসপাতালে কী ধরনের যুদ্ধাহত পেয়েছিলেন?

কেবল তো যুদ্ধাহতরা আসতো তা নয়। সেসময় কিভাবে যে কলেরা ছড়িয়ে পড়েছিল তা যদি দেখতেন। গোবিন্দবল্লভ হাসপাতালে কেবল যুদ্ধহত নয়, বয়স্করাও ছিল। দিনের পর দিন না খেয়ে অসুস্থ হয়ে গেছে তারা। যুদ্ধাহতদের ক্ষেত্রে গুলি আর গ্রেনেডের আঘাত ছিল বেশি।
 

মুক্তিযুদ্ধের ছবি

 

দেশে ফিরলেন কখন?

সেদিন ২৪ ডিসেম্বর। চারিদিকে জয় বাংলা। দেশে ঢুকে বোঝার চেষ্টা করলাম। কারণ আমরা ছিলাম না। শত্রুমুক্ত হওয়ার পর কী অবস্থায় আছে সেটা বুঝে নিতে হবে। অন্যরকম সাহসী লাগতো নিজেদের। এখন দেশগড়ার স্বপ্ন, বাকিসব হতাশা শেষ। যে সুযোগ বাঙালিকে দেওয়া হতো না সেই জায়গাগুলোয় এখন কেবলই আমরাই। কত স্বপ্ন। কিন্তু তখনও অনেকের হাতে অস্ত্র। অনেকেই বিজয়ের পরদিন নানাখানে পড়ে থাকা অস্ত্র হাতে নিয়ে রাতারাতি মুক্তিযোদ্ধা হয়ে গেছে সেটাও দেখেছি।

৭১’এ কত নারী কোলে বাচ্চা নিয়ে হাঁটছে মাইলের পর মাইল। একদিন দুইদিন না। মাসের পর মাস তারা থাকার জায়গা পাননি। পথে যেতে যেতে তাদের সাথে আলাপ করেছি। এই যে হাঁটছেন, আগে কখনও বাড়ির বাইরে গেছেন? এক নারী কোলে শিশু নিয়ে বলেছে, বাইরে আসা দূরে থাক বাড়িতেও বাইরের কোনও পুরুষের সাথে কথা বলিনি। বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে, পুরা গ্রাম পালিয়ে গেছে। আমিও যাচ্ছি। কোথায় যাচ্ছি জানি না। সেইসব কথা যখন মনে হয়, তখন মনে হয় যারা এই কাজে পাকিস্তানি সেনাদের সহায়তা করেছিল তাদের নিশ্চিহ্ন না করে শান্তি নেই। বিশ্বাস করবে না কেউ সে নারীর চেহারা আমি আজও ভুলিনি। কেউ বললে আমি স্কেচ বানাতে প্রতিটা রেখার চিহ্ন জানাতে পারবো।

এটা বলতে বলতে মুখ কুঁচকে আসে রোকেয়া কবীরের। বলেন, কাপাশিয়ার পিরোজপুর থেকে ভারতে যাওয়ার পথে টানা যেতে পারিনি। অনেকগুলো সাধারণ কৃষকের বাড়িতে রাত কাটিয়ে যেতে হয়েছে। যুদ্ধশেষে ফিরে এসে প্রত্যেকের খোঁজ নিতে গিয়েছি বাড়ি বাড়ি। কাউকে পাইনি। একজনকেও না। হয়তো তারা বেঁচে আছেন। কিংবা মারা গেছেন। এই যে চেনা মানুষদের না পাওয়ার কষ্ট সেটা ভোলার না কোনদিন। এই না ভোলার তালিকায় তিনি যোগ দেন বাপ্পা মজুমদারের বোনের কথাও।

চোখে অদ্ভুত মলিনতা আর স্মৃতি হাতড়ে ক্লান্ত রোকেয়া বলেন, বাপ্পা মজুমদারের মা যখন আমাদের ক্যাম্পে পৌঁছেছিলেন তখন তিনি ভেঙে পড়েছেন। কারণ রাস্তায় কোনও এক জায়গায় তার হাত থেকে মেয়ের হাত ছুটে যাওয়ার পর মেয়েকে আর পাননি।

কী যে হয়েছিল মানুষের অবস্থা। হাঁটতে হাঁটতে পথ চেনে না আগরতলা চলে এসেছে, দিনের পর দিন পানি খেয়ে থেকেছে, খেতে পায়নি এক দলা ভাত, আমরা ইনজেকশন দিতে গিয়ে দেখি চামড়ার নিচে মাংস নেই একফোঁটা। কিন্তু ফিসফিসিয়ে বলে জয় বাংলা। মানুষের মনে এত আবেগ আমি আর দেখিনি।

 

/এফএ/

লাইভ

টপ