behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

‌'এখন যুদ্ধ নদীর সঙ্গে'

এস এম সামছুর রহমান, বাগেরহাট০৫:৫৮, ডিসেম্বর ০৪, ২০১৫

মেহেরুন নেছা মীরা‘পাকিস্তানি হানাদার ও দেশীয় রাজাকারদের সঙ্গে সশস্ত্র যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছিলাম, আর এখন ভৈরব নদীর সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে বেঁচে আছি। দেশের জন্য জীবন-যৌবন সব বিলিয়ে দিয়েছিলাম, কিন্তু বিনিময়ে কী পেলাম।’ বাগেরহাট শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ভৈরব নদীর পাড়ে জরাজীর্ণ কুটিরে গিয়ে কেমন আছেন জিজ্ঞাসা করতে আবেগজড়িত কণ্ঠে এ কথাগুলো বলেন মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া সশস্ত্র নারী মুক্তিযোদ্ধা মেহেরুন নেছা। সবাই তাকে চেনে মীরা নামে।

বাগেরহাট শহরের সরুই এলাকার মৃত তাছেন উদ্দিন শেখের মেয়ে মেহেরুন নেছা মীরা। বর্তমানে বাগেরহাট কাঁচা বাজারের শহর রক্ষা বাঁধে সবজি বিক্রি করে কোনও রকমে জীবন ধারণ করেন তিনি।

মুক্তিযোদ্ধা মেহেরুন নেছা মীরার বসত বাড়ি

তার যুদ্ধ সময়ের গল্প শুনতে চাই জানালে প্রথমে খানিকটা বিরক্ত হন তিনি। ‘কী আর হবে এসব শুনে’ বললেও চেহারার মধ্যে যেন শিহরণ খেলে যায় এই প্রৌঢ়ার।এরপর কয়েক মুহুর্তের জন্য চোখ বুজে ফেলা। যেন বন্ধ চোখের আয়নায় সেই সময়টাকে ফিরিয়ে আনার প্রস্ততি।চোখ না মেলেই তিনি শুরু করলেন যুদ্ধ সময়ের গল্প...

‘মুক্তিযুদ্ধ কাকে বলে বুঝতাম না। অভাবী মানুষ ছিলাম আমরা। মায়ের সাথে মানুষের বাড়িতে কাজ করতাম। একদিন ওয়াপদার বড় সাহেবের বাড়িতে কাজ করে ভাত নিয়ে বাড়ি ফিরছি। এসময় দেখা হলো কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা আর তাদের কয়েকজন এই দেশি দোসরের সাথে। তারা জিজ্ঞেস করল কে তুমি ?’ উর্দু ভাষা জানতাম। উর্দুতেই নাম বললাম। ওরা খুশি হল। পরের দিন বিকালে আমাদের বাসায় হাজির হলো কয়েকজন পাকিস্তানি। ওরা মাকে বাগেরহাট শহরের রাজাকার ক্যাম্পের ভেতর কাজ করতে বললো। মা তাদের কথা শুনতে বাধ্য হলো। সেই সুযোগে আমিও রাজাকার ক্যাম্পে অবাধে যাওয়া-আসা করতাম।’

মুক্তিযোদ্ধাদের পরামর্শে রাজাকার মজিদ কসাইকে হত্যার পরিকল্পনা করি।  কিন্তু বিধি বাম। হত্যার ষড়যন্ত্র জেনে যায় মজিদ কসাই। আমাকে আটকে ফেলে রাজাকাররা। এরপর শুরু হয় অমানুষিক নির্যাতন। দিনের বেলায় হাতে পায়ে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হতো। নানা ধরনের অপমানজনক কাজ করত ওরা...

 

এবার চোখ খুলে সরাসরি কথা বলেন মীরা। ‘স্থানীয় কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা যখন জানতে পারলো যে আমি ওই রাজাকার ক্যাম্পের ভেতরে যাই তারা তখন আমাকে বললো ওইখানে কী কী হয় সেসব কথা জানাতে। প্রথমে ভাবছিলাম যারটা খাই পরি তার কথা কেন অন্যজনকে বলবো। কিন্তু, ওই ক্যাম্পে বিভিন্ন জায়গা থেকে মেয়েদের ধরে এনে নষ্ট করা হতো, নানারকম অত্যাচার করা হতো। এসব আমার ভালো লাগতো না। এসব কথা যখন মুক্তিযোদ্ধারা জানতে চায় তখন আমি তাদের সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নেই। মনে মনে বলি, যেভাবেই হোক এসব নরপশুর শাস্তি দিতে হবে।’

একটু থেমে মীরা বলেন, ‘সেই থেকে শুরু। প্রতিদিন মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে তথ্য দেওয়া শুরু করি। বাগেরহাটের তখন রাজাকার রজব আলী ফকিরের ছিল খুব দাপট। এমন কোনও কুকাজ নাই সে করতো না। মুক্তিযোদ্ধারা তার চলাচলের তথ্য জানতে চায় আমার কাছে। আমি ফকিরের চলাচলের একটি নকশা মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে দেই। হঠাৎ একদিন মুক্তিযোদ্ধারা রজব আলী ফকিরের ওপর গুলি চালায়। কিন্তু গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। কোনওমতে বেঁচে যাওয়ার পর  রাজাকার ক্যাম্পের সবাই আমাকে ও মাকে সন্দেহ করা শুরু করে। তারা আমাদের খুঁজতে থাকে। একথা জেনে তাড়াতাড়ি বাবা-মাকে নিয়ে পালিয়ে যাই। তাদের গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে নিজে আত্মগোপন করি।

বাগেরহাটের আরেক কুখ্যাত রাজাকার মজিদ কসাই। এলাকার সুন্দরী মেয়েদের ধরে এনে রাজাকার ক্যাম্পে পাঠাতো সে। এ ঘটনার কিছুদিন পর মুক্তিযোদ্ধাদের পরামর্শে তার বাড়িতে ঝি-এর কাজ করতে যাই। সুকৌশলে মজিদের স্ত্রীকে পটিয়ে কাজ নেই ওই বাড়িতে। কাজের ফাঁকে গোপনে বিভিন্ন তথ্য জেনে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে সরবরাহ করা শুরু করি। অসহায় মেয়েদের ওপর মজিদের নির্যাতন দেখে একসময় আমার ভেতর প্রতিশোধের আগুন জ্বলে ওঠে।

মুক্তিযোদ্ধাদের পরামর্শে রাজাকার মজিদ কসাইকে হত্যার পরিকল্পনা করি।

মীরার ভাষায়, ‘কিন্তু বিধি বাম। হত্যার ষড়যন্ত্র জেনে যায় মজিদ কসাই। আমাকে আটকে ফেলে রাজাকাররা।’

‘এরপর শুরু হয় অমানুষিক নির্যাতন। দিনের বেলায় হাতে পায়ে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হতো। নানা ধরনের অপমানজনক কাজ করত ওরা। কিন্তু মেরে ফেলতে পারেনি।’

নিজ বাড়ির সামনে মুক্তিযোদ্ধা মেহেরুন নেছা মীরা

মীরা বলেন একপর্যায়ে মজিদের হাত থেকে সুকৌশলে পালিয়ে যান তিনি। আশ্রয় নেন মদনের মাঠের মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে। সেদিন রাতে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় পানিঘাট এলাকার ঋষিকেশ নামের একজনের বাড়িতে। সেখান থেকে কেষ্টদের বাড়ি। এখানে ২০/২৫ জন মুক্তিযোদ্ধাকে রান্না করে খাওয়াতেন তিনি। কয়েক দিনের মধ্যে এ ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধার সংখা দাঁড়ায় দেড় থেকে দুইশ’ জনে।

এবার ঝলসে ওঠে প্রৌঢ়া মীরার চোখ। ‘ওই ক্যাম্পে রাইফেল চালানো শিখে ফেলি। হাতবোমা ছুড়তেও পারতাম খুব ভালো। তাহলে কী? নামলাম এবার সত্যিকারের যুদ্ধে। শুরু হলো আমার হানাদারদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ।

স্মৃতির ডানায় ভর করে মীরা তখন চুয়াল্লিশ বছর আগের যুদ্ধের ময়দানে। ‘একদিনের ঘটনা। সাহসপুর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে ৩০/৪০ জন মুক্তিযোদ্ধার সাথে ছিলাম। হঠাৎ সকালে রাজাকাররা চারদিক থেকে ঘিরে ফেলল ওই ক্যাম্পটি। মুক্তিযোদ্ধারাও যুদ্ধের জন্য তৈরি হয়ে বিভিন্ন পাশে অবস্থান নিয়েছে। চারিদিকে গুলি আর বোমার শব্দ। এসময় দেখলাম জীবন বাঁচাতে বাবুর্চিও ক্যাম্প ছেড়ে পালিয়ে গেল। কিন্তু, অস্ত্র গোলা-বারুদ তো হানাদারদের হাতে দেওয়া যাবে না। আমি তখন একাই ক্যাম্পে থাকা গোলবারুদ ও রসদ অনেক কষ্টে একটি নৌকায় তুলি। এরপর নৌকাটি টেনে নিয়ে ঢোকাই ছন বনের ভেতরে। সারাদিন সেখানে একা বসে থাকি। একে সারাদিন খাওয়া হয় নাই তার ওপর প্রচণ্ড শীত। আমি ভয়ে কান্না শুরু করলাম। কোথায় যাব আমি? এসময় দবির নামে এক সহযোদ্ধার দেখা পাই । পরে তার সাথে নৌকা নিয়ে হালি শহরের দিকে গেলে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে দেখা হয়। উঠি গিয়ে হালিশহরে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে।’

মীরা বলে চলেন, ‘রাজাকাররা কয়েকদিন পর হালিশহর ক্যাম্পও ঘিরে ফেলে। চারিদিকে বিকট শব্দ। শত শত বাড়িতে আগুন দিল ওরা।। মুক্তিযোদ্ধারা যার যার অবস্থানে চলে যায়। আমি ছাড়াও আরও দুজন নারী ছিল ওই ক্যাম্পে। আমরা ঠিক করি রাজাকারদের আটকে দিতে হবে। আমরা কয়েকটি বোমা নিয়ে দৌড়াতে থাকি। এরপর সেই বোমাগুলো রাস্তার ওপরে থাকা চার ( ছোট সাঁকো)-এর ওপর ফেলতে থাকি। সাঁকো ভেঙে যাওয়ায় রাজাকারদের আসার সোজা রাস্তা নষ্ট হয়ে যায়।’

‘অনেকক্ষণ দৌড়ানোর পর বিলের ভেতর ছোট্ট একটি বাড়িতে ঢুকি। সেখানে গিয়ে দেখি আশেপাশের আরও ২০/৩০ জন মহিলা ভয়ে কাঁপকাঁপি করছে। তাদের সাহস দেই আমি। মাঝে মাঝে কয়েকটি হাতবোমা নিক্ষেপ করে শত্রুদের ভয় দেখাই। এভাবে দিন চলে যায়। সারা দিন-রাত পেটে দানাপানি পড়ে নাই। তবু ওই বাড়িতেই থাকি সবাই। রাজাকাররা চলে গেলে সবাই উদ্ধার পেয়ে যাই।’ এভাবে একের পর এক যুদ্ধের ঘটনার বর্ণনা দিতে থাকেন তিনি। ৯নং সেক্টরে মেজর তাজুল ইসলামের নেতৃত্বে তিনি যুদ্ধ করেছিলেন বলে জানান।

তিনি বলেন, তার সহযোদ্ধা নবীরুদ্দি, ইসমাইল, মুজিবর রহমান, জব্বারকে ধরে নিয়ে নির্মম ভাবে হত্যা করেছে রাজাকাররা।

তিনি বলেন, ‘ডিসেম্বরে বিজয়ের পর ভাবলাম দেশ স্বাধীন হয়েছে, আর হয়তো আমাদের কষ্ট থাকবে না। বিয়ে হলো এক দিনমজুরের সাথে। ২টি ছেলে ২টি মেয়েকে রেখে স্বামী আমাকে ত্যাগ করে অন্য বিয়ে করে। এরপর আর বিয়ে করি নাই।’

ভীষণ আক্ষেপে বলেন,‘অভাবের কারণে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শেখাতে পারিনি। মেয়ে দুটোর বিয়ে হলেও তাদের স্বামী চলে গেছে। একটি মেয়ে বাজারে চা বিক্রি করে আর একটি কাঁচা তরকারি বিক্রি করে কোনও রকমে চলে। ছেলেরাও অভাবের জন্য মাকে দেখে না।

ঢাকার একজন কর্নেলের চেষ্টায় মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট পেয়েছেন তিনি। এর পর থেকে ভাতাও পান। ভৈরব নদীর পাড়ে ইব্রাহিম হাজীর জমিতে জরাজীর্ণ একটি ঘর তৈরি করে বসবাস করেন। এর আগে ২/৩ বার তার ঘর নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে নদীতে জোয়ার আসলে তার ঘর তলিয়ে যায়। সে কারণে অনেক রাত অবধি জেগে থাকতে হয় জোয়ারের পানি সরে যাওয়ার অপেক্ষায়। শহরের কাঁচাবাজারে তিনি সবজি বিক্রি করে জীবনধারণ করেন।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পর্কে তিনি বলেন, তারা যে অপরাধ করেছে তার সাজা তারা পাচ্ছে। এটা খুবই ভাল হচ্ছে। বাগেরহাটে যে রাজাকার ছিল তাদের এমন বিচার দেখতে পেলে মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মা শান্তি পেত।

তিনি বলেন,‘যখন রাজাকারের গাড়িতে জাতীয় পতাকা দেখেছি, তখন হৃদয়ের ভেতর রক্তক্ষরণ হয়েছে। মনে করেছিলাম আমাদের কষ্টে অর্জিত স্বাধীনতা বুঝি চলে গেল! কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর কিছুটা শান্তি পাচ্ছি।’

মেহেরুন নেছা মীরা আক্ষেপ করে বলেন, ‘বর্তমান সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের পাকা ঘর দিচ্ছে। তবে এসব ঘব পাচ্ছে যাদের টাকা পয়সা আছে তারা। তার টাকা নেই, তাই তিনি এঘরের আশাও করতে পারেন না।’ এখনও কিছু লোক ফায়দা লুটছে। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সব ধরনের সরকারি সহায়তা কোনও সংগঠনের মাধ্যমে না দিয়ে সরাসরি মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে দেওয়ার অনুরোধ জানান।

/টিএন/

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ