behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

আমি শরিফ, পিতা অজ্ঞাত

উদিসা ইসলাম০০:৪৩, ডিসেম্বর ০৫, ২০১৫

.মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া স্বাধীন বাংলাদেশ মুখোমুখি হয় এক প্রশ্নের, ধর্ষণের শিকার যে নারীরা অন্তঃসত্ত্বা হয়েছেন তাদের সন্তানদের কী হবে? ১৯৭১ সালে নয় মাস যুদ্ধ চলাকালীন পাকিস্তানি বাহিনী বাঙালি নারীদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালায়। ১৯৭২-এর জানুয়ারি থেকেই জন্ম নিতে থাকে এই শিশুরা। সেসময় এই যুদ্ধশিশুদের স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার ব্যবস্থা করতে সরকার একটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। দেশ স্বাধীন হলে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্র ও হাসপাতালে গর্ভপাত করানো হয়। মৃত্যুঝুঁকির কারণে যাদের গর্ভপাত করানো সম্ভব হয়নি, তাদের প্রসবের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় অসংখ্য যুদ্ধশিশু। মাদার তেরেসা শিশুভবন তখন এই যুদ্ধশিশুদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। তাদেরই উদ্যোগে কানাডার ১৪টি দম্পতি বাংলাদেশি ১৫ যুদ্ধশিশুকে দত্তক নিয়েছিলেন সেসময়। কিন্তু তারপরও বাংলাদেশের আনাচে কানাচে রয়ে গেছেন অনেক যুদ্ধশিশু। যারা সমাজে নিজেদের পরিচয় গোপন করে বড় হতে বাধ্য হয়েছেন। তাদেরই একজন শরিফ (ছদ্মনাম)। বর্তমানে বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শরিফ তার বাবা মৃত জেনেই বড় হয়েছেন। তার মায়ের ভয় ছিল শরিফের শরীরে পাকিস্তানি রক্ত বইছে এমনটা কেউ টের পেলে তাকে সমাজে ঠাঁই দেওয়া হবে না।

মা একজন বীরাঙ্গনা সেটা আপনার জন্য গর্বের হওয়ার কথা। এখনতো তাদের মুক্তিযোদ্ধার মর্যাদা দেওয়া হয়েছেতাহলে পরিচয় গোপন রাখার কারণ কী?

মা মারা গেছেন দশ বছর হলো। বাবা অজ্ঞাত। মা চাননি কখনও পরিচয় জানাজানি হোক। সেকারণে আমাকে বড় করেছেন একজন মৃত পিতার সন্তান হিসেবে। আর তখনতো কাগজের এত কড়াকড়ি ছিল না। ফলে তিনি সেটা করতে পেরেছেন। বীরাঙ্গনাদের এত বছর পর মুক্তিযোদ্ধা বললেইতো সমাজ তাদের সে সম্মান দিয়ে দিচ্ছে না। বীরাঙ্গনার যে যন্ত্রণা সেটা তার পরিচয়েই লুকিয়ে ছিল। ফলে মা যখন চাননি, তখন আমি আর এটা নিয়ে কথা বাড়াইনি। জীবনের শুরু থেকে জেনে আসছি আমার বাবা ছিলেন, মারা গেছেন। আর মায়ের পরিবারের সবাই ভারতে থাকত, এখন আর কেউ নেই। হারিয়ে গেছে। এটা বানানো গল্প। মা কারোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে চাননি বলে, আবার আমাকেও গর্ভে মেরে ফেলার উপায় ছিল না বলেই হয়তো এই গল্প সাজিয়েছেন। আমি যখন বড় হলাম তখন মা সবটা খুলে বলেছেন। মায়ের তখন যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। ক্যান্সারে ভুগছিলেন। তখন আর রাগ করতে পারিনি। আমার বাবার নাম এখনও মৃত . . লেখা হয়। তবে আজ বলতে দ্বিধা নেই, সে অজ্ঞাত। আমি একজন নারীর ওপর অমানবিক নির্যাতনের ফলে জন্ম নিয়েছি। আমার ১৯ বছরের মায়ের জানা ছিল না কিভাবে আমাকে মেরে ফেললে তার জীবন অন্যরকম হতে পারত।

যারা বলেছেন তাদের আপনি খোঁজ নিয়েছেন? বিদেশে চলে গেছেন, মানবাধিকারকর্মী হিসেবে জায়গা করে নিয়েছেন। দেশের ক্ষেত্রে তাদের ৭১ পরবর্তী সময়ে পরিবার হয়েছে, সমাজে শুরু থেকে তাদের একটা পজিশন হয়েছে। কিন্তু আমার মা সারাজীবন বিয়ে করেননি। বাসা-বাড়িতে কাজ করেছেন নিভৃতে।

মায়ের কাছে নির্যাতনের কথা কিছু শুনেছিলেন? নাকি আপনি জানার পরের কষ্ট সামাল দিতে গিয়ে তার কষ্ট শেয়ার করেননি?

না না শেয়ার করেছিলেন উনি। তবে শুনতে শুনতে মনে হয়েছে মায়ের গর্ভে মেয়ে হলে সে তার কষ্টগুলো আরও বেশি অনুভব করতে পারত। আমিতো ভাঙচুর করে, চিৎকার করে নিজের ক্ষোভ ঝাড়লাম। কিন্তু মা? সারাজীবন বুকে চেপে রাখা কথাগুলো আমাকে বললেন ঠিকই, কিন্তু ঠিক যেন শান্তি পেলেন না। আমার কোনও আত্মীয় নেই ভেবে সারাজীবন, এমনকি মারা যাওয়ার পরও কষ্ট পেয়েছেন। আর আমার কষ্ট, আমি তার কষ্ট লাঘব করতে পারিনি মুহূর্তের জন্য।

 

গত একদশকে অনেক যুদ্ধশিশু গণমাধ্যমের সামনে এসে নিজেদের আবেগ, জীবনের কথা বলেছেন। আপনি কেন বলবেন না?

যারা বলেছেন তাদের আপনি খোঁজ নিয়েছেন? বিদেশে চলে গেছেন, মানবাধিকারকর্মী হিসেবে জায়গা করে নিয়েছেন। দেশের ক্ষেত্রে তাদের ৭১ পরবর্তী সময়ে পরিবার হয়েছে, সমাজে শুরু থেকে তাদের একটা পজিশন হয়েছে। কিন্তু আমার মা সারাজীবন বিয়ে করেননি। বাসা-বাড়িতে কাজ করেছেন নিভৃতে। তিনি কখনও চাননি এসব নিয়ে কথা বলতে। কষ্ট করে কেবল আমাকে মানুষ করতে চেয়েছেন। আর ভয় পেয়েছেন পাকিস্তানি এক সেনার রক্তবহনকারী এই আমি সমাজে যেন উন্মুক্ত না হয়ে যাই।

 

মায়ের কাছে কী শুনেছিলেন?

মা যশোরে ছিলেন। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। হিন্দু ঘরের মেয়ে। যুদ্ধের মাঝামাঝি সময় তাকে এলাকারই এক রাজাকার এসে ‍তুলে নিয়ে আসে। ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। মা বলেছেন, সেখানে অন্য নানা বয়সের নারীরা ছিল। তবে ওখানে আটকে রাখা হতো না। নিত্য নতুন মেয়ে আনা হতো আর ধর্ষণের পর হত্যা করা হতো। কিন্তু মাকে একজন আর্মি অফিসার তার নিজের জন্য রেখে দিয়েছিলেন। তিনি কেবল তার জন্য বরাদ্দ বলে মাকে ঘোষণা দিলেও সে যখন থাকত না তখন রাজাকাররাও নানাভাবে নির্যাতন করত। একদিন হাত থেঁতলে দিয়ে মা আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে বলে ছড়ানো হয়েছিল। এরপর শাস্তি হিসেবে একটা ঘরে তাকে কাপড় ছাড়া রাখা হত। সঙ্গে ছিল কেবল একটা ছোট বাটি। মা টের পায় তার গর্ভে সন্তান এসে গেছে। তখন তিনি মাথা কুটে আত্মহত্যা করতে চেষ্টা করেছেন, নিজের পেটে নিজে আঘাত করেছেন। কিন্তু নিজে কেবল কষ্টই পেয়েছেন, কোনও লাভ হয়নি। এরমধ্যে একদিন টের পান, কেউ নেই তার পুরো বাড়িতে। ফাঁকা হয়ে গেছে। দুইদিন ধরে স্তব্ধ বাড়ি। অনেকদিন পর বাঙালিরা বাড়ি খুলে তাকে বিজয়ের কথা শোনালেও তিনি তখনই এলাকা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং হেঁটে রাজবাড়ি চলে যান। মা আর আমাকে মারার চেষ্টা করেননি। ততদিনে আমার প্রতি ভালবাসা জন্মে গেছে তার। এরপর তিনি কেবল কিভাবে সম্মানের সঙ্গে আমাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারেন সেই চেষ্টাই করেছেন। আর কখনও তার ফেরা হয়নি। সেখানে থেকে আমরা চলে আসি মানিকগঞ্জ। সেখানেই আমার জন্ম। সবাই জানেন যুদ্ধে আমার আত্মীয়রা ভারতে চলে গেছে আর মা তার স্বামী হারিয়েছেন। এরপর আমরা নানা জায়গা পরিবর্তন করে থেকেছি।

 

মায়ের কষ্টগুলোকে নিয়ে বেড়ে ওঠা শরিফ নিজেও বিয়ে করেননি, একা থাকেন। একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করেন। মনে প্রাণে চান যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হোক। তাতে তার মা ও তার জীবনের কোনও পরিবর্তন আসবে না, কিন্তু মনের কোণে জমে থাকা কষ্টগুলো কমবে। কথা বলার শেষে তিনি বলেন, আমার নাম শরিফ, পিতা অজ্ঞাত- এভাবে লিখে যদি আমরা তখন সমাজে মাথা উঁচু করে বড় হতে পারতাম, তাহলে আমার মতো হাজারও শরিফ এত মানুষের ভিড়েও মরে বেঁচে থাকত না।

 

/এসএম/এফএ/

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ