behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে গণমানুষের অবদান উপেক্ষিত’

উদিসা ইসলাম২৩:২৬, ডিসেম্বর ০৬, ২০১৫

1লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) কাজী সাজ্জাদ আলী জহির বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ৪ নম্বর সেক্টরের অধীনে দ্বিতীয় গোলন্দাজ বাহিনীকে সংগঠিত করেন। যুদ্ধে তার সাহসিকতার জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে বীরপ্রতীক খেতাব দেয়। জন্ম কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি উপজেলার চৌসই গ্রামে, ১৯৫১ সালের ১১ এপ্রিল। সাজ্জাদ আলী জহির ১৯৬৯ সালের শেষে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে ক্যাডেট হিসেবে যোগ দিয়ে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সামরিক অ্যাকাডেমিতে সিনিয়র ক্যাডেট হিসেবে প্রশিক্ষণ নেন। ১৯৭১-এর আগস্টে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আর্টিলারি কোরে কমিশন লাভ করেন। এর পরপরই আগস্টের শেষে তিনি পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসে যুদ্ধে যোগ দেন।

সাজ্জাদ আলী জহির মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন সেপ্টম্বর মাসে। তিনি রওশন আরা ব্যাটারির সহ-অধিনায়ক ছিলেন। অক্টোবর মাস থেকে এই ব্যাটারি ১০৫ এমএম কামান দিয়ে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে মুক্তিবাহিনীর জেড ফোর্সকে বিভিন্ন যুদ্ধে আর্টিলারি ফায়ার সাপোর্ট দিয়ে সহায়তা করে। মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোয় একজন গেরিলা হিসেবে কাছ থেকে দেখেছেন গণমানুষকে। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে গণমানুষের কাহিনি এখনও লেখা হয়নি। তার পর্যবেক্ষণ, পাকিস্তান ইতিহাসের কাছে পরাজিত হয়েও শিক্ষা নেয়নি। একাত্তরের গণহত্যার সঙ্গে জড়িতদের যদি পাকিস্তান বিচার করত, তাহলে দেশটির ইতিহাসের ধারাবাহিকতা অন্য রকম হতে পারত। মুক্তিযুদ্ধে টুকরো-টুকরো কথা ও পরবর্তী রাজনীতি নিয়ে তিনি কথা বলেছেন বাংলা ট্রিবিউনের  সঙ্গে।

পাকিস্তান আর্মি থেকে পালিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে। এইটা কিভাবে সম্ভব হলো যদি বলেন..

আমি সেনা সদস্য ছিলাম। ভালোই ছিলাম। শ্রেষ্ঠ জব বলে কথা। কিন্তু যখন গণহত্যা শুরু হলো, তখন দ্বিধা শুরু হলো—টু বি অর নট টু বি। প্রতিদিন সকালে উঠে আমি একই কথা ভাবি, আমার করণীয় কী। নিজের কাছে করা প্রশ্নের উত্তরও পাই। আমাকে যুদ্ধে যেতেই হবে। কারণ আমি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সৈনিক। আমার মানুষের প্রতি হামলা হচ্ছে, সেটা সামাল দেওয়া আমারই দায়িত্ব।

আমার আরও প্লাসপয়েন্ট ছিল, আমি যেহেতু পাকিস্তান আর্মির প্রশিক্ষণ নেওয়া। ফলে তারা কী করতে চায়, কিভাবে করতে চায়, সেটা আমি বুঝতে পারতাম। এরপর আমি গণমানুষের যোদ্ধা হয়ে গেলাম। যে এলাকায় যুদ্ধ করেছি, সে এলাকার মানুষ আমাকে ‘মুক্তি বাবা’ ডাকত।

যুদ্ধে যোগ দেওয়ার আগে আমি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১৪ প্যারা ব্রিগেডে ছিলাম। সীমান্ত জেএনকে বর্ডার দিয়ে পালিয়ে কাশ্মির জম্মু সীমান্তে সাম্বা যাওয়ার চেষ্টা করি। অনেক পাহাড় পাড়ি দিয়েছি একা। একসময় রিজার্ভ পুলিশ পোস্ট থেকে আমাকে গ্রেফতার করা হয়। আহত থাকায় হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তাদের যুদ্ধে যাওয়ার বিষয়টা বোঝাতে সক্ষম হলে তাদেরই সহযোগিতায় মুজিবনগর এলাকায় আসি।

পরে ওসমানি সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আমি ৪ নম্বর সেক্টরে যুদ্ধে যোগ দেই, সিলেট অঞ্চলে।

মুক্তিযোদ্ধা

 

যুদ্ধক্ষেত্রে সবচেয়ে কঠিন সময় মনে হয়েছে কখন?

সিলেটের ছোট একটা চা বাগানে যুদ্ধ চলছে। সে দিনটি আমার জন্য খুব খারাপ ছিল। যুদ্ধ এমন একটা ঘটনা, আর আপনি বিজয়ী তো কাল পরাজিত। কিন্তু আত্মসমর্পণ করা চলবে না। মনের যুদ্ধে হারা চলবে না।

তো সম্মুখসমরে আমি আহত হয়েছি। সিদ্ধান্ত হলো, সরে আসার। আমার পাশে একজন সাহসী ছেলে গুলি চালিয়ে যাচ্ছিল। গেরিলা যুদ্ধ কৌশল হলো, পরের দিন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য তোমাকে বেঁচে থাকতে হবে। এর মধ্যে কোনও গ্ল্যামার নেই, এর মধ্যে কোনও গ্লাডিয়েটর নেই। ছেলেটি একসময় উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে পড়ল। যুদ্ধক্ষেত্রে কখনও দাঁড়াতে নেই। একটা শেল এসে তার হাত পুরো উড়িয়ে দিল। বাকিদের চলে যেতে বলে আমি ক্রলিং করে তাকে টেনে-টেনে নিয়ে ফিরলাম। ছেলেটা চিৎকার করছে। তখন আমার কাছে মরফিনের টিউব ছিল। তার গায়ে ঢুকিয়ে দিলাম ব্যথা কমানোর জন্য। সে বলতে থাকল, স্যার আপনি আমাকে ফেলে যাবেন না। ফেলে গেলে ওরা আমাকে বেয়নেট দিয়ে হত্যা করবে। কিছুক্ষণ পর সে অজ্ঞান হয়ে গেলে চিৎকার বন্ধ হয়ে যায়। সেখান থেকে তিনগ্রাম পর পৌঁছাতে পারলে আমরা সাহায্য পাব। ছেলেটাকে পাশের গ্রামের পুকুর পাড়ে পৌঁছে দিলে গ্রামের লোকেরা হাতে বানানো মাচার স্ট্রেচারে তাকে নিয়ে যায়। পাশের গ্রামে নিয়ে যাবে চিকিৎসা হবে, তারপর ভারতের হাসপাতালে নেওয়া হবে।

টানা ২৪ ঘণ্টা না খেয়ে আমি খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। তারওপর ছেলেটাকে তার রাইফেলসহ কাঁধে করে নিয়ে এসেছি এবং আমি সেদিনের জন্য পরাজিত। আমি পুকুর পাড়ে হাত ধুতে গিয়ে শুয়ে পড়েছি। পুরো শরীর ছেলেটির রক্তে মাখামাখি। দূর থেকে কানে ভেসে এলো চিৎকার। এক নারী চিৎকার করে কাঁদছে আর বলছেন, আল্লাহগো আমার মুক্তি বাবাকে মেরে ফেলেছে খানেরা। আমার পুরো গায়ে ওই ছেলেটার রক্ত দেখে ভেবেছে আমি মরে গেছি। আমি উঠে দাঁড়ালাম। বললাম, মাগো আমি তো মরি নাই, এ রক্ত আমার সহযোদ্ধার। সেই বৃদ্ধা আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। সে হাসি আজও চোখে ভাসে।

একাত্তরে নারীর ভূমিকা নিয়ে যদি কিছু বলতে চান..

একাত্তরে নারীরাই এ জাতিটাকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। নারীরা ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছেন। বাড়িটাকে ধরে রেখেছেন, মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছেন, নিজেরা মুখ বুঝে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, সন্তানদের ধরে রেখেছেন। নাহলে একটা প্রজন্ম নষ্ট হয়ে যেত। তারা অত্যাচারিত হয়েও মুক্তিবাহিনীর অবস্থান জানিয়ে দেননি বরং মুক্তিযোদ্ধাদের হারিকেনটা দিয়ে রাস্তা দেখিয়ে দিয়েছেন। কত রাজাকারের তালিকা দেখি কোনও নারী রাজাকারের নাম পাই না। এটা কত বড় জিনিস। অথচ এই নারীদের আমরা সম্মান জানাতে পারিনি। মাত্র দুজনকে বীরপ্রতীক দেওয়া হলো।

মোল্লারহাটে গিয়েছিলাম একটা জনসভায়। একজন নারী হাতে টুকরি, ছেঁড়া শাড়ি পরে সামনে এসে খুব কড়া গলায় বললেন, ‘আমার নাম মেহেরুন্নেসা মীরা। মুক্তিযুদ্ধ করলাম আমি-আপনি। আমরা ছিলাম সহযোদ্ধা। আপনি হয়ে গেলেন বীরপুরুষ আমি হয়ে গেলাম খারাপ মাইয়া, সমাজের বিচার ঠিক নেই।’ কেন তিনি এমন মনে করেন, জানতে চাইলে বললেন, ‘আমার সনদ নেই। সবাই বলে তুই বস্তিতে থাকস সনদ দিয়া কী করবি।?’ সে নারী পলিথিনের বস্তিতে থাকেন। মুক্তিযুদ্ধে তিনি গান গাইতেন। ভালো গ্রেনেড ছুড়তে পারতেন, রাইফেল ট্রেনিংও করেছিলেন। এমনকি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাকিস্তানি ক্যাম্পে রেকি করতে গিয়েছেন রান্নার কাজ করার ছলে। সেই নারীর কাছেই জানতে পারি, যুদ্ধের পর তার বিয়ে হয়, দুই সন্তানের জননী হওয়ার পর তার স্বামী অভিযোগ তোলেন, ৭১ সালে তিনি ছেলেদের ক্যাম্পে ছিলেন বলে খারাপ মেয়ে হয়ে গেছেন। সেই নারী আমাকে বললেন, সেই থেকে তিনি এই বস্তিতে আছেন। বললেন, ‘স্যার, খারাপ মাইয়া হইয়া মরতে চাই না।’

যুদ্ধ শেষ হলো, বিজয়ের মুহূর্তে অনুভূতি কেমন ছিল?

মিশ্র অনুভূতি! বড় সাফল্যের পর যেমন হয় আর কি! ওই সময় প্রথম বাবা-মার কথা মনে হলো। যুদ্ধ দেখেছেন। স্বাধীনতার পূর্বাভাস পেয়েও তারা বিজয় দেখে যেতে পারলেন না। মনের মধ্যে ক্ষোভ তখন অনেক। বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে যখন, তখনও গণহত্যা চলছে, এ মেনে নেওয়া কঠিন। ঢাকায় বুদ্ধিজীবীদের আগে থেকে সতর্ক করার কাজটা করা গেল না কেন, সে প্রশ্ন এলো।এখন বুঝি, যুদ্ধ অনেক হত্যাকাণ্ড ঘটায়, সবচেয়ে বড় হত্যা করে ইতিহাসকে। গণমানুষের কাহিনি তো লেখা হলো না আজও। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে গণমানুষের অবদান আজও উপেক্ষিত রয়ে গেল।

/এমএনএইচ/

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ