behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

‘তারচেয়ে বেশি ক্ষত আমার হৃদয়ে’

আরিফুল ইসলাম, কু‌ড়িগ্রাম১৭:০৯, ডিসেম্বর ০৭, ২০১৫

শওকত আলী সরকার‘যুদ্ধের কথা কী বলবো, তোমাদের কাছে যুদ্ধ রূপকথার গল্পের মতো মনে হবে। যুদ্ধের কথা মনে হলে ভাবি, কী পাগলামিটাই না করেছি।’ যুদ্ধ নিয়ে এভাবেই গল্প শুরু করলেন চিলমারীর যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা শওকত আলী সরকার। মুক্তিযুদ্ধে তার ত্যাগ, সাহসিকতা ও অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৭২ সালে তৎকালীন সরকার শওকত আলীকে বীর বিক্রম খেতাব দেন।

১৯৪৮ সালের ২০ মে চিলমারীর রাণীগঞ্জ ইউনিয়নে শওকত আলীর জন্ম। ১৯৬৭ সালে কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে বিকম পাশ করেন। যুদ্ধ করেছেন ১১ নং সেক্ট‌রে। মু‌ক্তিযুদ্ধের সময় কু‌ড়িগ্রাম জেলার অর্ধেক ছিল ৬ নং সেক্টরে। বাকি অর্ধেক উলিপুর, চিলমারী, রৌমারী ও রা‌জিবপুর ছিল ১১ নং সেক্ট‌রের অধীন। এই সেক্টরেই প্রথম ব্রিগেড জেড ফোর্স গ‌ঠিত হয়।

যুদ্ধে যাওয়ার প্রেরণা প্রসঙ্গে বলেন, ‘যুদ্ধে গিয়েছি দেশের টানে। তখন তোমরা থাকলে তোমরাও যুদ্ধে যেতে। মূলত ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পরই আমরা মানসিকভাবে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করি। যুদ্ধের কথা মনে হলে এখন মনে হয় পাগলামি করেছি। দেশের প্রতি অকৃত্রিম টান আর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বই আমার যুদ্ধে যাওয়ার অনুপ্রেরণা।’

কোনও স্মরণীয় মুহূর্ত বা অপারেশন?

‘যুদ্ধের প্রতিটি অপারেশন স্মরণীয়। জীবন বাজি রেখে যে যুদ্ধ, তার প্রতিটি মুহূর্ত স্মৃতিপটে চিরস্মরণীয় হয়েই থাকে। চিলমারী বন্দর এলাকা হওয়ায় এখানে পাকিস্তানি বাহিনী স্থায়ী ক্যাম্প করেছিল। তাদের যোগাযোগের জন্য রেলপথ ছিল অন্যতম মাধ্যম। চিলমারী ও বালাবাড়ী স্টেশনে ছিল তাদের ক্যাম্প। বৃহত্তর রংপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে তারা মুক্তিযোদ্ধাসহ সাধারণ মানুষকে ধরে এনে ট্রেনের বগিতে নির্যাতন চালাতো। এমনকি তারা মানুষকে পাটের সঙ্গে বেঁধে কেরোসিন ঢেলে দিয়ে আগুনও ধরিয়ে দিত।

আমরা মুক্তিযোদ্ধারা আশ্রয় নিতাম নদীর তীর আর চরগুলোয়। আমাদের যুদ্ধ কৌশল সম্পর্কে হানাদাররা অভ্যস্থ ছিল না। নৌকা আর গানবোট ব্যবহার করে তারা অপারেশন চালাতো। আমাদের সামনে পাকিস্তানি বাহিনী আর পেছনে থাকত নদী। অপারেশন চলাকালে গুলি চালাতেই হতো, পিছু হটার উপায় ছিল না।

ব্রহ্মপুত্র বেষ্টিত রৌমারী ছিল কুড়িগ্রামের একমাত্র মুক্তাঞ্চল এবং এই রৌমারী ছিল আমাদের যুদ্ধের প্রশিক্ষণ স্থল। পাকিস্তানি বাহিনী এটা বুঝতে পেরে সিদ্ধান্ত নিল তারা রৌমারীতে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ স্থল ধ্বংস করবে। আমরা বুঝতে পারলাম হানাদার বাহিনী যদি একবার রৌমারী কিংবা রাজিবপুরে প্রবেশ করতে পারে তাহলে আমরা তাদের সঙ্গে পেরে উঠব না। ৪ আগস্ট পাকিস্তানি বাহিনী গানবোট নিয়ে পূর্ণ শক্তিসহ  হামলা শুরু করলো। আমরা রৌমারীর কোদালকাটির চরে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুললাম। এই চরেই হলো মারাত্মক যুদ্ধ। ১১ নং সেক্টরের অধীন হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। সেদিন আমাদের প্রতিরোধের মুখে টিকতে না পেরে পাকিস্তানি বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়।

সম্মুখ সমরের স্মৃতিস্তম্ভ

চিলমারীর বালাবাড়ী রেলস্টেশন ছিল হানাদার বাহিনীর শক্ত ঘাঁটি। তাই চিলমারী মুক্ত করতে হলে এই ক্যাম্প গুঁড়িয়ে দিতে হবে। ৭১-এর ১৭ অক্টোবর ১১নং সেক্টর কমান্ডার কর্নেল তাহেরের নের্তৃত্বে আমরা বালাবাড়ী স্টেশনে হানাদার বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধ করি। সেদিন অনেক সূর্যসন্তান শহীদ হন। পাকিস্তানি বাহিনীর প্রায় ২০ সদস্য নিহত হয়। অনেক রক্তের বিনিময়ে শত্রুমুক্ত হয় বালাবাড়ী স্টেশন।

হানাদার বাহিনীর নৃশংসতার সবচেয়ে বড় দাগ রয়ে গেছে উলিপুরের হাতিয়ায়। ৭১-এর ১৩ নভেম্বর, রমজান মাস। হাতিয়ার মানুষ সেহরি খেয়ে নামাজের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। অনেকে ঘুমিয়েও ছিল। আমরা আগেই জানতে পেরেছিলাম হানাদার বাহিনী হাতিয়া আক্রমণ করবে। আমাকে বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে হাতিয়ার অভিযানে পাঠানো হয়। আমাদের প্রতিরোধের মুখে টিকতে না পেরে নরপশুরা নিরস্ত্র ও ঘুমন্ত হাতিয়াবাসীর ওপর নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালায়। প্রায় ৭০০ জনকে হত্যা করে তারা। আগুন ধরিয়ে দেয় হাতিয়ার কয়েকটি গ্রামে। এখানেও আমাদের সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীর যুদ্ধ হয়। হাতিয়ার দাগাড়কুঠি বধ্যভূমি আজও সেই চিহ্ন বুকে ধারণ করে আছে। এই যুদ্ধে আমার ডান পায়ে গুলি লাগে। শহীদ হন হীতেন্দ্রনাথ, গোলজার হোসেন, আবুল কাশেমসহ আরও অনেকে। তারপরেও আমরা পিছু হটিনি। শেষ পর্যন্ত টিকতে না পেরে হাতিয়া ত্যাগ করে পাকিস্তানি বাহিনী। সেদিন মুক্ত হয় হাতিয়া।

আমার ডান পায়ে আজও গুলির দাগ আছে। তারচেয়ে বেশি ক্ষত আমার হৃদয়ে। জীবন বাজি রেখে যে দেশকে স্বাধীন করেছি, সে দেশের মাটিতে সে দেশেরই পতাকা নিয়ে যখন স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি দম্ভ ভরে ঘুরে বেড়ায় তখন হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। আজ তাদের শাস্তি হওয়ায় মনে স্বস্তি ফিরে পেয়েছি।’

 

দেশ নিয়ে কী স্বপ্ন দেখেন?

‘যুদ্ধ করেছি স্বাধীন দেশের জন্য, পেয়েছি। এখন স্বপ্ন দেখি এদেশ বিশ্বের বুকে আরও মাথা উচু করে দাঁড়াবে, সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। দেশের মানুষ শোষণ মুক্ত থাকবে।’

 

 

/এসটি/এফএ/

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ