behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

বীরাঙ্গনা শেফালি-মায়ার পরিচয়হীন ৪৪ বছর

উদিসা ইসলাম০৩:৫৪, ডিসেম্বর ০৮, ২০১৫

বীরাঙ্গনা দুই বোন শেফালি আর মায়া। বয়সের পার্থক্য সাড়ে তিন বছর। মুক্তিযুদ্ধকালে শেফালি এক সন্তানের মা, বয়স ১৯ আর মায়ার সাড়ে ১৫। শেফালির সাথে যখন কথা হচ্ছে তখন তিনি বয়সের ভারে ন্যুব্জ। যুদ্ধের সময় হারিয়েছেন নিজের শিশুসন্তানকে, চোখের সামনে শত্রুর নির্যাতনের শিকার হতে দেখেছেন বোনকে। ৪৫ বছর পরও চিৎকার দিয়ে কেঁদে বলেন, আমি বারবার বলেছিলাম। ওরে ছেড়ে দাও, আমারে নিয়ে যাও। ও আমার ছেলেটাকে মানুষ করবে। কে শোনে কার কথা।

মিরপুরের মাজার রোডে থাকেন শেফালি। মায়া চলে গেছেন ভারতে। কথা হয় কেবল শেফালির সাথে। দুই বোনের এক পরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমে তাদের মুখোমুখি হয় বাংলা ট্রিবিউন। কথা দেয়, ৪৪ বছর ধরে তারা যেভাবে নিজেদের জগতে রয়েছেন সে জগৎ ভাঙবে না। তারপরই মুখ খোলেন শেফালি।

১৯৭১ সালে স্বামীকে চোখের সামনে খুন হতে দেখেছেন। বোনকে চোখের সামনে ধর্ষণের শিকার হতে দেখেছেন। আর নিজে?

‘আমাকেও ধর্ষণ করা হয়েছে। মাসের পর মাস। কখনও একা। কখনও দলবদ্ধভাবে। আপনাকে বলছি ৪৪ বছর পর। কিন্তু নিজেকেও বলতে ভয় পাই। আমাকে যেদিন ক্যাম্পে নিয়ে গেল সেদিনই এক বছরের ছেলের চেহারা শেষ দেখেছি। তারপর আর ফেরা হয়নি। না পাবনার সেই গ্রামে, না আর কোনও আত্মীয়ের কাছে। আমরা খুব অসুস্থ ছিলাম। দুই বোন শপথ করি, কোনওদিন কোথাও নিজেদের পরিচয় দেব না। কিন্তু মানুষের জীবন। কোথাও না কোথাও কষ্টের কথা বের হয়ে গেছে। তবে তারা সবাই আমাদের সম্মানের দিকে তাকিয়ে কোথাও পরিচয় প্রকাশ করেনি।

গর্ভপাতের অপেক্ষায় তিন বীরাঙ্গনা
গর্ভপাতের অপেক্ষায় তিন বীরাঙ্গনা

কী হয়েছিল?

অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি একদিন। এক রাজাকার আসে। সাথে দশজন পাক আর্মি। ওই রাজাকার আমাদের এলাকার নয়। এসে বলে আমরা নাকি মুক্তিদের খাবার দিয়েছি। আমার স্বামী যতই বলেন আমরা খাবার দেই নাই, ততই তাকে মারধোর করে। এরপর ঘরে ঢোকে তারা। আমার কোলে এক বছরের ছেলে আর পাশে মায়া। তারা আমার ছেলেকে কোল থেকে সরিয়ে চুল ধরে উঠানে নিয়ে যায়। আমার স্বামী পেছন পেছন এলে দুজনে তাকে ধরে রাখে। এক আর্মি আমার শ্লীলতাহানী করে। স্বামী সহ্য করতে না পেরে একজনের হাত কামড়ে দিলে তাকে রাইফেলের বাট দিয়ে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে মারতে শুরু করে, আমি জ্ঞান হারাই।

কয়দিন পর বলতে পারব না, আমি নিজেকে ক্যাম্পে আবিষ্কার করি। কে কোথায় আছে জানি না। একটা ঘরে আমরা চারজন মহিলা ছিলাম। ওরা আরও একমাস আগে থেকে ছিল সেখানে। খেতে দিত না ঠিকমতো। ডালের মধ্যে পোকা, শুকনা রুটি। আমি ধরেই নিয়েছিলাম স্বামীকে সেদিন মেরে ফেলেছে। কিন্তু আমার ছেলে? আমার বোন মায়া? এক-দুই দিন পরপরই চলতো শারীরিক নির্যাতন। কী করবো সেটাই ভাবতাম।

বীরাঙ্গনাদের মুক্তির খবর

হঠাৎ একদিন দেখি ভোররাতে ওরা ছয়টা মেয়েকে আমাদের ঘরে এনে ফেলে গেল। কারও শরীরে কাপড় আছে, কারওর নাই। বীভৎস চাকুর আঘাত শরীরে। পরের দিন সকালে দেখলাম তার ভেতর একজন আমার আদরের বোন মায়া। ও বললো, ‘আপারে! দুলাভাই সেদিনই নাই। আর কমল (আমার ছেলে) কোথায় আমি জানি না। আমাকে পরের দিনই তুলে এনেছিল। ছিলাম এক আর্মির সাথে একটা বাড়িতে।’ তখন জানলাম আমাকে ধরে আনার দশ দিন পেরিয়ে গেছে।

এরপর আমাদের আর নির্যাতন করেনি। কারণ আমরা কেউই আর ‘ভোগের উপযোগী’ ছিলাম না। দিনের পর দিন গোসলহীন, খেতে না পেয়ে নিজেদের শরীরের গন্ধে নিজেরাই বমি করে ফেলতাম। এর মধ্যে দুজন সন্তানসম্ভবা হল। কী যে যন্ত্রনার দিন! এখন এগুলোকে আপনারা গল্প মনে করেন, গল্প শুনতে আসছেন। এগুলো কেবল রক্তাক্ত শরীরের সত্য কাহিনী। কোথাও কোনও গল্প নেই।

ওখান থেকে বেরিয়ে কী করলেন?

আমাদের ওরা ছেড়ে দিতেও পারছিল না, পালতেও পারছিল না। ওখানে ধরে রাখলেতো খেতে দিতে হবে। যাই হোক। নভেম্বরের শেষের দিকে আমাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু আমরা বের হতে সাহস পাইনি। কোথায় যাব, আমাদের দেখলে সবাই কী ভাববে। শেষে একদিন রাত জেগে ভোররাতে বের হয়ে আগে গোসল করি। যেসব বাড়ি ছেড়ে লোকজন পালিয়েছে তেমন একটা বাড়ির ভেতরে ঢুকে ছেড়াফাটা কিছু কাপড় পাই। সেটা পরি। তারপর আমরা দুই বোন হাঁটা শুরু করি। ততক্ষণে সকাল হয়ে গেছে। আমরা দুই বোন শপথ করেছিলাম নিজেদের লুকিয়ে রাখবো। বুঝতে পেরেছিলাম আমাদের সাথে যা হয়েছে তা কেউই ভালভাবে নেবে না। কেউ হয়তো করুণা করবে। কিন্তু মনে মনে ঘৃণা করবে। এরপর শরণার্থীরা যে পথে হাঁটছিল তাদের সাথে সাথে ভারতে চলে গেল মায়া। আর আমি? কোনওদিন যদি ছেলেকে পাই সেই লোভে রয়ে গেলাম এপারে।

ছেলেকে খোঁজার চেষ্টা করেছেন?

সাহস করিনি। দরকারও নাই। সে যদি বেঁচে থাকে তাহলে হয়তো জানেই না তার মায়ের সাথে কী ঘটেছে। হয়তো নিজের মতো করে ভাল আছে। থাক। দোয়া করি বেঁচে থাক। বোন চলে যাওয়ার পর কিছুদিন এ বাড়ি ও বাড়ি করে ঢাকায় আসি। বাসাবাড়িতে কাজ করেছি। দোকানে দোকানে পানি দিয়েছি। এখন আর শরীর পারে না। একটা ছেলে আছে সবজির দোকানি, তার দোকানে সবজির পচা বাছি, দিনে কুড়ি টাকা দেয়। আশেপাশে দোকানের ওরাই খাওয়া দেয়। বাকি জীবন এভাবেই কাটিয়ে দিতে চাই। এখানে আমি হয় খালা, না হয় নানী, না হয় বুবু। এরা আমার নাম জানে না, শেফালি মরে গেছে।

/এফএ/

/আপ:আরএ/

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ