behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

ইনফরমার থেকে হয়ে গেলেন ‘বীরাঙ্গনা’

উদিসা ইসলাম১৪:৫৬, ডিসেম্বর ১২, ২০১৫

.মুক্তিযুদ্ধকালে সেতারা বেগম (ছদ্মনাম) ছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের ইনফরমার। পাকিস্তান সেনাদের ক্যাম্পে রান্না করার কাজ করাতে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। রাখা হয় ফরিদপুর শহরেরই একটি ক্যাম্পে। বিজয়ের আগ দিয়ে যখন ক্যাম্প ঘুটিয়ে নেওয়া হচ্ছে তখন তাকে বলা হয় একটি বাংকারে গিয়ে থাকতে, যেখানে ৩০ জন নারীকে আটকে রাখা হয়েছিল নির্যাতনের পর। তিনি সেখানে গিয়ে তাদের সেবা-যত্ন করেন। তবে এর কদিন বাদেই যে বিজয় এসে গেছে তারা তা বোঝেননি। মুক্তিযোদ্ধারাসহ এলাকার মানুষ ওই ঘরে কেউ আছে কিনা খোঁজ নিলে একে একে বেরিয়ে আসেন সেতারা বেগমসহ ৩১ জন। তিনি বলেন, আমি ওদের সঙ্গে বেরিয়ে এলাম বলেই আমি পরিচিত হয়ে গেলাম ‘বীরাঙ্গনা’। আমি ভাবিও নাই আমার জীবন এমন হয়ে যাবে। কিন্তু কি নিষ্ঠুর আমাদের সমাজ। ওই বাংকার থেকে ফেরা একজনও কি সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পেরেছে? আমাকে সমাজ ধর্ষণের শিকার নারী হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আমার স্বামীকে মেরে ফেলা হয়েছিল আমাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার কয়েকদিন পরেই। কিন্তু আমাকে তো কেউ ধর্ষণ করেনি। এই সমাজকে আমি আমার কথা বলে উঠতে পারিনি। কি করতেন সেতারা বেগম, কি দেখেছিলেন মুক্তিযুদ্ধকালে- সে কথা ক্ষোভের সঙ্গে জানিয়েছেন সেতারা। তবে এও বলেছেন, দেখবেন- স্বাধীনতার ক্ষতি হয় এমন কিসু লিখবেন না। আমরা মুর্খ মানুষ। সাজায়ে বলতে পারব না। আর কাউরে আমার নাম ছবি দিয়েন না, তাতে একমাত্র অবলম্বন সবজির দোকানডি ছাড়তে হবে।

স্বীকৃতিপ্রাপ্ত কয়েকজন বীরাঙ্গনা

-আপনাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পরের কী ঘটল ...

আমার বয়স ছিল ২০ এর ওপর। বিয়ে হয়েছিল ১২ বছর থাকতে। ছেলে-মেয়ে ছিল দুইটা। মাস-টাস জানি না, একসময় ঢাকা থেকে লাইনে লাইনে লোক আসা শুরু করলো। শুধু আমাদের গ্রামে না, আশেপাশের সব জায়গায় আসছিল বলে শুনেছি বাড়ির লোকজনের কাছে। যুদ্ধ হবে। ঢাকায় যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে বলে সবাই গ্রামে চলে আসছে। এর এক সপ্তাহ পরেই আমাদের এলাকায় শুরু হয়ে গেল অত্যাচার। বাসা থেকে বাইর হওয়া যায় না, পুরুষ মানুষ রাতে বাসায় থাকে না। এলাকায় ঘোমটার নিচ থেকে যাদের নানা সময় দেখসি- পালা-পার্বনে তাদেরই কেউ কেউ নাকি শত্রু হয়ে গেছে। এসব হতে হতেই একদিন ভোর রাতের দিক বিকট আওয়াজ শুরু হলো। ঘর ছেড়ে বেরিয়ে দেখি সে কি আগুন! চিৎকার। আর মেয়েদের কান্না। একটু পর আমাদের বাড়ির দিকে আসতে আমরা নিচু জমিতে গিয়ে লুকাই। কিন্তু তার ভেতর থেকে টেনে বের করা হয় আমাকে। আমার ছেলে-মেয়ে আরেকটু ঢালুতে ছিল। ওদের চাচা ওদের ঘুমন্ত মুখে হাত দিয়া রাখসে যাতে চিৎকার না দেয়। আমারে নিয়া গেল। কই নিসে জানি না, কেন নিসে তাও জানি না।

মুক্তিযুদ্ধের ছবি

-তারপর?

পাকিস্তানি আর্মিরা থাকত এমন একটা জায়গায় নিয়ে আমাকে প্রথমদিন কিছু খেতে দেয় নাই। তারপর দিন আমাকে রান্নাঘরের দাযিত্ব দেওয়া হলো। আমার সঙ্গে আরেকজন ছিলেন তার সঙ্গে আর কখনোই দেখা হয় নাই। তো রান্না করতে হতো, অনেক। সবজি, খাসি, মুরগি যখন যা বলতো। সেই রান্নাঘরেই আমার থাকার ব্যবস্থা। গোসল করার সময় পেছনের দরজা দিয়ে কুয়ার পাড়ে গিয়ে গোসল। সেটাও ওই মাসি পাহারায় থাকতো। যে বাজার নিয়ে আসতো সেই লোকটার সামনে আমাদের মুখ দেখানো বারণ ছিল। তার কাছে গল্প শুনতাম। কী হচ্ছে বাইরে, রক্তগঙ্গা বয়ে যাচ্ছে। একদিন দেখলাম সেই বাজারওয়ালা পাল্টে গেছে। সে এসে কোনও গল্প বলল না, শুধু বলল, সাহেবদের কাবার দেওয়ার সময় কি বলে শুনে আসবেন, আমি আবার আসব, জেনে নিব আপনার কাছে। আমিতো ভয়ে শুকিয়ে কাঠ। বলে কি, এই ছেলেইবা কে?

চরম বর্বরতার চিহ্ন

-উনি পরেরবার এসেছিলেন?

না আসেননি। পরেরবার আরেকজন এসেছিল, তাকে বললাম- এরকম ওরা অনেক মেয়েকে ধরে এনে ফুর্তি করে। গ্রাম পুড়ানোর নকশা করছিল। আর তখন এলাকায় মুক্তি ঢুকে পড়েছে বলছিল। ওদের পক্ষে আমাদের গ্রামের যে মানুষ দুজন থাকতো, তাদেরকে ওরা অনেক গালাগাল করছিল। এর বেশিকিছু বুঝিনি। উনি বললেন, ওরা বুঝে ফেলেছে আমরা প্রস্তুত। সে কারণে ক্ষেপে গেছে। আপনি সাবধানে থাকবেন। সে বের হতেই পেলাম গুলির আওয়াজ। এরপর আমার ঘরে ওই রাজাকাররা এলো, এসেই অনেক অত্যাচার করলো। তাকে কী বলেছি সেসব নিয়ে মারধর করলো। কিন্তু ওরা আমাকে যতই নির্যাতন করুক, রান্না করায়ে নিতে হবে বলে বেশি ঝামেলা করতো না। এটা এখন বুঝি। তখন বুঝলে মুক্তিদের আরও সাহায্য করতে পারতাম।

 

-আপনি ছাড়া পেলেন কীভাবে?

দিন তারিখ তো বলতে পারি না রে মা। তবে এটুকু মনে আছে- কয়েকদিন পরেই যুদ্ধ জয় হয়েছে। আমাকে ছেড়ে দিয়ে বলে যা, আর কোনও কাজ নাই। বাজারের পেছনে একটা বাংকার আছে, ওখানে মেয়েরা আছে ওদের সঙ্গে থাক, তাহলে কেউ কিছু বলবে না। আমি তো বুঝি নাই। মেয়েরা ওখানে কেন আছে, কে রাখসে। আমি গেছি। গিয়া দেখি গাদাগাদি করে মেয়েরা আছে। কি দুর্গন্ধ। কারোর কারোর গায়ে পচনও দেখা গেসে। সবার কাছে কাহিনী শুনে বুঝলাম পুরো ব্যাপারটা। ওদের কারোর তেমন হুশ ছিল না। শরীরের নির্যাতন সহ্য করতে করতে কেমন জানি কথাও বুঝে না। শেষে এক দুইদিন কেটে গেছে বুঝিনি। কথা শুনতে শুনতেই ওদের জন্য শুকনা কিছু খাবার যোগান ছিল কি ছিল-না সেগুলা মুখে দিয়ে আমি পাশের কুয়া থেকে পানি এনে খাওয়ালাম। কয়দিন পর কে জানি চিৎকার দিয়ে বলল, শোন যুদ্ধ জয় হইসে! তোমরা কেউ ভেতরে থাকলে বের হয়ে আসো। তখন সবাইকে নিয়ে বেরিয়ে আসলাম।

 

-বেরিয়ে বাড়ির দিকে গেলেন? কাউকে পেলেন সেখানে?

বের হতেই সবাই মনে করল আমিও ধর্ষণ নির্যাতনের শিকার হয়েছি। সমাজে ওরা যেমন কলঙ্কিত, আমিও কলঙ্কিত। প্রথমে প্রতিবাদ করলেও কেও কোনও কথা শোনেনি। তারপর রাগ হলো, যারা নির্যাতনের শিকার হয়েছে তাদেরইবা দোষ কি। আমার ছোট জ্ঞানে তাই মনে হলো। আমার ওই বোনদের অনেকের মনেও ছিল না গ্রামের বাড়ি কোথায়, কাউকে কাউকে পরিবারের লোক নিয়ে গিয়েছিল কিন্তু থাকতে পারেনি। আমি আমার ঘরে গিয়ে জানলাম আমার স্বামীকে মেরে ফেলেছে। আর দুই ছেলেমেয়ে পাশের বাড়ির মাসির সঙ্গে ভারত চলে গেছে। আমার শ্বশুর-শাশুড়ি ছিলেন কিন্তু বললেন, আমাকে রাখবেন না। কিছুদিন গ্রামের নানা বাড়ির আঙিনায় থেকে একসময় আমি ঢাকায় চলে আসি। তখন থেকে এখানেই আছি।

/এএইচ/

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ