behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

স্বজনের লাশ দেখেও চোখে পানি আসেনি

জোগেশ চন্দ্র ঘোষ২১:২৯, ডিসেম্বর ২০, ২০১৫

jogesh ghosh১৯৭১ সালে আমার বয়স ৩৫ বছর। তখন আমি মাদারীপুরে পোস্টমাস্টারের চাকরি করি। দেশে যুদ্ধ লেগেছে, সে কথা জানতাম। শুনতাম পাকবাহিনী হিন্দুদের ওপর বেশি অত্যাচার করে। আমাদের এলাকার সবাই ছিলেন হিন্দু। আতঙ্কিত ছিলাম কখন পাকবাহিনী আক্রমণ করে বসে।
৫ জ্যৈষ্ঠ আশঙ্কা সত্যি হলো। আমাদের এলাকা আক্রমণ করলো পাকবাহিনী। সেদিন আমি ব্যবসার কাজে বাহাদুরপুর ইউনিয়নের আলগী গিয়েছি। আলগী গ্রামের জলিল কাজীর কাছে শুনতে পাই পাকবাহিনী আমাদের গ্রাম চলে এসেছে। কথাটা শোনার পর কলজে কেঁপে উঠল। কী করব ভেবে পেলাম না। জীবন নিয়ে পালাব, না বাড়ির খোঁজ নেব। একটু একটু করে বাড়ির দিকে এগোতে থাকলাম। মানুষ ছোটাছুটি করছেন। গোলাগুলির শব্দ শুনতে পেলাম।
বাহাদুরপুরের হিন্দুপাড়া মালোবাড়ির খালপাড় এলে দেখি, আমার বড় ছেলে সনাতন দৌড়ে আসছে। ওর বয়স পাঁচ বছর। ওর পেছনে অস্ত্র হাতে দুই মিলিটারি। আমি একটা ঝোপের পাশ থেকে সনাতনকে ইশারা করতে থাকি। ও সাঁকো পার হয়ে এপারে আসে। ভেবেছিলাম ওকে নিয়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাব।
সনাতন তখন আমার কাছ থেকে সাত থেকে আট কদম দূরে। মিলিটারি ওকে গুলি করে বসল। গুলি ওর পিঠ ভেদ করে বুকের সামনে তিনটি ছিদ্র করে বের হয়ে গেল। আমি ঝাঁপিয়ে পড়ে আমার সোনামানিককে বুকে জড়িয়ে ধরলাম।

ওর গায়ের তাজা রক্ত আমার শরীর ভিজিয়ে দিল। ও আমাকে যেন একটা কিছু বলতে চেয়েও পারেনি। মিলিটারিরা গুলি করে আর দাঁড়ায়নি। চারপাশে আর কেউ ছিল না। সনাতনের দেহটা আমি মালোবাড়ির পেছনে সতীশ মণ্ডলের পাটক্ষেতে নিয়ে রাখলাম। ওখানে আমার থাকাটা নিরাপদ ছিল না। আমি তিতিরপাড়া সৈয়দ মুন্সীর বাড়িতে গেলাম। তারা দেখে মনে করেছিলেন, আমার গায়েই গুলি লেগেছে।

আশপাশ থেকে আবারও গুলির শব্দ আসতে শুরু করেছিল। তখনও জানি না, বাড়ির অন্য সবার কী হয়েছে। মনটা ভীষণ ছটফট করছিল। বিকেলে গোলাগুলি কিছুটা বন্ধ হলে বাড়িতে ফেরার কথা ভেবে বেরিয়ে পড়ি। কোথাও কেউ নেই। আগে পাটক্ষেতে যাই, আমার সনাতনের কাছে। গায়ের রক্ত শুকিয়ে গেছে ওর। মুখটা বির্বণ হয়ে গেছে। ওকে ওখানেই রেখে বাড়িতে আসি। দেখি দাউ-দাউ করে আগুন জ্বলছে। আপনজনদের কারও দেখা পেলাম না। বাড়ির আগুন নেভানোর কেউ নেই।

হঠাৎ বাড়ির উত্তরের ঘাটে দেখি কয়েকজন দাঁড়িয়ে কিছু দেখছে। কাছে গিয়ে দেখি, সত্তর বছর বয়সী আমার মা বাসনা রানীর লাশ। মায়ের কোলে এক বছর বয়সী আমার ছোট ছেলে প্রশান্ত। মৃত। মাকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে মেরেছে। ছোট ছেলেটাকে মাথায় আঘাত করেছে। পাশাপাশি পড়ে আছে দুটো মৃতদেহ।

আপনজনের লাশ দেখেও তখন চোখে পানি আসেনি। শুধু বুক কাঁপছিল। মা খুবই বৃদ্ধ ছিলেন। বাড়ির বাইরে যেতে পারতেন না। পাকিস্তানিরা আক্রমণের পর পালিয়ে বাঁচতে চেয়েছেন।

পরপর তিনটি লাশ দেখলাম। স্ত্রীকে তখনও পাইনি। ভেবেছিলাম মারা গেছেন। একটুপর তার লাশও পাওয়া যাবে। চাচাতো ভাইয়ের মেয়ে শোভা রানী। বিশ বছরের মেয়ে। সেও মারা গেছে। চাচাতো ভাই জগদীশ ঘোষ। তার স্ত্রী পুষ্প রাণী। তারাও মৃত। মাটিতে পাশাপাশি লাশ পড়ে আছে। আমাদের পরিবারে মারা যান ছয় জন। এলাকার শতাধিক লোকও সেদিন মারা যান।

সন্ধ্যাবেলা আমার স্ত্রী বাড়ি ফিরে আসেন। ছোট ছেলের লাশ দেখে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন তিনি। তার হাতে গুলি লেগেছিল। সনাতনকে পাটক্ষেত থেকে নিয়ে আসি তখন। সঙ্গে ভাইয়ের ছেলে শ্রীভাষ। সনাতনের লাশ দেখে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেছিলেন।

লাশগুলো সৎকার করার কেউ ছিল না। তাই বাড়ির দক্ষিণে ছয়টা লাশ একসঙ্গে মাটিচাপা দিলাম। সব কিছুই শেষ হয়ে গেল।

বাড়িতে থাকা তখন নিরাপদ ছিল না। তাই পরদিন বাড়ি থেকে আলগী কাজীবাড়ি চলে যাই। বেঁচে ছিলেন আমার স্ত্রী। বেঁচে ছিল আমার মেঝো মেয়ে রীনা। কাজীবাড়ির লোকেরা আমাদের এক মাস থাকার সব ব্যবস্থা করে দেন। বর্তমান বাহাদুরপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সৈয়দ শাখাওয়াত হোসেন সেলিমের মা আমাদের একদিনের খাওয়ারও ব্যবস্থা করেন।

যুদ্ধের সময়ের প্রতিটি দিনের কথা আজও মনে পড়ে। আজ আমার ছেলেরা বেঁচে থাকলে কত বড় হতো।

আজ এত বছর পরেও দেশে স্বাধীনতার সুফল আসেনি। মুক্তিযোদ্ধারা দেশ স্বাধীন করেছেন, একটা সুন্দর বাংলাদেশ গড়তে। তাদের স্বপ্ন সফল হয়নি। কারণ, দেশদ্রোহীরা রয়ে গেছেন দেশে। বর্তমান সরকার চায়, তাদের বিচার হোক। আমি ঈশ্বরের কাছে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করি—এই বিচার সম্পন্ন করতে তিনি সহায় হবেন।

বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে আমার অনুরোধ, তারা দেশের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্যের প্রতি সচেষ্ট হবেন। বাঙালির ঐতিহ্য রক্ষা করবেন। কিশোর-কিশোরীরা মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে যুদ্ধের কাহিনী শুনবেন। তবেই বুকে আর মুখে একসঙ্গে আসবে, ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি।’

 

অনুলিখন: জহিরুল ইসলাম খান

 

/এইচকে/এমএনএইচ/

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ