behind the news
IPDC  ad on bangla Tribune
Vision  ad on bangla Tribune

‘মায়ের কথায় অনুপ্রাণিত হয়ে মাতৃভূমি বাঁচাতে যাই’

রাজশাহী প্রতিনিধি১০:০২, ডিসেম্বর ২২, ২০১৫

Bijoyer-Golpo-Freedom Fighter Nur Hamim Rajshahi.

নূর হামিম রিজভী যখন মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন তখন তিনি রাজশাহী কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। ২৫ মার্চ হানাদারদের হামলার পর রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার পিরিজপুরে গিয়ে সপরিবারে আশ্রয় নেন রিজভী। ওখান থেকে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে চলে যান ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলায় অবস্থিত নানার বাড়িতে। মুক্তিবাহিনী গঠিত হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে চাইলে বাধ সাধেন তার মামারা। তবে মায়ের অনুপ্রেরণা ও মনের জোরের কাছে হার মানতে বাধ্য হন পরিবারের অন্য সদস্যরা।

যুদ্ধে যাওয়ার গল্প এভাবেই শুরু করলেন বীরপ্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত নূর হামিম। তিনি বলেন, সারাদিন রাজশাহী শহরের রাস্তায় মোড়ে মোড়ে গণসংগীত পরিবেশন করতেন। গণসংগীত গেয়ে উদ্বুদ্ধ করতেন সাধারণ জনগণকে। এক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা রেখেছে সুরবাণী সংগীত বিদ্যালয়।

নূর হামিম রিজভী বলেন, ‘সুরবাণীর শিল্পী হিসেবে গণসংগীত পরিবেশন করতাম। যা আমার মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা সৃষ্টি করে এবং দেশকে ভালোবাসতে শিখি। এরপর ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ আমাকে অনুপ্রাণিত করে।’

মুক্তিযুদ্ধে যাওয়া প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করলে মামারা বাধ সাধেন। কিন্তু আমার মা বলেন, যে দেশে নারীদের ওপর নির্যাতন করা হচ্ছে, নৃশংস হত্যাকাণ্ড  চালানো হচ্ছে, সে দেশকে স্বাধীন করতে গিয়ে যদি আমার তিনটা ছেলের মধ্যে একটা ছেলে শহীদ হয়, তবে তাই হোক। জানি কষ্ট হবে, কিন্তু দেশের প্রয়োজনে তা মেনে নেব।’

Bijoyer-Golpo-Freedom Fighter Nur Hamim Rajshahi

নূর হামিম তার মায়ের কথা শুনে খুব অনুপ্রাণিত হন। তারপর মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য শেখপাড়া রিক্রুট ক্যাম্পে রিপোর্ট করেন। ওখানে কিছুদিন প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য তাকে পাঠানো হয় চাকুলিয়া ক্যাম্পে। ২২ দিনের উচ্চতর প্রশিক্ষণ শেষে যোগ দেন ৭ নম্বর সেক্টরের ৪ নম্বর সাবসেক্টরে। তৎকালীন ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দিনের নেতৃত্বে বিভিন্ন অপারেশনে অংশগ্রহণ করেন তিনি।

নূর হামিম হিট অ্যান্ড রান গ্রুপের গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে বিভিন্ন অপারেশনে অংশগ্রহণ করেন। এই গ্রুপের সদস্যদের পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর হামলা করে সঙ্গে সঙ্গে ভারতে গিয়ে রিপোর্ট করতে হতো। ওই সময়ের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা তার মনে এখনও জ্বলজ্বলে। একবার তার ওপর দায়িত্ব দেওয়া হয় রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহাসড়কে টহলরত পাকিস্তান আর্মির গাড়ির ওপর ‘অ্যামবুশ’ (অতর্কিতে হামলা চালানো) করার। তখন প্রতিদিন ওই মহাসড়কে পাকিস্তান আর্মির গাড়ি টহল দিত। টহলরত গাড়িতে আক্রমণের জন্য তারা বেছে নেন রাজশাহীর গোদাগাড়ীর আলিমগঞ্জ নামক জায়গা। সেই অনুযায়ী রেকি করে ঠিকমত রাস্তার কাছে পজিশন নেন। তাদের দলে ছিল ১১ জন। সঙ্গে ছিলে ছিল এলএমজি, এসএলআর, স্টেনগান ও টু-ইন মর্টারসহ ভারী অস্ত্রশস্ত্র। কিন্তু প্রস্তুতিতে বিপত্তি ঘটে যখন নির্ধারিত সময়ের আধাঘণ্টা পরও হানাদার বাহিনীর গাড়ি না আসায়। তবে তার কিছুক্ষণ পর অবশ্য যেদিক থেকে গাড়ি আসার কথা ছিল, সেদিক থেকে গাড়ি না এসে তার উল্টো দিক থেকে দুইটি গাড়ি আসে। তখন রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর গাড়ি ছাড়া অন্য কোনও গাড়ি চলত না। এজন্য চিন্তিত হয়ে পড়ে তারা। গাড়িটা কী আর্মির না অন্য কারো-এই ভেবে।

নূর হামিম রিজভী বলেন, ‘আমাদের কাছ থেকে ঠিক আধা কিলোমিটার দূরে গাড়ি দুইটি এসে থেমে গেল। আমরা দ্রুত লাইন ফরমেশন করলাম। কারণ আগে যেভাবে পজিশন নিয়েছিলাম উল্টো দিক থেকে গাড়ি আসার কারণে পজিশন চেঞ্জ করি। কিছুক্ষণ পর দেখি বড় গাড়িটা যেদিক থেকে আসছিল সেদিকে ফিরে যাচ্ছে। ছোট জিপ গাড়িটা আসা শুরু করেছে। তখন আমরা শিওর হই এটা আর্মিদের গাড়ি। আমরা সঙ্গে সঙ্গে আক্রমণ করি।  আমরা গাড়িতে গিয়ে চার্জ করি এবং দেখি এটা অফিসারদের গাড়ি। একজন বাঙালি অফিসার, একজন পাকিস্তানি অফিসারসহ ৯ জন মারা যায়। পরে শুনি গোদাগাড়ীতে জনগণকে উব্ধুব্ধকরণ সভা ছিল। এজন্য অফিসাররা গোদাগাড়ী থেকে আসছিল। ওই অ্যামবুশের পর রাতে ওই সড়কে পাকিস্তান আর্মির কোনও টহল গাড়ি ছিল না।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা অপারেশন করার সময় রাজাবাড়ী পোলট্রি খামার হয়ে গোদাগাড়ীতে ঢুকতাম। কারণ পোলট্রি খামারের নিচেই পদ্মা নদী। নৌকায় চড়ে আসা সহজ হত। তারপর ওখান থেকে বিভিন্ন অঞ্চলে অপারেশনে যেতাম। যেদিন মুক্তিযোদ্ধারা আসত, সেদিন গ্রামের সাধারণ মানুষ রাজাকার সেজে রাস্তায় হ্যারিকেন নিয়ে টহল দিত। পথ ক্লিয়ার থাকলে হ্যারিকেন এমনি নড়াচড়া করত। আর পাকিস্তানি আর্মিরা থাকলে হ্যারিকেন উল্টিয়ে দিত। হ্যারিকেন উল্টালে আমরা আর সামনে এগুতাম না। এভাবে সাধারণ জনগণ আমাদের জীবন রক্ষা করেছে। আমি মনে করি তারা আমাদের চেয়ে বড় মুক্তিযোদ্ধা ছিল। কিন্তু তাদের কোনও নামধাম নেই। যারা পাকিস্তানিদের সহযোগী ছিল তারাই এখন বড় মুক্তিযোদ্ধা হয়ে গেছে। মনের মধ্যে একটা জ্বালা ছিল। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হওয়ায় সেই জ্বালা নিভতে শুরু করেছে।’

 

/এসটি/

Global Brand  ad on Bangla Tribune

লাইভ

IPDC  ad on bangla Tribune
টপ